কল্পনাবিলাসী সৌন্দর্যের লীলাভূমি লোভাছড়া

এওয়ান ভ্রমণ ডেস্ক: নিস্তব্ধতা আপনাকে আপন করতে চায়, কিন্তু আপনারই ফুসরত মিলছে না। হটাৎ করে একদিন মনে হলো, আর পেরে উঠছি না! এবার একটু কোথাও ঘুরে আসা যাক। হাতে যে তালিকাটা আছে, তার প্রায় সবটুকুই দেখা শেষ। এখন নতুন কোনো জায়গার খোঁজে? পাহাড়, মেঘ আর আকাশের মিতালি। স্রোতের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। নীলাকাশে সাদা বকের উড়াউড়ি। বেসুরো গলায় মাঝির মরমী-মুর্শিদি গান। ঢেউয়ের দোলায় ছন্দময় দুলুনি। চোখ জুড়ানো সবুজের আস্ফালন। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা বিশুদ্ধ হাওয়া।

কল্পনাবিলাসী কোনো লেখকের নিখুঁত বর্ণনাই হয়তো মনে হবে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষেই আশ্চর্যময় সৌন্দর্যের লীলাভূমি এক ‘লোভাছড়া’। যেখানে মিশে আছে পাহাড়, মেঘ আর আকাশ!

দেশের উত্তর-পূর্ব সীমন্তে কানাইঘাট উপজেলায় ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া চা বাগান এবং নানা দর্শনীয় স্থান ঘিরেই লোভাছড়ার অবস্থান। ছোট-বড় পাহাড়-টিলা, নদী-নালা ও খাল-বিল পরিবেষ্টিত প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক দর্শনীয় স্থান লোভাছড়া। প্রায় ৫০ বছর আগে নির্মিত টিলাবাবু আর ম্যানেজারের আকর্ষণীয় বাংলো আজো পর্যটকদের বিমোহিত করে।

লোভাছড়া

লোভাছড়ার চা বাগান রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ, ঘন সবুজ বনানী প্রাকৃতিক লেক আর স্বচ্ছ পানির ঝরনা এখানে ঘুরতে আসা লোকজনের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এখানকার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে চা বাগান, প্রাকৃতিক লেক ও ঝরনা, ঝুলন্তসেতু, মীরাপিং শাহর মাজার, মোগল রাজা-রানির পুরাকীর্তি, প্রাচীন দীঘি, পাথর কোয়ারি ও বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন ঘুরতে ঘুরতে কখন যে একটা দিন পেরিয়ে যাবে তা বুঝে উঠতে পারবেন না।

লোভাছড়া সীমান্তে মোগল সাম্রাজ্যের রাজা-রানিদের অনেক পুরাকীর্তি রয়েছে। চোখাটিলা নামক একটি পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঝরনার পাশে রয়েছে প্রাচীনকালের দুটি পাথর। এ পাথর দুটিতে বসে রাজা-রানিরা খেলতেন। পাথরে বসে রাজা-রানিরা লোভাছড়ার সৌন্দর্য নিবিড়ভাবে অবলোকন করতেন।

চা বাগানের পাশে রয়েছে একটি বিশাল দীঘি। এককালে দীঘিতে অনেক অলৌকিক জিনিসপত্র যেমন, থালা-বাসন, রৌপ্যমুদ্রা ইত্যাদি পানিতে ভেসে উঠত বলে লোকমুখে বিভিন্ন মুখরোচক কাহিনী প্রচার হয়ে আসছে। সুরমা নদীর পূর্ব প্রান্তজুড়ে রয়েছে সুবিশাল পাথরের খনি। এখান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক পাথর উত্তোলন করে। এখান থেকে আহরিত পাথর সারা দেশে সরবরাহ করা হয়।

লোভাছড়ায় আসার পথে পাওয়া যায় অসংখ্য টিলা। রাস্তার দুই পাশ ও টিলায় রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি। এখানকার অরণ্যের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে খুবই ভালো লাগে। স্থানীয় বনবিভাগ এখানে একটি সামাজিক বন প্রতিষ্ঠা করেছে। স্থানীয়রা বলেন খুব সকালে হরিণ, খরগোশ, আর বনমোরগ চোখে পড়ে। আর রাতের আঁধারে শোনা যায় বাঘের গর্জন। বলা চলে- লোভাছড়া চা বাগান বন্যপ্রাণীদেরও অভয়াশ্রম। বাগান কর্তৃপক্ষের একটি বিশাল আকৃতির পোষা হাতি রয়েছে, যেটি সবসময় বাগানে অবাধ চলাফেরা করে। এখানকার অরণ্যে বাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু বাস করে। কখনো লোকালয়ে বাঘ চলে আসে।

লোভাছড়ার পাশেই রয়েছে সুরমা, লোভা ও বরাক নদীর মিলনস্থল। তিনটি নদীর মিলন এখানে বদ্বীপের সৃষ্টি করেছে। নদীগুলোর মিলনস্থলে নদীর এক পাশের পানি খুবই স্বচ্ছ এবং অপর পাশের পানি খুবই ঘোলা। একই নদীতে দুই ধরনের পানি দেখে অনেকেই পুলকিত হন।

m_id_396057_shruti_haasan

যেভাবে যাবেন :

দেশের যেকোনো জায়গা থেকেই সিলেট এসে বাসে করে ৬০ টাকা দিয়ে যাওয়া যাবে কানাইঘাট। অথবা সিলেট থেকে অটোরিকশা রিজার্ভ করেও যাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ভাড়া নেবে ৬০০ টাকার মতো। কানাইঘাট থেকে নৌকা করে লোভাছড়ায় যেতে জন প্রতি ভাড়া নেবে ৩০ থেকে ৪০ টাকা করে। চাইলে রিজার্ভ নৌকাও নিতে পারেন।

যা সঙ্গে নেবেন : ক্যামেরা, দুপুরের খাবার, পানি, হালকা নাশতা, লুঙ্গি বা থ্রি কোয়ার্টার।

সাবধানতা :

দল বেঁধে চলবেন, নয়তো পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। নদীতে জলকেলি খেলার সময় গভীরে যাবেন না। সাঁতার না জানলে নদীতে নামবেন না। নদী তীরে কোথাও ডুবোচর আছে কি না, স্থানীয় মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নিবেন। লোভাছড়ায় ঢোকার সময় জুতো পায়ে রাখবেন। সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করবেন না।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY