নতুন আরেকটি বছর ও নারী জাগরন

এওয়ান অপরাজিতা ডেস্ক: রাত পোহালেই এসে যাবে নতুন বছর ২০১৭। ২০১৬-এর কথা হিসাব করলে তা ছিল নারী ও শিশুর জন্য কঠিন একটি সময়। তাই নতুন বছরের প্রাক্কালে সবার প্রত্যাশা থাকবে নারীর জন্য উপযোগী সুন্দর একটি সমাজের যেখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও গড়বে সোনার বাংলাদেশ।

২০১৫ ও ২০১৬ সালের এখন পর্যন্ত নারী নির্যাতন ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি। গত দুই বছরে ৯২ শতাংশ শিশু (১৮ বছরের নিচে) ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নারী নির্যাতনে জড়িত ৮৬ শতাংশ ব্যক্তির বয়স ৩৫ বছর বা এর কম। আর অভিযুক্ত পুরুষদের ৩৭ শতাংশের বয়স ১৮-২৪ বছর বয়সের। প্রতিবেদনে দেশের সাতটি বিভাগের ৬৬টি থানায় দায়েরকৃত ২ হাজার ৩০৭টি মামলায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের মধ্য থেকে দৈব চয়ন পদ্ধতিতে ১৯৮ জনকে বেছে নেয়া একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেন তিনি। জরিপের ফলাফল থেকে দেখা গেছে, নির্যাতনে জড়িত ৮৬ শতাংশ ব্যক্তির বয়স ৩৫ বছর বা এর কম। ২৪ শতাংশ ব্যক্তি ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা করার দায়ে অভিযুক্ত। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, বেকার বা কর্মঠ সব শ্রেণির নারী ও শিশু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত। মূলত নারী ও শিশুদের প্রতি প্রচলিত সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সহিংসতা বাড়ছে। নারী সহিংসতা কমাতে হবে। দেশজুড়ে নারী ও শিশুর প্রতি যে অন্যায় করা হচ্ছে তার জন্য যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া পরিবহন হতে শুরু করে সামাজিক বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নারীর জন্য অবশ্যই সুষ্ঠু নগরবান্ধব পরিবেশের সৃষ্টি করতে হবে। তবেই নারীরা পারবে সমাজে যার যার সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম। ৭৫ শতাংশ তরুণ মনে করেন আগামী ১৫ বছরে দেশ আরও সমৃদ্ধি অর্জন করবে। আর ৬০ শতাংশের ধারণা, দেশ সঠিক পথেই চলছে। এই তরুণরাই দেশের নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী। এক জরিপ রিপোর্টে এ তথ্য জানা গেছে।

_92600259_nusrat1‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ : অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও এ দেশের তরুণরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চান। ব্রিটিশ কাউন্সিল, অ্যাকশন এইড এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) যৌথভাবে এই গবেষণা রিপোর্ট তৈরি করেছে।

রিপোর্টে বলা হয়, তরুণদের এই আশাবাদের বিপরীতে উদ্বেগও আছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং দুর্নীতিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে এসব বিষয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জরিপে তরুণদের ৫৪ শতাংশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ৪১ শতাংশ দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, ৩৯ শতাংশ বিদ্যুৎ সংকট, ৩৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ৩২ শতাংশ ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি এবং ৩২ শতাংশ বেকারত্বকে প্রধান সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক এসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তারা দেশকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে চান। তরুণরা দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ চান। নিলসেন কোম্পানি (বাংলাদেশ) পরিচালিত এই গবেষণায় ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৫ হাজার তরুণ ও যুবকের ওপর জরিপ চালানো হয়। ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই জরিপ চলে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নারী ও পুরুষের সংখ্যা ছিল সমান। তাদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ ছিলেন গ্রামীণ জনপদের, ২০ শতাংশ শহুরে এবং বাকিরা উপ-শহর বা আধা-শহরের বাসিন্দা। এ ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় ১৫টি ইন-ডেপ্টথ ইন্টারভিউ এবং ১৮টি ফোকাস গ্রুপভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তরুণদের নিয়ে এ ধরনের জরিপ বাংলাদেশে এটাই প্রথম। সময়ের আলোকে তরুণ প্রজন্মের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে এই জরিপে। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজিস)-এর ব্যাপারে করা এ জরিপ ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে চলমান ধারাবাহিক গবেষণারই অংশ। দেশের তরুণ সমাজের মর্যাদা, আকাঙ্ক্ষা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০১০ সালে প্রকাশিত রিপোর্টের ‘ফলো-অন’ এই জরিপ রিপোর্ট। এ বছরের এই গবেষণা রিপোর্টে তরুণ প্রজন্মের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। বিষয়গুলো হচ্ছে_ সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ ও স্বাস্থ্য।

গবেষণা রিপোর্টে আরও বলা হয়, তরুণরা সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার শীর্ষ ৫টি কারণ চিহ্নিত করেছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬৯ শতাংশ বেকারত্ব, ৫৪ শতাংশ দারিদ্র্য, ৩০ শতাংশ অধিক অর্থ চাহিদা, ২৯ শতাংশ বন্ধুদের চাপ এবং ২২ শতাংশ রাজনৈতিক বিশ্বাসকে তরুণদের সহিংস ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রিপোর্ট বলছে, ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪৮ শতাংশ তরুণের কোনো আয় ছিল না। সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার কারণে অনেক তরুণই আংশিক বেকারত্বের শিকার। তারা যোগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছেন না। গত ১২ মাসে ৬২ শতাংশ তরুণ কোনো আয় করতে পারেননি।

গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, শুধু শিক্ষাই বেকারত্বের সমাধান নয়। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাগ্রহণ শেষে চাকরির প্রস্তুতির সময় তরুণরা বুঝতে পারেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও বেশি প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষিত ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক এবং আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিকভাবে এ দেশের তরুণ প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে একটি গণতান্ত্রিক, সাম্যবাদী ও সবুজ বাংলাদেশের। যেখানে থাকবে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, সুশাসন, চাকরির নিশ্চয়তা, গণতন্ত্র, পরিবেশ ও সাম্যবাদী অবস্থা।

তরুণ প্রজন্মের এসব উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং আকাঙ্ক্ষা দেশের নীতি-নির্ধারণী বিষয় ও পরিকল্পনা নথিতে অন্তর্ভুক্তি হোক_ এই গবেষণায় তরুণদের মনোভাবের সেই প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেদনের তথ্যগুলো মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নথি, যেমন_ সপ্তম পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা (এসএফওয়াইপি) ও বার্ষিক অনুষ্ঠান নথি যেমন_ বার্ষিক উন্নয়ন অনুষ্ঠানেও অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শুধু রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই পূরণ হবে না; বরং বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের সঙ্গে সংগতি রেখে এসডিজির বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

গবেষণায় আরও জানা গেছে, ৯৮ শতাংশ যুবক মনে করেন দেশ পরিচালনায় সৎ ও দায়িত্বশীল সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ৯৬ শতাংশ তরুণ নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং কর্মসংস্থানের ওপর সর্বাধিক জোর দিয়েছেন ৯৫ শতাংশ তরুণ। জরিপে ১৬ শতাংশ শহুরে এবং ২৮ শতাংশ গ্রামীণ যুবক বলেছেন, পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তাই নতুন বছরে নতুন প্রজন্মের সব নারীরই প্রত্যাশা থাকবে সহায়ক একটি পরিবেশ পাওয়ার, যাতে করে সব বাধা পেরিয়ে তারা উন্নতির শিখরে উঠতে পারে। আর সরকারেরও উচিত এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ার যাতে করে নারীরা পায় তাদের উপযোগী নারীবান্ধব নগর।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY