শীতের অপেক্ষায় থাকেন যারা..

আমাদের বাংলাদেশ ষড় ঋতুর দেশ। দু-মাস পর পর ঋতু পাল্টানোই দেশটির বৈশিষ্ট্য। তবে অন্য সব ঋতুর আগমন টের না পাওয়া গেলেও গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীতকালের আগমনী বার্তা ঠিকই পৌঁছে যায় সবার ঘরে ঘরে। বাংলাদেশের ঋতুচক্রে হেমন্ত ঋতুর পর ঠাণ্ডা আমেজ মাখা উত্তরের হাওয়ার সাথে শীতকাল আসে। এই ঋতু বাংলার নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয়গুলো শুকিয়ে দেয়। শীতকালে বেশিরভাগ সময় মানুষ লেপ, কাঁথা, কম্বল মুড়ি দিয়ে জড়াজড়ি করে কাটায়। এই ঋতুকে আরো বৈচিত্র্যময় করে তোলার কাজে কিছু মানুষ ঔতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই মানুষগুলোর গল্প শোনাচ্ছেন নুরুল করিম

খেজুর রসওয়ালা: শীতের শুরুতেই খেজুরের মিষ্টি রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন গাছিরা। গাছের ডাল-পালা কেটে পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে বাঁশের কঞ্চি নল বসানোর কাজটা শীতের প্রকোপ বাড়ার আগেই করে ফেলেন গাছিরা। তেমনি একজন পাবনার অহিদুল্লাহ মিয়া। বাস করেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার আগশুয়াইল গ্রামে। গ্রামটি গাছিদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। পুরো গ্রামের যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই খেজুর গাছ। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই শীতকালে খেজুর রস বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বছরের অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকেন তারা। অহিদুল্লাহ মিয়াও তার বাইরের কেউ নন। প্রতিদিন কয় লিটার রস পান? প্রশ্ন করতেই গাছ থেকে হাঁড়ি নামাতে নামাতে বললেন, ‘৪৫-৫০ লিটার রস সংগ্রহ করি ৮টি গাছ থেকে।’ হাঁড়ি কাঁধে নিয়ে বাড়ি যেতে যেতে নানা কথা হলো তার সাথে। তার কথায় ফুটে উঠলো দুরন্ত শৈশব আর বর্তমান অবস্থার আক্ষেপ। তখনকার শৈশব মানেই নাকি সূর্যদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে রস চুরি করা! তখন খেজুর গাছের সংখ্যা ছিল আরো বেশি। এখন ইটের ভাটা বাড়ার কারণে দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমছে। তখনকার শীতকালটাই নাকি রসের মধ্যে যেত! একবার চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে গিয়েছিলেন অহিদুল্লাহ। কিন্তু নিজেই এখন খেজুর রসওয়ালা। কেউ রস চুরি করলে কি করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে অহিদুল্লাহ বলেন, ‘বকবো! তবে বলে-কয়ে খেলে কিচ্ছু বলবো না।’

winter-morning-palm-juice

খেজুর রস সংগ্রহের পর সেগুলো হাটে কিংবা চুলায় ওঠে। খেজুর রসের গুড় আর নতুন আমন ধানের পিঠাপুলি ও পায়েস তৈরির ধুম পড়ে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে। আর বাজারে দেখা মেলে খেজুর রসের হরেকরকমের খাবার ও মিঠাই।

পিঠা বিক্রেতা: শহরের ফুটপাতে মাটির চুলোয় লাড়কি পুড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন ধরনের দেশীয় পিঠা বানিয়ে বিক্রি করতে ব্যস্ত পিঠা বিক্রেতারা। পিঠাপ্রেমী মানুষরা শীতের পিঠার স্বাদ গ্রহণ করতে ভিড় করছেন দোকানের সামনে। ভ্রাম্যমান দোকানটিতে দুটি চুলা। একটিতে ভাপা পিঠা তৈরির পাতিল বসানো, অন্যটিতে মাটির একটি খোলা। নবান্নের নতুন চালের গুড়ো, গুড় ও নারিকেল ছোট একটি ডাকনার মধ্যে দিয়ে ভাপ দিচ্ছেন দোকানি। খোলায় বানাচ্ছেন চিতই পিঠা। তৈরি হলেই সাথে সাথে পিঠা উঠে যাচ্ছে হাতে হাতে। সম্প্রতি এমন দৃশ্য চোখে পড়ে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায়। শুধু মতিঝিলেই নয়, খোলা আকাশের নিচে পিঠা খাওয়ার দৃশ্য এখন রাজধানীসহ সারাদেশেই।

nai-2

নুর ইসলাম, মতিঝিল এলাকায় নিয়মিত পিঠা বিক্রি করেন তিনি। তার দোকানের সামনে অফিস ফেরত মানুষসহ তরুণ, বৃদ্ধ, যুবকদের ঝটলা সৃষ্টি হয়। দোকানে ঢুঁ মারতেই বললো, ‘মামা কি খাবেন? চিতই না ভাপা’। হাতে একটি গরম ভাপা পিঠা নিয়ে গল্প শুরু করে দিলাম তার সাথে। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। পাঁচবছর ধরে তিনি ভাপা পিঠা বিক্রি করছেন। সাংসারিক কাজের পাশাপাশি তিনি এ পেশা ধরে রেখেছেন। সীমিত বিনিয়োগে ভালো লাভের আশায় প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পিঠা বিক্রি করেন। দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ পিঠা বিক্রি করে প্রায় ৭০০-৮০০ টাকা লাভ করেন। এই ব্যবসা করে তিনি মোটামুটি ভালোভাবে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। শীত শেষে কি করবেন বলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তখন ফল, চা এসব বিক্রি করি। তবে শীতকালের মতো এত লাভ হয় না তখন।’

খেজুর রস, পিঠা ছাড়াও শীতকাল সবজি জন্যও বছরের সেরা মৌসুম। মনকাড়া হলদে রঙের সরষে ফুলের সমরোহ বিস্তৃত মাঠ ও গ্রামের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে। শীতকাল অল্প সময়েই বাঙালির জীবনে বয়ে আনে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি আর বর্ণময় আনন্দঘন মুহূর্ত।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY