বন্ধুর সাথে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে লেখালেখি শুরু করি

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: চারদশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন লিখেছেন অসংখ্য উপন্যাস, গল্প ও নাটক। বাংলায় লেখালেখিকেই শুধুমাত্র পেশা হিসাবে বেছে নেয়ার সাহস তিনি দেখিয়েছেন। লেখালেখির পাশাপাশি এখন তিনি বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম গিয়াসুদ্দিন খান এবং মার নাম আনোয়ারা বেগম। তিনি ১৯৭২ সালে পুরনো ঢাকার কাজীর পাগলা হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৪ সালে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯৭৯ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকেই স্নাতক (সম্মান) সম্পূর্ণ করেন।

imdadul-haque-milon

ইমদাদুল হক মিলন লেখক হিসেবে এপার-ওপার দুই বাংলায়ই তুমুল জনপ্রিয়। দুই বাংলায়ই তার ‘নূরজাহান’ উপন্যাসটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কন্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২ শত। অধিবাস, পরাধীনতা, কালাকাল, বাঁকাজল, নিরন্নের কাল, পরবাস, কালোঘোড়া, মাটি ও মানুষের উপাখ্যান, পর, কেমন আছ, সবুজপাতা, জীবনপুর প্রভৃতি তার বিখ্যাত বই।

তার ছেলেবেলা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ছোটবেলার কথাই বেশি মনে পড়ে। আমার ধারনা ৪০ বছর বয়সের পর থেকে মানুষ স্মৃতিকাতর হতে থাকে। ফেলে আসা জীবনের কথা খুউব মনে পড়ে। তার ভুলভ্রান্তির কথা কমবেশি মনে হতে থাকে। আমি এই কাজটা করেছি… যদিও অন্যভাবে করতাম তাহলে হয়তো আরো ভালো হতো। আমি একজন লেখক তাই লেখালেখির কথাই বেশি মনে পড়ছে। অনেক লেখা অযতেœ লিখেছি। পয়সার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে লিখে দিয়েছি। একটি চমৎকার গল্প… হয়তো সময় নিয়ে লিখলে আরো অনেক ভালো করা যেতো। কিন্তু সেটা করিনি। ঈদ সংখ্যার চাপে অথবা প্রকাশকের তাড়ায় চট করে কোন উপন্যাস লিখে দিয়েছি। অথচ একটু সময় নিয়ে লিখলে লেখাটা আরো ভালো করা যেতো… এই ধরনের লেখাগুলোর জন্য আমার খুব মায়া হয়। এজন্য নিজেকে অপরাধীও মনে হয়। মনে মনে ভাবি এটা করা আমার উচিৎ হয়নি। আবার ভাবি এটা করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আমার পাঠক ভক্তরা নিশ্চয়ই জানেন, আজ থেকে ৩০/৩৫ বছর আগে আমি লেখালেখি করেই জীবন ধারনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখনকার দিনে এটা এক ধরনের আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত ছিল। কারন তখন হাতেগোনা কিছু পত্রিকা ছিল। লেখা ছাপার মাধ্যম ছিল খুবই কম। টিভি চ্যানেল ছিল মাত্র একটি। প্রকাশনা ব্যবস্থাও আজকের মতো এতো উন্নত ছিল না। যাও কিছু প্রকাশনা সংস্থা ছিল তারা সহজে বই ছাপতে চাইত না। ছাপলেও রয়্যালিটি ঠিকমতো পাওয়া যেত না। এমন বাস্তবতায় একজন তরুণ লেখক যখন সিদ্ধান্ত নেন যে শুধুমাত্র লেখালেখি করে জীবন ধারণ করবেন এর চেয়ে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত আর হতে পারে না। যেহেতু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম তাই অনেকটা উন্মাদের মতো আমাকে লিখতে হয়েছে। এখন যেমন আমি একটা চাকরি করি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মস্থলে সময় দিতে হয়। আমার লেখালেখির সেই সময় এমনও হয়েছে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা আমি একনাগাড়ে লেখালেখি করেছি। লেখা আদৌ লেখা হচ্ছে কিনা… ভালো হচ্ছে কিনা… সাহিত্যের বোদ্ধারা বিষয়টা কিভাবে নিবেন… পাঠকরা ভালোভাবে নিবেন কিনা… কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? এগুলো না ভেবে আমি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেছি। পয়সার জন্য। জীবন ধারনের জন্য। তখন একটাই চিন্তা ছিল আমাকে যে করেই হোক একটা লেখা দাঁড় করতে হবে। সেটা কোনো না কোনো পত্রিকায় ছাপা হবে। সেখান থেকে আমি কিছু টাকা পাব। ঐ টাকা দিয়ে আমার সংসার চলবে। তবে এমন বাস্তবতায় মাঝে মাঝে আমি খুব মর্মপীড়ায় ভুগতাম। নিজেকে প্রশ্ন করতাম এটা কি ঠিক হচ্ছে? আমি যা করছি তা কি ঠিক করছি? এই যে শুধুমাত্র একটা শ্রেণীর জন্য সস্তা প্রেমের উপন্যাস লিখে যাচ্ছি এটা কি ঠিক হচ্ছে? এই চিন্তা-চেতনার ফাঁকে ফাঁকে আমি অন্যরকম কিছু লেখা লেখার চেষ্টা শুরু করলাম…

লেখালেখি সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে আমার এক বন্ধুর সাথে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে আমি মূলত লেখালেখি শুরু করি। আমার প্রথম উপন্যাসের নাম ‘যাবজ্জীবন’। বাংলা একাডেমীর ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। বিশিষ্ট কবি রফিক আজাদ আমাকে ডেকে নিয়ে উপন্যাসটি উত্তরাধিকারে ছাপা শুরু করেন। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলা দরকার যে সময়ে রফিক আজাদের মতো একজন জনপ্রিয় কবি, বাংলা একাডেমীর উপ-পরিচালক এবং উত্তরাধিকার পত্রিকার সম্পাদক, তিনি অখ্যাত, অচেনা একজন লেখককে ডেকে এনে তার লেখার একটি চ্যাপ্টার শুনেই বলে দেন তোমার এই লেখা লিখতে থাক। লেখা যতই বড় হোক আমি উত্তরাধিকারে ছাপব। এই যে একজন তরুণ লেখকের প্রতি তিনি ভরসা করলেন, একনাগাড়ে দেড় বছর উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ছাপলেন এটি আমার লেখক জীবনে আশির্বাদ হয়ে দেখা দেয়। উত্তরাধিকার পত্রিকায় আমার উপন্যাস ছাপা হওয়ার ফলে সুশীল সমাজ ও বোদ্ধা পাঠকের কাছে আমি যেনো একটু সমাদর পেতে শুরু করি। ফলে লেখক হিসেবে আমার পায়ের তলায় মাটিটাকে আমি শক্ত ভাবতে প্রেরণা পাই।
(বাকি অংশ পর্ব-২ এ)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY