ডিসকো ও নাইনস্টার গ্রুপের দ্বন্দ্বেই স্কুলছাত্র আদনান খুন

নিহত আদনান কবির

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার উত্তরায় স্কুলছাত্র আদনান কবির হত‌্যাকাণ্ডে ওই এলাকার দুই দল তরুণের দ্বন্দ্ব ধরেই এগোচ্ছে পুলিশের তদন্ত। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর ওই আবাসিক এলাকার তরুণদের মধ‌্যে ‘ডিসকো গ্রুপ’ ও ‘নাইনস্টার গ্রুপ’ নামে দুটি পক্ষ রয়েছে। তাদের দ্বন্দ্বেই খুন হন আদনান।

নিহত আদনান ‘নাইনস্টার গ্রুপের’ সদস‌্য ছিলেন বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি। গত বছর ‘নাইনস্টার গ্রুপের’ নেতা ‘তালাচাবি রাজু’কে ছুরিকাহত করেছিল ‘ডিসকো গ্রুপের’ সদস্যরা। তারপর থেকে তাদের দ্বন্দ্ব চলছিল।

আদনান হত‌্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেপ্তার নাফিস মো. আলম ডন আগের ঘটনায় অর্থাৎ রাজুর উপর হামলার মামলায়ও আসামি। কিছু দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে ছাড়া পান তিনি।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আদনানকে ১০/১৫ জন তরুণ ধাওয়া করে ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে এলোপাতাড়ি কোপায়। হাসপাতালে নেওয়ার ঘণ্টাখানেকের মাথায় তার মৃত‌্যু হয়।

ট্রাস্ট স্কুল অ‌্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনানের বাবা মো. কবির হোসেন উত্তরা পশ্চিম থানায় নয়জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০/১২ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন, আসামিদের সবার বয়স ১৬ থেকে ২২ বছরের মধ‌্যে।

যাদের নাম দেওয়া হয়েছে মামলায়, তারা হলেন- নাফিজ মো. আলম ওরফে ডন (১৯), নাঈমুর রহমান অনিক (১৯), সাদাফ জাকির (১৬), রায়হান আহমেদ সেতু (১৯), রবিউল ইসলাম (১৮), মো.আখতারুজ্জামান ছোটন (১৯), আহমেদ জিয়ান (১৯), খন্দকার শুভ (১৮) ও নাজমুস সাকিব (২২) ।

উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রাজ্জাক বলেন, ফেইসবুকে উত্তরার অন্তত ২০/২৫ জন কিশোর ডিসকো গ্রুপ (ডিসকো বয়েজ) ও নাইনস্টার (নাইন এমএম বয়েজ) গ্রুপ নামের দুটি গ্রুপের সদস্য। বিভিন্ন সময়ে এলাকার ছোটভাই কে, আবার বড় ভাই কে, এটা নিয়ে ঝামেলা চলত।

নিহত আদনান ও আসামি সাদাফ দুজনই আগে মাইলস্টোন স্কুলে পড়তেন। গত বছর আদনানকে ট্রাস্ট স্কুলে নিয়ে আসেন তার বাবা। আদনানের এক ভাই এবার মাইলস্টোন স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেবে।

স্থানীয়রা জানায়, উত্তরায় তরুণদের এই দলগুলোর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তারা বিভিন্ন সময় পার্টি করে, এলাকায় উচ্চ শব্দে দ্রুতগতিতে মোটর সাইকেল চালায়। মাঠে মাদকের আড্ডা বসাতে এবং স্কুল-কলেজছাত্রীদের উত্ত‌্যক্ত করতেও দেখা যায় তাদের।

আদনান হত‌্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে উত্তরা পশ্চিম থানার কর্মকর্তারা বলছেন, এই দলগুলোর বিষয়ে তারা খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। আদনানের পরিবারের সদস‌্যদের কথায়ও ওই এলাকার তরুণদের দুটি পক্ষের দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে আদনানের সম্পৃক্ততা ছিল না বলে তাদের দাবি।

আদনানের বাবা ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর রোডের বাসিন্দা কবির হোসেন দাবি করেন, তার ছেলে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তিনি বলেন, আদনান কোনো উচ্ছৃঙ্খল কাজে কোনোদিন জড়িত ছিল না। শারীরিকভাবে শুকনো হওয়ায় কোনোদিন ভারী কোনো খেলাও খেলত না। কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতাও ছিল না।

কবির হোসেন জানান, শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে আদনান ১২ নম্বর সেক্টরের খোলা জায়গায় ব্যাডমিন্টন খেলতে যাবে বলে বাসার থেকে বের হয়। সন্ধ্যার পর তিনি শুনতে পান ছেলেকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে কয়েক কিশোর চলে গেছে।

ওরা আদনানকে ৫ নম্বর সেক্টর থেকে ধাওয়া করে ১৭ নম্বর সেক্টরে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মারধর করা হচ্ছে দেখে অনেকে ছবি তুললেও কেউ এগিয়ে আসেননি। রাস্তার পাশের অশিক্ষিত এক পিঠা বিক্রেতা নারী তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিযে যায়।

একজনকে সবার সামনে মেরে ফেলল, কেউ একটা শব্দও করল না। এই ঘটনার বিচার না পেলে ভাবব, দেশে বিচার বলে কিছু নেই, বলেন ব‌্যবসায়ী কবির হোসেন।

৭ আসামি পলাতক, দুজন রিমান্ডে
আদনান হত‌্যাকাণ্ডে তার বাবা যে নয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন, তার দুজনকে পুলিশ ইতোমধ‌্যে গ্রেপ্তার করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই শাহিন মিয়া বলেন, ডন ও সাদাফ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে এক দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে।

বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, বলেন উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজ্জাক। আসামি ডনের বাবা রফিকুল আলম নিজেকে বিচারক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে জানান নিহত আদনানের বাবা কবির। মামলা করতে গিয়ে থানায় ডনের বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY