প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ধোলাইখাল ব্যান্ড দখল করবে বিশ্ব বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের সম্ভাবনাময় ‘ধোলাইখাল’ ব্যান্ডে ৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে জীবিকানির্বাহ করছে। এই ব্যান্ডের শ্রমিকরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারি পার্টস থেকে শুরু করে বাইসাইকেল এমনকি ট্রেনের বগি ও যন্ত্রাংশ অনায়াসে নির্মাণ করছেন। হাল্কা প্রকৌশল এই শিল্পের বার্ষিক টার্নওভার ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই শিল্পের উদ্যোক্তারা প্রতি বছর উৎপাদিত যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বিদেশেও রপ্তানি করে আয় করছেন ৫০ কোটি টাকা। পাশাপাশি সরকারকে প্রতিবছর এই শিল্পের উদ্যোক্তারা রাজস্ব আয় দিচ্ছেন ১শ’ ৬৫ কোটি টাকারও অধিক। বিনিময়ে তারা সরকারের কাছ থেকে কোন সুযোগ-সুবিধাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন ধোলাইখাল ব্যান্ডের সাথে জড়িত উদ্যোক্ততা-ব্যক্তিগণ । তারা কৃষি ও আইটি খাতের ন্যায় এই খাতকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনা সুদে ঋণ তহবিলের (ইইএফ) আওতায় আনার দাবি জানান এবং সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে বাঁচানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রসঙ্গ ধোলাইখাল
ঢাকার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে ধোলাইখালও ওতোপ্রোতভাবে জড়িত । বাংলার রাজধানী ঢাকা হওয়ার পর প্রথম সুবাদার ইসলাম চিশতী(১৬১০-১৩ খ্রিস্টাব্দ) বুড়িগঙ্গার সঙ্গে দুলাই নদীর সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি খাল খনন করেছিলেন, যা পরে ধোলাইখাল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।মোগল নৌবাহিনীর যাতায়াতের সুবিধার জন্যই এ খাল নির্মাণ করা হয়। ঢাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য এ খালের ওপর বেশ কয়েকটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। লোহারপুলের কল্যাণেই ধোলাইখাল হয়ে উঠেছিল দর্শনীয় এক স্থান। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কর্মচারী কর্নেল ডেভিডসনও তার ভ্রমণ কাহিনীতে এ পুলের কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯০৯ সালে ধোলাইখাল এবং তার শাখা-প্রশাখাসহ ১২ মাইল জলপথ বন্ধ করে দেয়া উচিত বলে প্রস্তাব দেন তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা।১৯১৭ সালে প্যাট্রিক গেড্ডেস এর নাব্যতা বৃদ্ধির তাগিদ দেন। ১৯৪০ সালেও ধোলাইখাল তার স্বকীয়তা অনেকটা ধরে রাখে। ধীরে ধীরে এর প্রশস্ততা কমতে থাকলে ১৯৬৪-৬৫ সালে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে এর সংস্কার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১, ১৯৮৭ এবং সর্বশেষ ২০০০ সালে খালটি ভরাটের মাধ্যমে হত্যা করা হয় ধোলাইখালকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধোলাইখাল, উত্তর ও দক্ষিণ মৈশুণ্ডি, নবাবপুর, টিপু সুলতান রোড, বনগ্রাম, ওয়ারী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এই শিল্পের বিস্তৃতি ঘটেছে। ধোলাইখাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় অর্ধ লক্ষাধিক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ বা হাল্কা প্রকৌশল শিল্প। এখানকার শ্রমিকদের বেশির ভাগই শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। নেই কারিগরি কোনো শিক্ষা। হাতের অভিজ্ঞতা আর চোখের মাপে তারা নিখুঁত থেকে নিখুঁততর মেশিনারী পার্টস তৈরি করে। যুগ যুগ ধরে বাস্তব অভিজ্ঞতার শক্তিতে বলিয়ান হয়ে ধোলাইখালের শ্রমিকরা একের পর এক যন্ত্রপাতি তৈরি করে চলেছেন। অপরদিকে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করা ছাড়াও মেরামতের শতকরা ৯০ ভাগ কাজ করছে এই শিল্প। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমডি ও পুরনো ঢাকার বাসিন্দা প্রকৌশলী মীর শওকত আলী বলেন, স্বাধীনতার আগে হাল্কা প্রকৌশল শিল্পে বাঙ্গালীদের তেমন অবদান ছিল না। বিহারি ও পাঞ্জাবিদের উদ্যোগে পুরনো ঢাকায় কয়েকটি ওয়ার্কশপ গড়ে তোলা হয়। অবাঙ্গালীদের প্রতিষ্ঠানে বাঙ্গালীরা শ্রমিক হিসাবে কাজ করতো। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে মালিকরা শ্রমিকদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে দেশ ছাড়ে। এভাবেই বাঙ্গালীদের একটি বড় অংশ হাল্কা এই প্রকৌশল শিল্পের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ দিনের শ্রমে-ঘামে আজকের এই ধোরাইখাল সমৃদ্ধ শিল্প সেক্টরটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এমনিতেই গড়ে উঠে ।প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ধোলাইখাল ব্যান্ড দখল করবে বিশ্ব বাজারদেশের বাজারে এই শিল্পের এতটাই চাহিদা যে, ক্রেতারা যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য উদ্যোক্তাদের অগ্রিম অর্থ দিয়ে বুকিং দিয়ে রাখছেন। অথচ দুই দশক আগেও বিভিন্ন শিল্পখাত ও পরিবহন সেক্টরের যন্ত্রাংশের পুরোটাই আমদানি করা হতো। যন্ত্রাংশ ছাড়াও নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে পুরান ঢাকার ধোলাইখালে। চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
রিনা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক মো. নূরুজ্জামান শেখ বলেন, একমাত্র সাবেক এরশাদ সরকারের আমলে শিল্প উদ্যোক্তা ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের একটি দল জাপানে কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছিল। ওই সময় হাল্কা প্রকৌশল শিল্পের উৎকর্ষতা সাধনে সরকারিভাবে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পও চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো তা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে কোনো সরকারই এই শিল্পের উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি। বরং ট্যাক্স আর ভ্যাটের বোঝা চাপিয়ে নানাভাবে শিল্প উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সরকারের ট্যাক্স বিভাগের হয়রানির শিকার হয়ে অনেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ গুটিয়ে বিদেশে চলে গেছেন।
হাল্কা প্রকৌশল শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স এসোসিয়েশনের (বিইআইওএ) সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, দেশি তৈরি যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিবছর শতাধিক আইটেম রপ্তানি করে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ কোটি ডলার আয় হচ্ছে। বাংলাদেশ বছরে ৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করছে। আর হাল্কা প্রকৌশল শিল্প থেকেই দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয় ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার মূল্যের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ।
বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহাবুবুল আলম বলেন, দেশে হাল্কা প্রকৌশল এই শিল্পে প্রায় ৩ হাজার ৮শ’ রকমের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। যার মধ্যে ১শ’ ৩৭টি আইটেম বিশ্বের ১৭ টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়াও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) নিবন্ধিত প্রায় ২ হাজার উদ্যোক্তা বিভিন্ন সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান সাব-কন্ট্রাকের মাধ্যমে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন, বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস কপোরেশন, সিভিল এভিয়েশন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বন্দর ও সমুদ্র পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, তিতাস, বাখরাবাদ ও জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানি, চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে।
সম্ভাবনাময় ধোলাইখাল ব্যান্ড প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

 বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ধোলাইখালে পুরানো যন্ত্রাংশের ব্যবসা শুরু হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে পুরানো ঢাকার ধোলাইখাল । এখানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে। মোটর পার্টসের দোকান ছাড়াও এখানে রয়েছে ড্রাম শিট, লেদ মেশিন, পুরানো লোহা লক্কড়ের দোকান। এতে রয়েছে হাজী মনসুর ‘মার্কেট’, ‘বাঁশপট্টি মার্কেট’, ‘গাছ মার্কেট’ এবং ‘টং মার্কেট।’ হাজী মনসুর মার্কেটে প্রাইভেটকারের স্পেয়ার পার্টস, বাঁশপট্টি মার্কেটে টয়োটা, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য গাড়ির পার্টস, গাছ মার্কেটে বেডফোর্ডের পার্টস, টং মার্কেটে প্রায় সব ধরনের স্পেয়ার পার্টস এবং এর পাশেই গাড়ির পুরানো টায়ার ও রিম পাওয়া যায়। এসব মার্কেটে প্রায় সব ধরনের প্রাইভেটকার, বাস ও ট্রাকের স্পেয়ার পার্টস পাওয়া যায়। সুলভ মূল্যে ভাল রিকন্ডিশন্ড পার্টস কিনতে গাড়ির মালিকরা বাধ্য হয়েই ধোলাইখাল যান। মালিক, কর্মচারি, কারিগর মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষ তাদের জীবিকার জন্য ধোলাইখালের উপর নির্ভরশীল। ধোলাইখালের কারিগররা এখানে কাজ করতে করতে একসময় নিজেরাই দোকানের মালিক হন। এদের দক্ষতা অবিশ্বাস্য। প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি শিক্ষা দেয়া গেলে এরা বিশ্বমানের মোটর মেকানিক হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এখানে মোটর পার্টস ও ইলেকট্রনিক্স তৈরির এক বিশাল সম্ভাবনা গড়ে উঠেছে। লাইনার, পিস্টন, বেয়ারিং থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি মোটর পার্টস, গাড়ির ব্রেকড্রাম, ইঞ্জিন, কার্টিজ, সকেট, জগ, জাম্পার, স্প্রিং, হ্যামার, ম্যাকেল জয়েন্ট, বল জয়েন্টসহ নানা সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। ধোলাইখালে তৈরি মেশিনারি পার্টস ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া ভাল রিকন্ডিশন্ড পার্টসের জন্য ধোলাইখালের দেশব্যাপী সুনাম রয়েছে। পুরনো গাড়ি ভেঙ্গে এখানে পার্টস সংগ্রহ করা হয় । ধোলাইখালের পার্টসের চাহিদা এখন সারাদেশে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ধোরাইখাল ব্যান্ড সারাদেশে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধোলাইখাল ব্যান্ড দিন দিন জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে । অথচ দেশের অপার সম্ভাবনাময় এই ধোলাইখালের মেশিনারি ও পার্টস শিল্প এক সময় বিশ্ব বাজারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন দেশের অভিজ্ঞ মহল ।প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ধোলাইখাল ব্যান্ড দখল করবে বিশ্ব বাজার

ঢাকা বিশারদ অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন বলেন, ধোলাইখালের উৎপত্তি মোগল আমলে সুবেবাংলার রাজধানী হিসাবে ঢাকার জন্মলগ্ন থেকে। ঢাকের আওয়াজের ব্যাপ্তি জুড়ে ঢাকা রাজধানী হওয়ার পর প্রথম সুবেদার ইসলাম খান চিশতি (১৬১০-১৩) বুড়িগঙ্গার সঙ্গে দুলাই নদীর সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি খাল খনন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে দোলাইখাল ও শেষ লোকমুখে ধোলাইখাল নামে পরিচিতি পায়। স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে এলাকায় মোটর পার্টস তৈরির গোড়াপত্তন ঘটে। স্বাধীনতা পরবতরর্তী সময়ে ধোলাইখাল ভরাট হতে থাকে। এইসঙ্গে এখানে প্রসার ঘটতে থাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের।
ধোলাইখালের রীনা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক হাজী নূরুজ্জামান শেখ বলেন, তার প্রতিষ্ঠানটি মোটর গাড়ির সব ধরনের পার্টস মেরামত ও গাড়ির ২৫ শতাংশ যন্ত্রপাতি তৈরি করে থাকে। তিনি বলেন, দেশের চাহিদা মিটিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি যন্ত্রাংশ পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। রপ্তানিকৃত লাইনার, পিস্টন, নজল, বেয়ারিংসহ নানা যন্ত্রাংশ গুণগত মানের দিক থেকে চীন ও জাপানে তৈরি যন্ত্রাংশের চেয়ে অধিকতর টেকসই এবং দামে সস্তা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ফিরোজ আলম জানান, তারা নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন সকেট ক্যাব্ল, বেঞ্চ ওভার সুইচ, লাইট টেপের মতো সরঞ্জামাদির কারখানা। ২০০১ সালে ছোট পরিসরে আরম্ভ করেছিলেন তার কারখানাটি। বর্তমানে ৩৫ জন কর্মচারি নিয়ে দুইটি কারখানা রয়েছে তার। তিনি জানান, ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামাদির চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। দেশে তৈরি এসব জিনিসের দাম খুবই কম। দেশীয় শিল্প বাঁচাতে ভ্যাট কর্তৃপক্ষের হয়রানি থেকে মুক্তি দাবি করেন তারা।
ধোলাইখাল ব্যান্ড এখন বিশ্ব বাজারে 
 দেশের প্রধান মোটরগাড়ির মেরামত কেন্দ্র এবং পুরানো গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল ধোলাইখাল। ধোলাইখালের গাড়ির যন্ত্রাংশের মার্কেটটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে। তখন শুধুমাত্র বাস ও ট্রাকের যন্ত্রাংশই পাওয়া যেত । কারণ ওই সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তে থাকে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশের প্রয়োজনীয়তা; সাথে সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে ধোলাইখালের ব্যবসায়ীদের ব্যবসা। ১৯৮০ সালের পর থেকে এই ব্যবসা বাড়তে থাকে দ্রুততর এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়ার মার্কেট হিসেবে ধোলাইখালের নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশব্যাপী।
বাংলাদেশের যোগাযোগ খাত নির্ভরশীল রিকন্ডিশন যানবাহনের ওপর। এইসব যানবাহনের অনেক যন্ত্রাংশই একটি সময় শেষে নতুন পাওয়া যায়না। ফলে রিকন্ডিশন যানবাহনের মালিকদের শেষ ভরসাস্থল গাড়ির যন্ত্রাংশের এই মার্কেট। এছাড়া সারা দেশের গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসা ধোলাইখালে এখন নগরীর অন্যতম ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র। এখানে ছোট এবং বড় মিলিয়ে প্রায় ৪/৫ হাজার দোকান রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো এসএমই পর্যায়ের। এইসব দোকানে মালিক শ্রমিকসহ ৩০/৪০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। যে কোনো যানবাহনের ইঞ্জিনের নাট বল্টু, চেসিস, বিয়ারিং টায়ার স্প্রিংসহ যে কোনো ছোট অথবা বড় যন্ত্রাংশ সবই পাওয়া যায় ধোলাইখালে। ব্যবসা বৃদ্ধির কারণে অনেক দোকান শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ধরনের যন্ত্রাংশই বিক্রি করছে। কিছু দোকান শুধুমাত্র রিয়ারিং সংগ্রহ এবং বিক্রি আবার কিছু দোকান শুধু টায়ার অথবা স্টিয়ারিংই বিক্রি করছে। ধোলাইখালে যে যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় সেগুলো প্রধানত সংগ্রহ করা হয় পুরনো ও ব্যবহার অযোগ্য যানবাহন থেকে। যেগুলো বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসহ বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নিলামের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়। গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়ার আরও একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে দুর্ঘটনাজনিত কারণে বাতিল হওয়া গাড়ি। এসব গাড়ির ভাল যন্ত্রাংশ পুনরায় ব্যবহার করা হয় এবং বাকি অংশটুকু স্ক্রাপ আকারে বিক্রি করে দেয়া হয়। এছাড়া যন্ত্রাংশের একটি অংশ বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয়। বিদেশ থেকে যে যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয় সেগুলো প্রধানত জাপানী ব্যান্ডের গাড়ির যন্ত্রাংশ। অন্যান্য দেশের কিছু ব্যান্ডের গাড়ির যন্ত্রাংশও আমদানি করা হয়।

বর্তমানে ধোলাইখাল মিনি মোটর ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে পরিণত হচ্ছে। গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যেমন, নিনিয়াম, ব্রেক ড্রাম, প্যাড ড্রাম, ব্রেক সিলিন্ডার, বাম্পার ব্যাকেট, পিস্টন ইত্যাদি লেদ মেশিনের মাধ্যমে ধোলাইখালেই তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া শ্যালো পাম্পের ইঞ্জিন ব্যবহার করে টেম্পো, ট্রাক্টর, ইট ভাঙ্গার যন্ত্রসহ বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে। যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা কিছুটা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। ধোলাইখালে উৎপাদিত পণ্য দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্র্রি এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনিক্যাল সেন্টার এবং নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনাল ১৫ হাজার ডলারের বাম্পার ব্যাকেট, রাবার ব্যাশ এবং সাসপেনশন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির আদেশ দিয়েছে। নমুনা হিসেবে পিস্টন আয়না, ফেন্ডারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশও ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। কর্মসংস্থান ও দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে ধোলাইখাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।পুরনো গাড়িকে নতুন আদল দেয়া, গাড়ির ভেতর ও বাইরের সাজসজ্জা, অচল গাড়ি সচল করা, মেরামতসহ যে কোনো কাজে তারা খুবই দক্ষ। ‘প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে গাড়িও তৈরি করা সম্ভব’ বলে জানান রুবেল নামে ধোলাইখালের একজন মিস্ত্রী। এছাড়া তারা যে কোনো যন্ত্র যেমন জেনারেটর, প্লাস্টিক মেশিনসহ অন্য যে কোনো যন্ত্র মেরামতে সক্ষম। এ প্রসঙ্গে রুবেল আরও বলেন, আমাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাই, সবকিছুই শিখি কাজ করে করে। সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে আমরা দেশের উন্নয়নে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারতাম।প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ধোলাইখাল ব্যান্ড দখল করবে বিশ্ব বাজার

ধোলাইখালের যন্ত্রাংশে গাড়ি চলবে যুক্তরাষ্ট্রে
ঢাকার ধোলাইখালের তৈরি যন্ত্রাংশে গাড়ি চলবে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে রপ্তানির জন্য ইতিমধ্যে গাড়ির যন্ত্রাংশের নমুনা তৈরি করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটাকের গুণগতমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছে নমুনা যন্ত্রাংশ। নমুনার মান দেখতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিদল ঢাকা আসছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি। ধোলাইখালে অবস্থিত দিদার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড এসব যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও জাপান ও কানাডা বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের(বিটাক)কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালিক নিশান রহিম বাংলাদেশে তৈরি গাড়ির বাম্পার ব্যাকেট, রাবার ব্যাশ ও সাসপেনশন কিটস আমদানির জন্য বিটাক ও বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইআইওএ) সঙ্গে চুক্তি করেন। পরে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ থেকে গ্রিল, পিস্টন, মউলুডং, ফেন্ডার ও গাড়ির কাচ আমদানি করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়।
প্রসঙ্গ যন্ত্রাংশ : কী পারে না ধোলাইখাল
বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য পুরান ঢাকার ধোলাইখাল বিখ্যাত । বলা হয়ে থাকে, খুব কম জিনিসই আছে যা কি-না সেখানকার দক্ষ কারিগররা তৈরি করতে পারেন না। যখন ঢাকায় সত্যিই ধোলাইখাল প্রবাহিত হতো সেই তখন থেকে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে অবাঙালি বিহারি ও পাঞ্জাবিরা বিচ্ছিন্নভাবে এখানে তৈরি করতেন বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ। স্বাধীনতার পর ধোলাইখালে কাজ শুরু করেন বাঙালিরা। এখনকার ধোলাইখালে তিন ধরনের ব্যবসা চলে। ১. বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানি ও বিক্রি, ২. যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ আর বাকিরা নিজেরাই ছোট ছোট অন্ধকার ঘরে চাইনিজ, ইন্ডিয়ান আর দেশে তৈরি লেদ মেশিনে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ।
ধোলাইখালের দক্ষ শ্রমিকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। ছোটবেলা থেকেই হাতে-কলমে কাজ করতে করতে শিখেছেন তারা। সাধারণ মানুষের ধারণা, ধোলাইখালের কারিগররা নকল করতে ওস্তাদ, কেউ কেউ ঠাট্টা করে এদের উৎপাদিত পণ্যকে মেড ইন জিনজিরাও বলে থাকেন। এখানকার উৎপাদকরা স্বপ্ন দেখেন একদিন চীন, জাপান ও তাইওয়ানের মতোই তারা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবেন। ধোলাইখালের খুচরা যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারীরা অনেকে দাবি করেন, তাদের পণ্য চীনা পণ্যের চাইতে ভালো। কিন্তু কাঁচামালের অভাব, বিদ্যুৎ সমস্যা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা পৌঁছতে পারছেন না কা  ঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।
ধোলাইখালের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্য সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করছে ট্যাবলেট-ক্যাপসুল প্যাকেটজাতকরণের আধুনিক যন্ত্র। বিদেশ থেকে আমদানি করলে যে খরচ হতো তার চেয়ে অনেক কম দামে তারা দিতে পারছেন এই মেশিন।
ক্রেতাদের জানা দরকার
যন্ত্রাংশের দাম সম্পর্কে ধারণা না থাকলে এ বাজারে ক্রেতাকে পড়তে হতে পারে বিপাকে। সেক্ষেত্রে দাম জেনে রাখা ভালো। যেমন-সেলফ ১৫শ’ থেকে ২ হাজার ৫শ’, ডায়নামো ১৫শ’ থেকে ২ হাজার, ডিস্ট্রিবিউটর ২ হাজার থেকে ৫ হাজার, কার্বোরেটর ২ হাজার ৫শ’ থেকে ৬ হাজার, ফ্যান মোটর ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫শ’, রেডিয়েটর ২ হাজার ৫শ’ থেকে ৭ হাজার, গিয়ার বক্স ২ হাজার থেকে ৭ হাজার, ইঞ্জিন ব্লক ১৫শ’ থেকে ৩ হাজার, পিস্টন সেট ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫ শ, বাল্ব সেট ৫শ’ থেকে ১৫শ’, ক্লাচ প্লেট ৫শ’ থেকে ১ হাজার, প্রেশার প্লেট ১ হাজার ৫শ’ থেকে ২ হাজার, অয়েল পাম্প ১ হাজার ৫শ’ থেকে ২ হাজার, এসি পাম্প ৫শ’ থেকে ৮শ’, প্লাগ ১ হাজার থেকে ৩ হাজার, ইঞ্জিন পুলি ৫শ’ থেকে ১ হাজার ৫শ’, মবিল চেম্বার ৫শ’ থেকে ১ হাজার। ইঞ্জিনও পাওয়া যায় বিভিন্ন মডেলের। যেমন- হানড্রেড ফাইভ এ ৩০ হাজার, ফোর ই ২৭ হাজার, নাইন টি ৫০ হাজার, নাইন টি ফাইভ এ ৩০ হাজার, ফাইভ কে লাইটএজ ৬০ হাজার, ক্রাউন এক্স ১ লাখ, কোরোনা ফোর এক্স এ্যান্ড থ্রি এক্স ৩৫ হাজার টাকা।
কীভাবে পৌঁছাবেন ধোলাইখালে
যে কোনো প্রান্ত থেকে রাজধানী ঢাকার গুলিস্তান হয়ে ধোলাইখালে রিকশায় যেতে খরচ ২০/২৫ টাকা এবং বাসে খরচ ৪ টাকা। মতিঝিল থেকে ধোলাইখালের অবস্থান দক্ষিন পশ্চিম দিকে। মতিঝিল থেকে এখানে বাসে আসা না গেলেও রিকশায় আসা যায় সহজেই। মতিঝিল থেকে ধোলাইখালের রিকশা ভাড়া ৩০/৩৫ টাকা। সদরঘাট থেকে পায়ে হেঁটে ধোলাইখাল আসতে সময় লাগে ১৫ মিনিট ও রিকশায় খরচ হয় ৮ টাকা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY