নতুন বছরটা আসলে নতুন নয় একদমই!

নুুরুল করিম, ঢাকা: নতুন বছর মানে নতুন ক্লাসে ওঠা। নতুন বইয়ের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যাওয়া। নতুন স্কুল-ইউনিফর্ম। সবাই আবদার করে বলতো- মিষ্টি কৈ? তখন বলতাম সেকেন্ড হয়েছি, মিষ্টি খাওয়ানো ফরজ না! টানা চার বছর ক্লাসের সেকেন্ড বয় ছিলাম। সেকেন্ড হওয়ার খুশিতে সবাইকে মিষ্টি না খাওয়ালেও জিলাফি খাওয়াতাম। চারদিকে শীত-কুয়াশার চাদর জড়িয়ে আমাদের মফস্সল শহরের বুকে নেমে আসত নববর্ষের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আনন্দ আর আশা নিয়ে আসত দিনটা। মনে হতো, এবার থেকে সব কিছু ভাল হবে। আমাদের দিনগুলো কটন ক্যান্ডির মতোই হালকা, মিঠে আর গোলাপি হয়ে কাটবে। এটা আমার ছোটবেলার গল্প।

তারপর আমি আর আমার মতো বাকিরা বড় হয়ে গেলাম। আর অবাক হয়ে দেখলাম, জিলাফি খাওয়ানোর মতো দিন বলে কিছু হয় না। দেখলাম, নতুন বছরটা আসলে নতুন নয় একদমই। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো ছাড়া আর কিছু নয়। শুধুমাত্র আরেকটা দিন ! একটা দিনের মতোই আরেকটা দিন !

যদিও পৃথিবী তা মানতে চায় না। ‘মাল্টিন্যাশনাল কনগ্লোমারেট’রা আমাদের ভাবাতে চায় অন্যভাবে। তাই বাঙালির বাৎসরিক উৎসবে ইংরেজি নববর্ষও মহা-ইভেন্ট।

প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর দায় থাকে। নববর্ষের উৎসব নামের প্রদীপের সলতে পাকানোটা চলে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে। সেমিফাইনাল যদি হয় বড়দিন, তবে গ্র্যান্ড ফিনালেটি নতুন বছরের আগের রাতে, রাতভর। অার তার পরই নতুন বছর।

রবার্ট ক্লার্ক বলেছিলেন, ‘আই উড সে হ্যাপি নিউ ইয়ার বাট ইট’স নট হ্যাপি; ইট’স এগ্‌জ্যাক্টলি দ্য সেম অ্যাজ লাস্ট ইয়ার একসেপ্ট কোল্ডার’। আমরা ৩১ ডিসেম্বরের রাত টপকে যখন পা রাখি পয়লা জানুয়ারিতে, তখন সত্যিই কি কিছু পাল্টায় আমাদের জীবনে? রাস্তায় যানজট। উচ্চ শিক্ষার মহা চাপ। নিত্যদিনের ঝামেলা। মনে চাপা কষ্ট। এই সব কিছু কি শেষ হয়ে যায় পুরনো বছরের সঙ্গে সঙ্গে? গোটা পৃথিবী যে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু ‘হ্যাপিনেস’টা কোথায়? মনখারাপের স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ কি সত্যিই নতুন বছরের ভাওয়েল-কনসোনেন্টের তলায় চাপা পড়ে যায়?

যদিও চারপাশে উৎসব আয়োজনের ত্রুটি নেই। ফেসবুক-টুইটার ঝিলমিল করছে উৎসব-অানন্দের বিজ্ঞাপনে। পোস্টের পর পোস্টে লোকজন উজাড় করে দিয়েছে নিজেদের। প্রস্তুতির বিবরণ, কোন কোন জায়গায় যাওয়া হবে, কে কে থাকবে দলে, কোথায় কোন নর্তক-নর্তকী আসছেন, খাবারের প্লেটে কী কী পড়বে এবং শেষপর্যন্ত বর্ষশেষের রাতে কী কী হল— এ সব খবরে মাতোয়ারা সোশ্যাল মিডিয়া।

শুধু ব্যক্তিগত স্তর নয়, সমষ্টিগত স্তরেও একই আলোর প্রতিফলন। সলতে পাকানোর বিবরণ আর বিজ্ঞাপনে সমষ্টিরই পদধ্বনি। কতরকম অনুষ্ঠান, তাতে যোগ দিতে কত টাকার টিকিট কাটা কর্তব্য— সেসব ফলাও করে জানানোর পাশাপাশি নায়ক-নায়িকা, নানা জগতের সেলিব্রিটিদের দিয়ে উৎসবের গৌরচন্দ্রিকার প্রচার। লক্ষ্য একটাই। লক্ষ্য এটা বোঝানো যে, ব্যক্তিগত জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, সত্যিকারের উৎসব আর আনন্দ পেতে হলে এই সব জায়গায় যেতেই হবে ! বোঝানো হয়, স্বর্গ-উড়ানের উড়োজাহাজ এই সব জায়গা থেকেই যাত্রা শুরু করে !

সবটা ভেবে দেখলে কি ‘সারকাজম’ বলে মনে হয়? আসলে তা কিন্তু নয়। বরং কিছুটা যেন নিজেই নিজের কাছে বুঝতে পারার চেষ্টা করা যে, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ চিৎকারের নেপথ্যে কী রয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY