৪ লাখ মানুষ পানিবন্দী বন্যা কবলিত এলাকায় দুর্ভোগ

এ ওয়ান নিউজ টোয়েন্টি ফোরের খবরে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি  গতকাল থেকে বন্ধ হলেও জেলার চারটি উপজেলায় গত ১০ দিন ধরে ৩২ ইউনিয়নের পানিবন্দি ৪ লাখ মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বন্যার কারণে নদী ভাঙ্গনের তীব্রতাও বেড়েছে। ফুলছড়ি বাঁধে ভাঙ্গনরোধে বালুর বস্তা ফেলে মেরামতের কাজ চলছে।
আসলে এ অবস্থা কেবল গাইবান্ধার নয়। দেশের গোটা উত্তরাঞ্চল এমনকি মধ্যাঞ্চলেও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের পানিতে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী- এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে গাইবান্ধা ছাড়াও  জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনো, বগুড়া, ভোলা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর,  মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, নীলফামারি, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও সুনামগঞ্জ জেলা। এরমধ্যে ১০ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সব নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার। বন্যায় ফসলী জমি, গাছপালা ও বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় কমবেশি ৫০ লাখ মানুষ পানিবন্দী। অনেকে আশ্রয় নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাঁধের ওপর। পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের মৃত্যু ঘটেছে।  জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের দাবি, উপদ্রুত এলাকায় বানভাসীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। কোনো কোনো এলাকায় নামমাত্র ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া হলেও অব্যবস্থাপনা বা সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে তা ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁচ্ছছে না। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে- পানিবন্দীদের উদ্ধারের যেমন চেষ্টা নেই তেমনি তারা ত্রাণসাহায্যও পাচ্ছেন না। ফলে বন্যাকবলিত প্রতিটি এলাকাতেই খাবার পানি ও ত্রাণের জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রাদুর্ভাব ঘটছে পানিবাহিত রোগের। খাদ্য সংকট ও আশ্রয়ের অভাবে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি রক্ষাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বন্যার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ভয়াবহ  নদী ভাঙন। এরই মধ্যে  ভাঙনের কবলে পড়েছে দেশের বিভিন্ন  এলাকার রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, হাট-বাজার, অফিস-আদালত, ঘর-বাড়ি। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আবাদি ফসলের জমি, গাছপালা, ধর্মীয় ও শিাপ্রতিষ্ঠান। দেশের নিম্নাঞ্চলে পানির চাপ বেড়েই চলেছে। জামালপুরে রেল লাইনও ডুবে গেছে। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে রেল লাইনের নিশ্চিত সর্বনাশ ঘটবে। বন্যায় বিস্তীর্ণ সবজি বাগান ডুবে যাওয়ায় এরই মধ্যে তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে কাঁচা তরি-তরকারির বাজারেও। আর কদিন পর হয়তো সবজি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। একই কারণে তলিয়ে গেছে অনেক এলাকার পুকুর, ডোবা ও ঘের। ভেসে গেছে চাষ করা মাছ। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আরিচা-দৌলদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি চলাচল বন্ধ । পানিবন্দি হয়ে পড়ায় শ্রমিকদের কাজ-কর্ম বন্ধ। এতে হতদরিদ্রদের দুর্দশা অবর্ণনীয়। অভাব-অনটনে ঘটেছে আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতিরও অবনতি। বিশেষ করে চোরের উপদ্রব বেড়ে গেছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র বিভিন্ন এলাকা থেকে গবাদিপশু, ছাগলসহ বাড়ী ঘরের মালামাল তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে খুব খারাপ অবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দশ বছরের মধ্যে এবারের বন্যা সবচেয়ে ভয়াবহ।
সবার জানা- বন্যার ভয়াবহতার মূল কারণ প্রতিবেশী ভারত  থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ী ঢল। ভারত পানির চাপ সামাল দিতে অভিন্ন নদীর ওপর দেয়া সব বাঁধের মুখ খুলে দিয়েছে। ফলে টানা বর্ষণের সাথে যুক্ত হয়েছে উজানের ঢল। একদিকে টানা বর্ষণে দেশের অভ্যন্তরে নদী, খাল-বিল পানিতে ভরে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভারত থেকে নেমে আসা পানি ও পাহাড়ী ঢল পরিস্থিতিকে করে তুলেছে বিপদসঙ্কুল।
এমনিতেই দেশের নদ-নদীগুলোর পানি ধারণমতা আশঙ্কাজনক মাত্রায় কমে গেছে। পলি জমে অতি বৃষ্টির পানি ধারণের ক্ষমতাই নেই নদ-নদীগুলোর। তার ওপর আসছে উজানের ঢল। ফলে যা ঘটার তাই ঘটছে। ফারাক্কা বাঁধ চালু করার পর থেকেই ভারত অভিন্ন নদীগুলোর পানি একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে। দেখা যাচ্ছে, তারা শুকনো মওসুমে বাংলাদেশকে ন্যূনতম পানি থেকে বঞ্চিত করছে আর বর্ষা মওসুমে বাড়তি পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশকে বন্যায় ভাসাচ্ছে। ফলে দেশে বর্তমানে যে বন্যা দেখা দিয়েছে তা মানবসৃষ্ট। কিন্তু ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে যেমন সরকারের মাথাব্যথা নেই তেমনি প্রতিবেশী ভারতের বৈরী আচরণ নিয়েও। অপরদিকে দেশের নদ-নদীগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানো বা নাব্যতা রক্ষারও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর  তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩১০টি নদী এবং সেগুলোর প্রায় ৭০০ শাখা রয়েছে। পলি পড়ে এসব নদীর নাব্যতা কমে গেছে। এতে পানি ধারণমতা কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক বৃষ্টিতেও বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়।  এ পরিস্থিতি নিশ্চয়ই কারো কাম্য হতে পারে না। বস্তুত- বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দরকার কার্যকর উদ্যোগ। তবে এই মুহূর্তে বন্যা দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম ও ত্রাণ তৎপরতা জরুরি। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেবে এটাই সবার কাম্য।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY