অলস পড়ে আছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা!

নিজস্ব প্রতিবেদক : অলস পড়ে আছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা! কিন্তু বিনিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেই, তাই এ টাকা কোনো কাজে আসছে না। আবার অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুঁজিবাজারে এই পরিমাণ টাকা সত্যিই পড়ে আছে নাকি শুধু কাগজে কলমে দেখানো হচ্ছে, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।

দেশের দুই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর কাছে অলস পড়ে আছে প্রায় সাড়ে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এ অর্থ রিজার্ভের নামে ফ্রিজিং করে বিনিয়োগের বাইরে রেখে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। অলস এ টাকা বিনিয়োগে আসলে কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মুনাফা বাড়বে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৯৩টি কোম্পানির কাছে ৯৬ হাজার ৪৪৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাস রয়েছে। এর মধ্যে রিজার্ভ সংরক্ষণে শীর্ষে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। এখাতের তালিকাভুক্ত ২৯টি কোম্পানির হাতে রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাস রয়েছে ২৯ হাজার ১২১ কোটি ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভ্রমণ ও অবকাশ খাত। এ খাতের তালিকাভুক্ত ৪ কোম্পানির কাছে রয়েছে ১৮ হাজার ৮৯৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এছাড়া রিজার্ভ সংরক্ষণে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এখাতের ১৯ কোম্পানির কাছে ১১ হাজার ৬৭৬ কোটি ৫২ লাখ টাকার রিজার্ভ রয়েছে।

এছাড়া ওষুধ ও রসায়ন খাতের ২৬ কোম্পানির কাছে রিজার্ভ রয়েছে ৭ হাজার ৭১১ কোটি ৩১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, বিবিধ খাতের ১১ কোম্পানির কাছে ৫ হাজার ৬০৯ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা, আর্থিক খাতের ২১ কোম্পানির কাছে ৫ হাজার ২৯২ কোটি ১১ লাখ ১৪ হাজার টাকা, প্রকৌশল খাতের ২৮ কোম্পানির কাছে ৪ হাজার ৬৬৪ কোটি ১১ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, রিজার্ভ হচ্ছে রিটেইন অব আর্নিং। এক কথায় রিজার্ভের টাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির আস্থার হাতিয়ার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ মুনাফা করলেও তা যথাযথভাবে বন্টন না করে রিজার্ভের নামে সংরক্ষণ করছে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর রিজার্ভের পরিমাণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মুনাফার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে রিজার্ভ থেকে মুনাফা দেয়। কিন্তু দেশীয় কোম্পানিগুলো তা করছে না। এমন পরিস্থিতিতে এ কোম্পানিগুলোর কাছে সত্যি রিজার্ভ রয়েছে নাকি শুধুই কাগজে কলমে রিজার্ভ দেখাচ্ছে তা যাচাই করা উচিত।

অনুসন্ধানে আরো দেখা যায়, বস্ত্র খাতের ৪৩ কোম্পানির কাছে ৪ হাজার ১৩৬ কোটি ৫৯ লাখ ২০ হাজার টাকা, সাধারণ বিমার ৩৫ কোম্পানির কাছে রয়েছে ২ হাজার ৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৮৪০ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, সিমেন্ট খাতের কাছে ১ হাজার ৩৪৮ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা, টেলিকমিউনিকেশন খাতের কাছে ১ হাজার ২৫০ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা, সেবা ও আবসান খাতে ৯০৫ কোটি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, চামড়া খাতে ৫৯৪ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার টাকা, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ৪৮৪ কোটি ৩২ লাখ ৯০ হাজার টাকা, কাগজ ও প্রকাশনা খাতে ৯২ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৭২ কোটি ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ও পাট খাতে ৭১ কোটি ৮০ লাখ ৬০ হাজার টাকা রিজার্ভ রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে সর্বোচ্চ রিজার্ভ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে এ কোম্পানির কাছে ৩ হাজার ১১৯ কোটি ২৬ লাখ ৮০ হাজার টাকার রিজার্ভ রয়েছে।

আর্থিক খাতে সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কাছে। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে এ কোম্পানির পুঞ্জীভূত মুনাফা হয়েছে ২ হাজার ৯০২ কোটি ৪৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক সভাপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কাছে বিশাল অংকের রিজার্ভ থাকলেও তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বন্টন করা হচ্ছে না। যা দুঃখজনক।

তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যদি রিজার্ভের কিছু অর্থ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বন্টন করত তবে তা পুনরায় আবারো বিনিয়োগ হতো।

তালিকাভুক্ত ৩৫টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে গ্রামীন ওয়ান : স্কিম ২-এর কাছে। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে ফান্ডটির ১১৭ কোটি ২০ লাখ ৯০ হাজার টাকার রিজার্ভ রয়েছে।

প্রকৌশল খাতের বিএসআরএম স্টিলের কাছে রয়েছে ৭৩৪ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার টাকার রিজার্ভ। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর কাছে রয়েছে ১৪০০ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার টাকার রিজার্ভ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যমুনা অয়েলের কাছে রিজার্ভ রয়েছে ১ হাজার ৩৯৯ কোটি ৫৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাট খাতের সোনালী আঁশের কাছে ৫৮ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকার রিজার্ভ রয়েছে।

বস্ত্র খাতের সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে মালেক স্পিনিংয়ের। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে কোম্পানিটির রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাসের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫২৪ কোটি ৩০ লাখ ৫ হাজার টাকা। ওষুধ ও রসায়ন খাতে সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে স্কয়ার ফার্মার। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে কোম্পানিটির রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮২ কোটি ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

কাগজ ও প্রকাশনা খাতে সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে খুলনা পিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের। বর্তমানে এ কোম্পানির রিজার্ভের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৪ কোটি ৫০ হাজার টাকা। সিমেন্ট খাতের সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের। এ কোম্পানির রিজার্ভের স্থিতি হয়েছে ৫২১ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার টাকা।

তথ্য প্রযুক্তি খাতে ৩৩ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকার রিজার্ভ সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে শীর্ষে রয়েছে আইটি কনসালটেন্ট। চামড়া খাতের বাটা সু’জের কাছে রয়েছে ২৮২ কোটি ৮২ লাখ ১০ হাজার টাকা।

সিরামিক খাতের শাইনপুকুর সিরামিকসের কাছে রয়েছে ২৭৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা, বিমা খাতের সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের। বর্তমানে কোম্পানিটির রিজার্ভের স্থিতি হয়েছে ৪৯৫ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

টেলিকমিউনিকেশন খাতে সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে গ্রামীণফোনের। বর্তমানে কোম্পানিটির রিজার্ভের স্থিতি ৯২৮ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের সর্বোচ্চ রিজার্ভ রয়েছে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের। বর্তমানে কোম্পানিটির কাছে ১ হাজার ৬৭০ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার টাকার রিজার্ভ রয়েছে। বিবিধ খাতের বেক্সিমকোর কাছে রয়েছে ৪ হাজার ৪৫৪ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা।

এ প্রসঙ্গে প্রকৌশল খাতের সর্বোচ্চ রিজার্ভধারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম স্টিলের কোম্পানি সচিব শেখর রঞ্জন দে পরিবর্তন ডটকমে বলেন, বিএসআরএম স্টিলের সর্বমোট শেয়ারের প্রায় ৭০ শতাংশই উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও বিনিয়োগকারীরা তেমন কিছু পাবেন না। তাই কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিমা খাতের সর্বোচ্চ রিজার্ভধারী প্রতিষ্ঠান গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব সৈয়দ মহিনউদ্দিন আহমেদ বলেন, রিজার্ভের টাকা অব্যবহৃত রয়েছে। যা গ্রাহকদের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।

মূলধনের দ্বিগুণ পুঞ্জীভূত মুনাফাধারী ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ফার্মার সচিব ফেরদৌস জামানের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা ডাইংয়ের শেয়ার বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, রিজার্ভের টাকা অব্যবহৃত রয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY