অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে নৌযানের সংখ্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক : নাব্য সংকটে সংকুচিত হচ্ছে দেশের নৌপথ। নদীপথে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনও কমছে আশঙ্কাজনকভাবে। তার পরও অনিয়ন্ত্রিত বাড়ছে নৌযানের সংখ্যা। সংকুচিত নৌপথে মাত্রাতিরিক্ত নৌযানের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে পরিবেশে বিপর্যয় যেমন ঘটছে। একই সঙ্গে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যাও। সর্বোপরি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মত্স্যসম্পদের ওপর।

যাত্রীবাহী, কার্গোবাহী, বালিবাহী, ডাম্ব বার্জ ও অয়েল ট্যাংকারসহ বিভিন্ন নৌযানের গত কয়েক বছরের নিবন্ধন পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, সব ধরনের নৌযানের সংখ্যাই বাড়ছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালে যাত্রীবাহী নৌযান নিবন্ধন দেয়া হয় ৯৭০টি। ২০১২ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৮৪। আর ২০১৩ সালে এ ধরনের নৌযান নিবন্ধন দেয়া হয় ১ হাজার ৬১টি। এ হিসাবে দুই বছরে দেশের নদীপথে যাত্রীবাহী নৌযান বেড়েছে ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

একইভাবে বেড়েছে কার্গোর সংখ্যাও। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১১ সালে কার্গো নিবন্ধন দেয়া হয় ১ হাজার ৯৩০টি। পরের দুই বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২ হাজার ৪৮ ও ২ হাজার ২১৩টিতে। অর্থাত্ দুই বছরে কার্গো নিবন্ধন বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

এছাড়া ২০১১ সালে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর অয়েল ট্যাংকার নিবন্ধন দিয়েছিল ১৯০টি। এর পরের বছর নিবন্ধন দেয়া হয় ২১০টি ও ২০১৩ সালে ২৬০টি। এ হিসাবে দুই বছরে অয়েল ট্যাংকারের নিবন্ধন বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর দুই বছরে বালিবাহী নৌযান নিবন্ধনের হার বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ২০১১ সালে ৩ হাজার ৩৭৫টি বালিবাহী নৌযান নিবন্ধন দেয়া হলেও ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮১১টিতে। একইভাবে ২০১১ সালে ১৮০টি ডাম্ব বার্জ (কার্গো পরিবহনে ব্যবহূত) নিবন্ধন দেয়া হলেও ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১৬টিতে।

সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই এসব নৌযানের নিবন্ধন দেয়া হয় বলে জানান নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়। তিনি বলেন, এসব নৌযান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারক করা হয়। কোনো ত্রুটি দেখা গেলে রুট পারমিট বাতিল করার পাশাপাশি বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়। অনুমোদনের বাইরে গিয়ে কেউ যাতে নৌযান পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়ে আমাদের তদারকি আরো জোরদার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর পানি দূষিত হওয়ার বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে অয়েল ট্যাংকার দুর্ঘটনায় তেল ছড়িয়ে পড়া। এছাড়া মানহীন বা ফিটনেসবিহীন নৌযান থেকেও নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ে। এতে নদীর তলদেশে জমা হয় বিভিন্ন ভারী ধাতু।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়ার মালয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মত্স্য অধিদপ্তরের চার গবেষকের করা ‘প্রিলিমিনারি অ্যাসেসমেন্ট অব হেভি মেটালস ইন ওয়াটার অ্যান্ড সেডিমেন্ট অব কর্ণফুলী রিভার, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায়ও নদীতে অস্বাভাবিক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদীর পানিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ২০ দশমিক ৩, আর্সেনিক ৮১ দশমিক শূন্য ৯, ক্যাডমিয়াম ২ দশমিক শূন্য ১ ও সিসা ৪৩ দশমিক ৬৯ মিলিগ্রাম। এসব ভারী ধাতু জলজ পরিবেশের পাশাপাশি ক্ষতি করছে মানবস্বাস্থ্যের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. কাউসার আহম্মদ এ প্রসঙ্গে বলেন, মানহীন নৌযানের ইঞ্জিন থেকে যে কালো তেল বের হয়, তাতে নদীর পানি দূষিত হয়। নদীর পানিতে যেসব ভারী ধাতু মেশে, তা সাধারণত তলদেশে জমা হয়। মাছের মাধ্যমে তা প্রবেশ করে মানবদেহে। নদীতে বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীও এসব ধাতু মিশ্রিত পানি ও কাদামাটির ওপর নির্ভর করে বেড়ে ওঠে। ফলে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি পর্যায়ে এসব ভারী ধাতু মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাস্তুসংস্থান। এতে মাছসহ অন্যান্য অণুজীবও ক্ষতিগ্রস্ত হয় মারাত্মকভাবে।

এদিকে নৌযানের সংখ্যা বাড়লেও কমছে নৌপথের পরিমাণ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে দেশে নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। ২০১৬ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ছয় হাজার কিলোমিটারে।

বিআইডব্লিউটিএর হিসাবে, দেশে প্রথম শ্রেণী অর্থাত্ ‘এ’ ক্যাটাগরি নৌপথের দৈর্ঘ্য ৬৮৩ কিলোমিটার। এ ধরনের নৌপথে চলাচল করে ৩ দশমিক ৬৫ মিটার ড্রাফটের নৌযান। দেশে সচল নৌপথের মধ্যে এ শ্রেণীর নৌপথের পরিমাণ ১১ শতাংশ। দ্বিতীয় শ্রেণী অর্থাত্ বি ক্যাটাগরির নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। এ ধরনের নৌপথে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১৩ মিটার ড্রাফটের নৌযান চলাচল করতে পারে। এ শ্রেণীর নৌপথ মোট নৌপথের ১৭ শতাংশ। বাকি নৌপথে খুব সাধারণ ও ছোট আকারের নৌযান চলাচল করে।

সংকুচিত নৌপথ সত্ত্বেও নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে অশোক মাধব রায় বলেন, নাব্য সংকট কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে নাব্য সংকট দূর হবে। নাব্য সংকট না থাকলে নদীদূষণও কমে আসবে।

বিআইডব্লিউটিএর হিসাব অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহনও কমছে নৌপথে। ২০১১-১২ অর্থবছর বিভিন্ন নৌরুট দিয়ে যাত্রী পরিবহন হয় ৯ কোটি ৭৮ লাখ। পরের অর্থবছর তা নেমে আসে ৮ কোটি ৪৫ লাখে। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে হয় ৮ কোটি ৭৪ লাখ।

এদিকে নৌযানসহ বিভিন্নভাবে নদীদূষণের কারণে কোনো নদীতেই এখন আর মাছ পাওয়া যাচ্ছে না সেভাবে। মেঘনা নদীর অববাহিকায় (লোয়ার মেঘনা) কিছু মাছ পাওয়া গেলেও তা মূলত ইলিশ। রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ, পাঙ্গাশ, বাটা, সরপুঁটি, গলদা ও বাগদা, চাকা, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, টাকি, শিং, মাগুর কিংবা কৈ মাছের উৎপাদন এখন আর নদীকেন্দ্রিক নেই। ইলিশ ছাড়া নদ-নদীর অন্যান্য মাছ বিলুপ্তপ্রায়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY