দীঘিপাড়ায় মজুদ রয়েছে ৫শ’ মিলিয়ন টন কয়লা

মাইনিং পদ্ধতিতে উত্তোলন করা হবে, দীঘিপাড়ার কয়লা দিয়ে বড় একটি বিদ্যুত কেন্দ্র চলবে

এ ওয়ান নিউজ : দীঘিপাড়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা করছে সরকার। আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং করে (ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি) এখান থেকে কয়লা তোলা হবে। শীঘ্রই খনি করার বিষয়ে সম্ভাব্যতা জরিপ শুরু করা হচ্ছে। দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়ার পর দেশের দ্বিতীয় কয়লাখনি হবে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের দীঘিপাড়ায়। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে খনিটিতে ৫০০ মিলিয়ন টনের বেশি কয়লা মজুদ রয়েছে। তবে জরিপ শেষে কয়লার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

দেশে বিপুল পরিমাণ কয়লার মজুদ থাকলেও পরিবেশবাদীদের চাপে সরকার কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার পর কয়লানীতি করার বিষয়টি থেকেও সরকার সরে এসেছে। দেশে কয়লাচালিত বড় বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করলেও আমদানি করা জ্বালানিতে কেন্দ্রগুলো চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকার এর আগে কয়লা বিদ্যুতের অর্ধেক দেশীয় জ্বালানিতে উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিলেও পরে তা প্রত্যাহার করে। যদিও দীঘিপাড়া খনির কয়লা দিয়ে দেশীয় একটি কোম্পানি বড় একটি বিদ্যুত কেন্দ্র চালাবে। এজন্য পেট্রোবাংলার সঙ্গে কোম্পানিটির আলোচনা চলছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, খনি করার বিষয়ে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কোম্পানি এ বিষয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করছে। সম্ভাব্যতা জরিপ শেষ হওয়ার পরই বলা যাবে কবে নাগাদ এখান থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু। পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে সম্ভাব্যতা জরিপ শেষ করে আগামী বছরের শেষ নাগাদ খনি করার একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারের (আইআইএফসি) হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে পাঁচটি কয়লা ক্ষেত্রে মোট মজুদের পরিমাণ ২৭৫ কোটি ৪০ লাখ টন। তাপমাত্রার হিসেবে যা ৮১ টিসিএফ গ্যাসের সমান। আর উত্তোলনযোগ্য কয়লার পরিমাণ ১২৫ কোটি টন। যা ৩৭ টিসিএফ গ্যাসের সমান। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত দেশে প্রমাণিত গ্যাস মজুদের তুলনায় এর পরিমাণ বেশি। সরকারী হিসেব অনুযায়ী দেশের প্রমাণিত গ্যাসের অর্ধেক ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দেশে আর কোন গ্যাস না পাওয়া গেলে বিদ্যমান খনিগুলো থেকে ২০৩০ সালের পর আর কোন গ্যাস পাওয়া যাবে না। পেট্রোবাংলাই বলছে, ২০২০ সালের পর থেকে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করবে। প্রাথমিক হিসাবে মজুদ কয়লা দিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার মেগাওয়াট করে ৫০ বছরজুড়ে বিদ্যুত উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু এখন দিনাজপুরে মাত্র একটি ২৫০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে।

ভবিষ্যতে সরকার কয়লাকে প্রধান জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করলেও উত্তোলনে সেই অর্থে গতি নেই। দীর্ঘদিন পর কয়লা উত্তোলনের এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর আগে বিএনপি সরকারের সময় ফুলবাড়ি কেলেঙ্কারির পর দেশের কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি আর এগোয়নি। গ্যাসের সঙ্কট সামাল দিতে গিয়ে দেশে তেলচালিত বিদ্যুতের উৎপাদন ৩০ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশেষত দেশে সান্ধ্যকালীন সঙ্কট সামাল দিতে এখন তেলচালিত বেশি দরের তরল জ্বালানির ওপর নির্ভর করা হচ্ছে। এর বিপরীতে কয়লা ব্যবহার করা হলে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাশ্রয় হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে। যা রাষ্ট্রের অন্য খাতে বিনিয়োগ করা যাবে।

এখন দেশে মহেশখালী, পায়রাতে কয়লাচালিত বিদ্যুত কেন্দ্রর হাব নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া কক্সবাজার, মাওয়া এবং রামপালে কয়লাচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এর সব বিদ্যুত কেন্দ্রই চলবে আমদানি করা কয়লাতে। দেশীয় কয়লার যোগান নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।

খনি করার বিষয়ে জানতে চাইলে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএমএন আরঙ্গজেব বলেন, আমরা এখন বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। এ বিষয়ে একটি প্রকল্প রয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছরের মধ্যেই কয়লা খনিটির সম্ভাব্যতা জরিপকারক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করা হবে। সম্ভাব্যতা জরিপ শেষ হওয়ার পর কয়লা তোলার বিষয়ে দরপত্র আহ্বান করা হবে। সকল প্রক্রিয়া শেষ করতে ২০১৭’র শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এরপরই মূলত খনি করার কাজ শুরু হবে। ২০১২ সালের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানির আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার খনিটি তাদের দিয়েছে।

সূত্র বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কয়লাখনি হিসেবে বড়পুকুরিয়া খনিকে বিবেচনা করা হয়। খনির অভ্যন্তরীণ উচ্চ তাপমাত্রা, পানির উচ্চ তাপমাত্রা, খনিতে পানির উচ্চ প্রবাহ, ছাদে ফাটল, আর্দ্রতা এবং কয়লার স্বতঃস্ফূর্ত প্রজ্বলনের ঘটনা ঘটে। যা এই খনিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু তারপরও বড়পুকুরিয়া খনিটি পরিচালনায় সফলতা দেখিয়েছে পেট্রোবাংলা। দেশীয় কোম্পানির মাধ্যমে এখান থেকে কয়লা তোলার ফলে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। ফলে নতুন খনি করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। দীঘিপাড়ার গভীরতার কারণে এই খনিটিও বড়পুকুরিয়ার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালে দীঘিপাড়া কয়লাখনিটি আবিষ্কৃত হয়। ভূপদার্থিক জরিপের ফলাফলে আনুমানিক ১০ বর্গকিলোমিটার ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট বেসিন দীঘিপাড়ায় কয়লা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আরও জরিপ এবং কূপ খননের মাধ্যমে খনিটির আকার বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে দীঘিপাড়া বেসিনের পরিধি এবং মজুদ কয়লার পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।

দীঘিপাড়ায় ১৯৯৫ সালে প্রথম কূপ খনন করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর। তখন ৩২৭ দশমিক ৯৬ মিটার গভীরতায় উন্নতমানের গন্ডোয়ানার কয়লা খনির সন্ধান মেলে। পরবর্তীতে আরও ৪টি কূপ খনন করা হয়। এর মধ্যে ২০০১ সালে দ্বিতীয় কূপ খনন করা হয়। ওই সময় দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এক বর্গমাইল দূরত্বে দ্বিতীয় কূপ খনন করে ৩৮৩ দশমিক ৫৪ মিটার ভূগর্ভে কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়। ২০০৩ সালে একই ব্যবধানে দক্ষিণ-পূর্বে তৃতীয় কূপ খনন করে ৩৫৫ দশমিক ৯ মিটার ভূগর্ভে কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে একই ব্যবধানে উত্তর দিকে চতুর্থ কূপ খনন করে ৩২৩ দশমিক ৮ মিটার ভূগর্ভে কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়। ২০০৬ সালে দীঘিপাড়া থেকে পূর্ব-দক্ষিণে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে ৫ম কূপ খনন শেষে ৩৮৮ দশমিক ১ মিটার ভূগর্ভে কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়।

৫টি খননকৃত কূপে সম্ভাব্য অতিরিক্ত মজুদ ধরা হয় ৫০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি। বেসিনটি বিভিন্ন উপাদানে সমৃদ্ধ ১০টি ও সর্বনিম্ন ৪টি কয়লার স্তরসমূহের একীভূত অবস্থায় রয়েছে। মোট পুরুত্ব সর্বোচ্চ ৭২ দশমিক ৩৬ মিটার ও সর্বনিম্ন ৪৭ দশমিক ২৯ মিটার। ৩টি কয়লা স্তরে প্রথম স্তরের পুরুত্ব সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৮১ মিটার এবং সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৭৯ মিটার। দ্বিতীয় স্তরে সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৫৮ মিটার সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ৬৩ মিটার। তৃতীয় স্তরে ১০ দশমিক ২৬ মিটার সর্বনিম্ন ২ দশমিক ৯ মিটার। বলা হচ্ছে, খনিটির কয়লার আর্দ্রতা ৩ দশমিক ২ ভাগ, উদ্বায়ী পদার্থ হলো ৩০ ভাগ, ছাই ৯ ভাগ, স্থির কার্বন ৫৭ ভাগ, সালফার ৬৫ ভাগ, তাপ উৎপাদন মাত্রা অত্যধিক। দীঘিপাড়ার কয়লা উন্নত জাতের বিটুমিনাস কয়লা।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY