হতে চেয়েছিলাম সেনাবাহিনীর অফিসার, হয়েছি ফুটবলার


বাংলাদেশ জাতীয় দলের কিংবদন্তীতুল্য সাবেক গোলকিপার সাফ ফুটবল জয়ী দলের গর্বিত সদস্য আমিনুল হক ফুটবল প্রেমীদের তার ব্যাক্তিগত ব্যাপারের কিছু আগ্রহ আর কৌতুহল মেটাতে এওয়াননিউজের স্টাফ রিপোর্টার নুরুল করিমের মুখোমুখি হয়েছেন। সেই সাথে তিনি বাংলাদেশ ফুটবলের খারাপ অবস্থা থেকে উত্তরনের পথ নিয়ে তার ভাবনা ও ফুটবলকে জমজমাট করে তুলতে দর্শকদের কি করনীয় এইসব ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।

প্রশ্ন: কেমন আছেন?

উত্তর: ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ।

প্রশ্ন: ছোটবেলায় থেকেই আপনি ফুটবল খেলা নিয়ে বেশ আগ্রহী ছিলেন। এই আগ্রহটা কিভাবে এবং কার কাছ থেকে এলো?

উত্তর: আসলে আমার পরিবারটা ছিল স্পোর্টস বান্ধব। আর আমি আমার ভাইয়ের কাছ থেকে থেকে অনেক হেল্প পেয়েছিলাম।

প্রশ্ন: ছোটবেলায় কি হতে চাইতেন?

উত্তর: আমার কাছে শৃঙ্খলা মানাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিষয়। তাই আমি ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীর অফিসার হতে চাইতাম। আর যখন ফুটল খেলা নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকলো তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ফুটবলারই হব।

প্রশ্ন: আপনার লাইফের রিয়েল হিরো কে?

উত্তর: তিনি আমার মা। খুব ছোটবেলায় আমি বাবাকে হারিয়েছি। তারপর বাবা বলি, আর মা বলি ওই একজনই। আগলে রেখে মানুষ করেছেন আমাদের। আমরা তিন ভাই। সবার ছোট হওয়ার কারণে আদর-ভালোবাসার ভাগটা মনে হয় একটু বেশিই ছিল আমার দিকে। যে কথা বলছিলাম, ১৯৯৩ সালে স্থানীয় একটা ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলতে যাই। কী করে জানি আমার দল চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রাইজমানি পাই ১৫০ টাকা। খেলাধুলা করেই শুধু না, আমার জীবনের প্রথম আয় ওই টাকা। আম্মার হাতে যখন তুলে দিলাম টাকাগুলো, তখন তাঁর চোখ-মুখ ছিল দেখার মতো। তখন থেকেই একটু-আধটু খেলার পক্ষে চলে যায় মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি। অবশ্য এর পেছনে খেলোয়াড় বড় ভাইও একটা কারণ বটে। সত্যি কথা হলো, আমি যে আজকের আমিনুল হক এর পেছনে যাঁর অবদান তিনি আমার আম্মা। তাঁর উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও দোয়ার কারণেই ফুটবলার আমিনুল হক হয়েছি।

প্রশ্ন: আপনার জীবনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কি?

উত্তর: যদি খেলা নিয়ে বলি তাহলে অবশ্যই বলতে হবে ২০১০ সালের সাফ গেমসে আমার নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জয় করা । তবে তার চাইতেও বড় প্রাপ্তি হচ্ছে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আমাকে বিএনপির ক্রিড়া সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব দিয়ে সারা দেশের ক্রিড়াঙ্গনকে আরো সমৃদ্ধ করার সুযোগ করে দেয়া ।

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় ক্লাব কোনটি?

উত্তরঃ যদি দেশের কথা বলেন তাহলে যখন ছোটবেলায় খেলা শুরু করি তখন একটা পছন্দ ছিলো। আর যেহেতু বাংলাদেশের ফুটবল আবাহনী এবং মোহামেডান কেন্দ্রিক ছিলো, ছোটবেলা থেকেই আবাহনীর ভক্ত ছিলাম। আর যখন খেলা শুরু করি তখন যে দলে খেলেছি সেই দলেরই ভক্ত। আর বিদেশী ক্লাবের কথা বললে, বার্সালোনার খেলা ভালো লাগে। ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড এর খেলা ভালো লাগতো এখন হয়তো আগের মতো পারফর্ম করতে পারছে না। আরো অনেক ক্লাবের খেলাই ভালো লাগে বিশেষ কোন পছন্দ আসলে নেই।

প্রশ্ন: এই সময়ের গোলকিপারদের ভিতরে কাকে ভালো লাগে?

উত্তর: সর্বশেষ বিশ্বকাপের কথা যদি বলেন তাহলে জার্মানীর ম্যানুয়েল নুয়্যার এর খেলা ভালো লেগেছে তাছাড়া চিলির ব্রাভোও খুব ভালো গোল কিপিং করেছে ওর খেলাও ভালো লেগেছে ।

প্রশ্ন: গোলকিপার না হলে কোন পজিশনে খেলতেন?

উত্তর: (হাসি) সেভাবে তো আসলে কখনো ভাবা হয়নি। ছোটবেলায় যখন বড় ভাইরা খেলতেন পল্লবী মাঠে সেখানে একটা জিনিস হতো সবার ভিতরে যে সবচেয়ে ছোট তাকে গোলপোষ্টে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। গোলরক্ষক পজিশনে কেউ খেলতে চাইতো না, সবাই গোল করতে চায়। তো যখন খেলতে যেতাম বড় ভাইরা আমাকে গোলপোষ্টে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলতেন, দাঁড়িয়ে থাক আর কিছু করা লাগবে না। ওভাবেই আসলে গোলকিপার পজিশনে যাত্রা শুরু তারপর খেলতে খেলতে সখ্যতা। অন্য কোন পজিশনের কথা ভাবার সুযোগ হয়নি।

প্রশ্ন: একটা সময়ে আমাদের ক্লাব ফুটবলের যে জনপ্রিয়তা সেটা এখন একেবারেই নেই বলা যায় …

উত্তর: এই ব্যাপারটা আমি একটু ভিন্নভাবে বলতে চাই। খেলাধূলাটাই আমাদের বিনোদনের মাধ্যম ছিলো আমরা শুধু বিটিভি দেখতাম। সময়ের পরিবর্তে এখন টিভি খুললেই সারা পৃথিবীর খেলা দেখতে পারছি। বার্সালোনা – রিয়াল মাদ্রিদ নিয়ে না হলে এতো উত্তেজনা কেনো দেখছি তাই। আর আমাদের কথা যদি বলেন তাহলে এশিয়াতে না হলেও সাফ ফুটবলে আমরা ভালো পজিশনেই ছিলাম। জনপ্রিয়তাটা আসলে কমে গেছে কেনো? গুটিকয়েক কর্মকর্তার কথা বলা যায় এইজন্য। একটা সময় বাংলাদেশ ফুটবলে মোহামেডান – আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হবার জন্য দল গড়তো, এখন আবাহনী – মোহামেডানের কর্মকর্তাদের চ্যাম্পিয়ন হবার জন্য দল গড়ার মানসিকতাটা নেই। এখন আরো নতুন নতুন ক্লাব এসেছে শেখ জামাল আছে, শেখ রাসেল আছে, মুক্তিযোদ্ধা আছে। যেহেতু প্রতিযোগীতা বেড়েছে নতুন ক্লাবগুলো তাঁদের পয়সা নিয়ে আবির্ভাব হয়েছেন, ফাইনান্সিয়াল কারণে মোহামেডান -আবাহনী ভালো দল গড়তে পারছে না। মোহামেডান -আবাহনী তাদের জৌলুস হারিয়েছে। আর দর্শকদের কথা যদি বলেন – বিনোদনের মাধ্যম ছিলো ফুটবল। আমরা এক সপ্তাহ আগে থেকেই জল্পনা কল্পনা শুরু করে দিতাম কার ফ্ল্যাগ কতো বড়ো হয় সেটা নিয়ে প্রতিযোগীতা হতো। এখন হয় কি? বাংলাদেশের ফুটবলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে ফলাফল সে কারণে কিন্তু দর্শক মাঠে যাচ্ছে না। ফুটবলের জনপ্রিয়তা কমে গেছে সেটা বলবো না, ক্রেজটাও আছে ফুটবলের জন্য মানুষ এখনো পাগল। রেজাল্ট না থাকায় দর্শক উপস্থিতি কমে গেছে, বিশেষ করে ঢাকা স্টেডিয়ামে। আসল বিষয় হচ্ছে বাফুফের কর্মকর্তা যারা আছেন উনাদের ভাবতে হবে বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় যাচ্ছে , বাংলাদেশের মানুষ কি চায়। চাওয়া পাওয়ার মাঝে প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার মাঝে সমন্বয় না করতে পারলে কাঙ্খিত ফলাফল কখনোই আসবে না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে ফুটবলের চাইতে ক্রিকেট জনপ্রিয় কেন?

উত্তর: ব্যাপারটা সিম্পল! বাংলাদেশ ক্রিকেটে বিশ্বকাপ খেলছে এবং ভালো পারফর্ম করছে। এজন্য মানুষের অাগ্রহটা ক্রিকেটের দিকে বেশী।

প্রশ্নঃ জাতীয় দলে বিদেশী খেলোয়াড় খেলানো প্রসঙ্গে…

উত্তরঃ বাংলাদেশী হিসেবে কখনোই চাইবো না একজন বিদেশীকে নাগরিকত্ব দিয়ে খেলাতে হবে। সেটা এই কারনেই চাই না, আমরা ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশ সেখানে ২০-৩০ জন ভালো ফুটবলার নেই বিদেশী খেলোয়াড়কে নাগরিকত্ব দিয়ে ধার করে এনে খেলাতে হবে তা আমি এটা মানতে নারাজ। ভাবতে চাচ্ছিনা আসলে এভাবে। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে ট্যালেন্টেড ফুটবলার আছে, তাঁদের সঠিক পরিচর্যা দিয়ে মূল্যায়ন যদি করা হয় তাহলে অবশ্যই ভালো করবে। এই ধরনের চিন্তাটা কখনোই ইতিবাচক নয় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কথার প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি, আমাদের ফুটবলের যে স্ট্রাকচার সেটা এখনো আমরা সঠিকভাবে শুরু করতেই পারিনি আমি মনে করি। ফুটবলটা হয়ে গেছে ঢাকা কেন্দ্রিক ফুটবল এমন একটা খেলা যেটা সারা বাংলাদেশের হওয়া উচিৎ। প্রত্যেকটি জেলা, উপজেলায় ঘরোয়া ফুটবলটা নিয়মিত হলে খেলোয়াড় সংকটটা কেটে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

প্রশ্ন: ক্রিকেটে যেমন পেসার হান্ট হয় সেভাবে কোন একটা প্রতিযোগীতার আয়োজন করে ফুটবলার বের করা যায় না?

উত্তর: আসলে ফুটবলে তো সেভাবে সম্ভব না, আলাদা করে বাছাই করে যে স্ট্রাইকার বাছাই হবে সে শুধু স্টাইকেই খেলবে। গোলকিপার হয়তো বাছাই করা যায়। আমরা আসলে একটা দীর্ঘ পরিকল্পনা করত পারি সেটা পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনা হতে পারে। জেলাভিত্তিক লীগগুলো নিয়মিত হলে সেখান থেকে ভালো ফুটবলারদের বাছাই করে এনে দল গড়ার জন্য যা যা করা দরকার তা করা উচিৎ, এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিৎ। দশ বছর বয়সের বাচ্চাদের যেমন বয়স ভিত্তিক যে দলগুলো হয়ে থাকে, এই দলগুলোকে ধারবাহিকতার ভিতরে রাখা গেলে ফুটবলারদের সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে যাবে এবং সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে। বিদেশী ফুটবলারদের প্রসঙ্গে বলতে চাই , আমাদের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ফুটবলের যে ফলাফল, সেই দিক থেকে বিবেচনা করে ঘরোয়া ফুটবলে বিদেশী ফুটবলার পাঁচ বছরের জন্য অন্তত একেবারেই বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। তা না হলে বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকেই চলে যাচ্ছে। আমাদের প্লেয়ার সংকট এতোটা প্রকট হয়েছে যে ১৫-২০ জনের বাইরে চিন্তা করতে পারি না, এই কয়জন দিয়ে তো আর বাংলাদেশের ফুটবল চলবে না।

প্রশ্ন: আপনার ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে খেলার কথা ছিলো, কি কারণে আর হয়ে উঠেনি?

উত্তর: শুধু ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে না, আমার সৌদি থেকেও অফার ছিলো। আমাদের যে জার্মান কোচ ছিলো জর্জ কোটান উনিও চেয়েছিলেন আমাকে জার্মান লীগে খেলানোর জন্য। আসলে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেটা হয়েছে আমি একটা দেশ থেকে আরেকটা দেশে যাবো কিছু আইন মেনেই যেতে হবে। তো যখনই এমন কোন সুযোগ এসেছে বাফুফের কর্মকর্তারা কেনো জানি অনাগ্রহই প্রকাশ করেছে। তারা কেনো জানি চাননি আর সে সময়ে আসলে আমাদের দেশে তেমন প্রেক্ষাপটও ছিলো না। আমি নিজে যে উদ্যোগ নিয়ে চেষ্টা করবো সেটাও আর হয়নি। তবে হ্যা আমার কোচ কোটান, ডিডো উনারা চেষ্টা করেছিলেন এই ব্যাপারে। ডিডো যখন ছিলেন তখন দুর্ভাগ্যবশত আমি ইঞ্জুর্ড ছিলাম এইজন্য আর হয়ে উঠেনি। আর অন্যান্য সময়ে বাফুফে থেকে সঠিক সহযোগীতা না করার কারণেই সুযোগগুলো কাজে লাগানো যায়নি।

প্রশ্ন: ফুটবল ভক্তদের উদ্দেশ্যে আপনার বক্তব্য…

উত্তর: আমি, আমাদের যারা ফুটবল ভক্ত আছে তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই ফুটবল এমন একটি খেলা সারা বিশ্বের মানুষ পছন্দ করে। আমরা যারা বার্সালোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থন করছি, হয়তো মেসি – রোনালদোর কারনে বিদেশী দলগুলোর জন্য ফ্যানবেজ তৈরী হয়েছে। আমি মনে করি তাঁর আগে বাংলাদেশের দলগুলোকে সাপোর্ট করা উচিৎ। আবাহনী, মোহামেডান, শেখ জামাল এই ক্লাবগুলোকে নিয়ে যদি তাঁদের এই আগ্রহটা থাকে, ফ্যানবেজ গড়ে উঠে তাহলে সেটা আমার বাংলাদেশের ফুটবল এর জন্য অনেক বেশী পাওয়া হবে।

প্রশ্ন: এত ব্যাস্ততার মাঝেও আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
উত্তর: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY