লবণাক্ততা ও আর্সেনিক দূষণের শিকার ভূগর্ভের ৬০ শতাংশ পানি

এ ওয়ান নিউজ : গোটা বিশ্বের ভূ-উপরিভাগের মোট পানি প্রবাহের এক চতুর্থাংশ বয়ে যায় সিন্ধু-গঙ্গা অববাহিকায়। আর এ পানির ওপর নির্ভরশীল ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রায় ৭০ কোটি মানুষ। বর্তমানে এ অববাহিকার পানি প্রবাহ নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করে দিয়েছে নতুন এক গবেষণা। ২০০০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বার বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে এতে বলা হয়েছে, গঙ্গা-সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির ৬০ শতাংশই পান বা সেচের অনুপযুক্ত, যার প্রধান কারণ অতিমাত্রায় আর্সেনিক দূষণ ও লবণাক্ততা।

গবেষাণাটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার জিওসায়েন্স জার্নালে। গবেষণাপত্রে লেখকরা উল্লেখ করেন, সিন্ধু-গঙ্গা অববাহিকার সরেজমিনে অ্যালুভিয়াল অ্যাকুইফারভিত্তিক (নদীতে জলপ্রবাহের ফলে তৈরি হওয়া নুড়িপাথর ও বালির আস্তরণ) ভূ-গর্ভস্থ পানির অবস্থা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ গবেষণা কাজ চালানো হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের ৩ হাজার ৪২৯টি কুয়ার পানি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গবেষণা থেকে নেয়া তথ্যের পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ভূগর্ভস্থ পানির মান ও অ্যাকুইফারের ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পানির মজুদ বিশ্লেষণ করা হয়।

অ্যাকুইফারের ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পানি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, এর মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ অতিমাত্রায় লবণাক্ত। একই সঙ্গে মানবদেহে বিষক্রিয়ার উপযোগী মাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে ৩৭ শতাংশ।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আর্সেনিকের বর্ধিত মাত্রা সুপেয় পানি নিয়ে শঙ্কা তৈরি করছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেচব্যবস্থা ও ভূগর্ভস্থ পানির পানযোগ্যতার ক্ষেত্রে এ শঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে লবণাক্ততা।

ভূগর্ভস্থ পানিতে স্বাভাবিক ভাবেই কিছু পরিমাণ লবণাক্ততা থাকে। তবে সাধারণত তা সহনীয় পর্যায়েই থাকে। কিন্তু অদক্ষ সেচব্যবস্থা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার কারণে বর্তমানে এ অঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাছবিচারহীন ফসফেট সারের ব্যবহার ও খনিজ উত্তোলন কর্মকাণ্ডের কারণে বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় জনস্বাস্থ্য নিয়ে গভীর শঙ্কার উদ্রেক করছে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া। বাংলাদেশের কুপগুলোর মধ্যে এক তৃতীয়াংশের পানিতে ৫০ পিপিবি (পার্টস পার বিলিয়ন- দেশে আর্সেনিকের নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা) মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ আর্সেনিকের উপস্থিতি দেখা গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, আর্সেনিকের দীর্ঘ সংশ্রবে ক্যান্সার ও ত্বকের ক্ষতে সংক্রমণের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে বাড়ে শিশুর মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি।

ডব্লিউএইচওর আর্সেনিক সংক্রান্ত ফ্যাক্টশিটে বলা হয়, আর্সেনিকের দীর্ঘ সংশ্রবের ফলে যেসব রোগের লক্ষণ ও সংক্রমণ দেখা দেয় তা ব্যক্তি, জনগোষ্ঠী ও এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে। সে হিসেবে, আর্সেনিক উদ্ভূত রোগের কোন নির্দিষ্ট সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই। ফলে আর্সেনিকের প্রভাবের মাত্রা নির্ধারণ বেশ কঠিন।

নতুন গবেষণার ইঙ্গিত হলো, দক্ষিণ এশিয়ায় ভূগর্ভস্থ পানি নিঃশেষ হয়ে পড়ার চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো এর দূষণ। কারণ, ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কোথাও কোথাও কমলেও স্থানবিশেষে তা অ্যাকুইফারের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY