তবে আশার কথা হলো, ট্রাম্পের কথা ও সুরে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন!

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রেসিডেন্ট

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবং জনমত জরিপসহ সকল হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড জে ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ৮ নবেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচন উপলক্ষে প্রচারণা চালানোর সময় নিজের বিভিন্ন বক্তব্যের জন্য বিশ্বব্যাপী তিনি প্রচণ্ডভাবে বিতর্কিত হয়েছিলেন। দেশী-বিদেশী কোনো একটি জরিপের ফলই তার পক্ষে যায়নি। এমনকি নির্বাচনের দিন প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপেও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু বিজয়ী হননি, হয়েছেনও বিরাট ব্যবধানে, যে ফলাফলকে অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। জয়ের জন্য যেখানে ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোটের দরকার ছিল ট্রাম্প সেখানে পেয়েছেন ২৯০টি। সর্বশেষ গণনার পর এই সংখ্যা ২৯৯-এও পৌঁছে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটন পেয়েছেন ২২৮টি ইলেক্টোরাল ভোট, ট্রাম্পের তুলনায় যা লজ্জাকর প্রাপ্তি।

এখানে অন্য একটি তথ্য-পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ করা দরকার। পপুলার তথা সাধারণ ভোটারদের ভোটে ট্রাম্প কিন্তু পিছিয়ে পড়েছেন। হিলারি যেখানে পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ, ট্রাম্প সেখানে পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অতি সামান্য হলেও জনসমর্থনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যবধানকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ইলেক্টোরাল ভোটে জিতে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ ভোটারদের ভোট ও সমর্থন অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু তা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী তাকেই নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় তথ্যটি হলো, ট্রাম্প নিজেই শুধু জেতেননি, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট মার্কিন পার্লামেন্টের সিনেট এবং হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসেও রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সিনেটে এই ব্যবধান ৫১-৪৭ আসনের এবং হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ব্যবধান ২৩৮-১৯৩ আসনের। এর ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এবং তা বাস্তবায়নের পথে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কোনো বাধারই সম্মুখীন হতে হবে না। স্মরণ করা দরকার, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকেছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর সঙ্গত অনেক কারণেই বিশ্বব্যাপী নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বিতর্কিত বিভিন্ন বক্তব্য ও ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প নিজেই এর কারণ সৃষ্টি করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, প্রায় দেড় কোটি মেক্সিকানসহ যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসরত সকল বিদেশীকে ঝেঁটিয়ে তাড়ানো হবে। জঙ্গিবাদী হামলা ঠেকানোর জন্য মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। মুসলিম বিরোধী বক্তব্য রাখার পাশাপাশি ট্রাম্প আবার একথাও বলেছিলেন যে, সৌদি আরবের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন তিনি। মেক্সিকো এবং কানাডার সঙ্গে মার্কিন সীমান্তে দেয়াল তোলার মতো আরো কিছু বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। সব মিলিয়ে ট্রাম্প বোঝাতে চেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি কেবলই মার্কিনীদের দেশে পরিণত করবেন।

এসব কারণে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নব্য জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পর্যবেক্ষকরা। অনেকে এমনকি জার্মানির নাৎসিবাদী নেতা এডলফ হিটলারের উত্থান পর্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যা শুনে মনে হতে পারে যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আরো একটি বিশ্বযুদ্ধ বাধার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশ ও ন্যাটোর মতো সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নেও ডোনাল্ড ট্রাম্প সংশয়ের সৃষ্টি করে রেখেছেন। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমগ্র বিশ্বে যে আলোড়ন উঠেছে এবং আন্দোলন চলছে, ট্রাম্প তাকে ‘ভুয়া’ মনে করেন। একই কারণে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। জলবায়ু সংক্রান্ত সকল চুক্তিও বাতিল করবেন ট্রাম্প। মুক্ত বাণিজ্যের বিরোধিতার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক তথা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যাপারেও ট্রাম্প কঠোর নীতি ও অবস্থানের কথা জানিয়ে রেখেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, মেক্সিকো থেকে আনা পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ এবং চীনা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করবে তার সরকার। অন্য সব দেশের পণ্যের ক্ষেত্রেও একইভাবে শুল্ক আরোপ করা হবে, যাতে মার্কিন পণ্যকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে এবং বাজার হারাতে না হয়। যাতে মার্কিন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের কবলে না পড়েন।

এশিয়া ও ইউরোপের যেসব দেশ মার্কিন নিরাপত্তার বলে টিকে রয়েছে সে দেশগুলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ দিতে বাধ্য হয় তার ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এই দেশগুলোকে ‘অকৃতজ্ঞ’ হিসেবে চিহ্নিত করতেও দ্বিধা করেননি তিনি। ট্রাম্পের সাফ কথা ছিল, মার্কিন সামরিক নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য বিনিময়ে বিপুল অর্থ দিতে হবে। অর্থ না দিলে কোনো দেশকেই সাহায্য করবে না তার সরকার। মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশে দেশে চলমান যেসব যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জড়িত হয়ে পড়েছে সে দেশগুলোর ব্যাপারেও এমন পদক্ষেপই ট্রাম্প নেবেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারে এবং কেবলই ক্ষয়ক্ষতির শিকার না হয়।

এভাবে সব মিলিয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন ও অনুসরণ করার এবং পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন। বলেছেন, তিনি বিশ্বের নয় বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে চান এবং দেশকে তার হারানো সম্মান ও মহান অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে চান। একই কারণে ট্রাম্পকে উগ্র জাতীয়তাবাদী এমনকি হিটলারের মতো ফ্যাসিবাদী মনোভাবের নেতা হিসেবেও বর্ণনা করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক পর্যবেক্ষক। তবে আশার কথা হলো, প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার পর মুহূর্ত থেকেই ট্রাম্পের কথা ও সুরে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যেমন বিদেশীদের বহিষ্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, অবৈধভাবে বসবাসরত সকলকে নয় বরং শুধু অপরাধীদের তাড়ানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে ট্রাম্প বলেছেন, জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার লক্ষ্যে এটা ছিল তার একটি পরামর্শ, কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়।

যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো বিভিন্ন প্রশ্নেও ট্রাম্প তার বক্তব্য ও অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেছেন। বলা হচ্ছে, এগুলোর সবই আসলে ছিল ট্রাম্পের নির্বাচনী স্টান্টবাজি, যা তার জন্য অকল্পনীয় সুফল বয়ে এনেছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের আসনে বসার পর ট্রাম্পকেও অন্য প্রেসিডেন্টদের মতোই ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে বলতে ও চলতে হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, যার নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর গোটা বিশ্বের অস্তিত্ব নির্ভর করে। আমরাও আশা করতে চাই, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বকে বিপন্ন করার মতো কোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না বরং তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে এবং দেশে দেশে চলমান সকল যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সুফলপ্রসূ অবদান রাখবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY