বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাস ডিসেম্বর শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতিবারই আসে দুর্নিবার আকাক্সক্ষার বারতা নিয়ে। হেমন্তের নবান্ন আমোদন আর কুয়াশার চাদর জড়ানো এ মাসের সাথে জাতীয় জীবনের সম্পর্ক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগের। আমাদের মানচিত্র, লাল-সবুজ পতাকা, নিজস্ব সত্তা-পরিচয় ও বিকাশের বীজ এ মাসেই পূর্ণরূপে অঙ্কুরিত হয়েছিল। তাইতো যখনই ডিসেম্বর আসে তখন দেশপ্রেম ও দ্রোহের ফল্গুধারায় প্লাবিত হয় গোটা দেশ, এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশীর প্রতিটি হৃদয়। না বললেও এতক্ষণে সবাই জেনে গেছে, আজ বৃহস্পতিবার পহেলা ডিসেম্বর। বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের এই মাসে বাঙালি জাতির জীবনে নিয়ে এসেছিল এক মহান অর্জনের আনন্দ। ওই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয় প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বিশ্বের বুকে রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশ নামে মানচিত্র রচনা করার ইতিহাস।

পাকিস্তানিদের দ্বারা সুদীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ, বঞ্চনা আর অত্যাচার-নির্যাতনের সমাপ্তি ঘটে ১৬ই ডিসেম্বরে। এবার ১৬ই ডিসেম্বরে পালিত হবে স্বাধীনতার ৪৫তম বার্ষিকী।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে কারান্তরীণ করে হানাদার বাহিনী। শুরু হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ইতিহাসের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। এরপরই শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা প্রতিরোধ। দেশকে স্বাধীন ও মুক্ত করার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিভিন্ন বয়সী শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষ। ডিসেম্বরে বিজয়ের শেষ সময়ে এসে পিছু হটতে থাকে হানাদার বাহিনী।

একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী দেশকে মেধাশূন্য করতে তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আল শামসদের সহযোগিতায় এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় মেতে ওঠে। তাই বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে প্রতি বছরের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেও শেষ রক্ষা হয়নি হানাদারদের। শেষ পর্যন্ত ১৬ই ডিসেম্বরেই পর্যুদস্ত হতে হয় তাদের। ৯ মাস যুদ্ধ শেষে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর আসে মুক্তির স্বাদ।

এদিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সূচিত হয় বাঙালির বিজয়। এরপর স্বাধীন স্বভূমে ফিরে আসে ভারতের শিবিরে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করা প্রায় কোটি নর নারী।

প্রবাসী মুজিবনগর সরকারও দেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নপূরণ হবার পাশাপাশি বহু তরতাজা প্রাণ বিসর্জন আর মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এই বিজয় অর্জন হওয়ায় বেদনাবিধূর এক শোকগাঁথার মাসও এই ডিসেম্বর।

এদিকে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মাসব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

কর্মসূচি : মহান এ বিজয়ের মাস উদযাপনে জাতীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। বিজয়ের মাসের প্রথম দিনেই বিভিন্ন সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করবে। এসব কর্মসূচির মধ্যে আছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিজয়ের মাসকে স্বাগত জানিয়ে সমাবেশ, মানববন্ধন, বিজয় র‌্যালি ইত্যাদি।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমিটি বিজয়ের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে বিজয়ের আলোর মিছিল এবং ধানমন্ডিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানায়।

এদিকে, আজ সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে কলাভবন প্রাঙ্গণের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে একটি ‘বিজয় র‌্যালি’ বের করা হবে। র‌্যালিটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা চত্বরে গিয়ে শেষ হবে। পরে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে মুক্তির গান ও বিজয়ের গান।

মুিক্তযোদ্ধা দিবস বাস্তবায়ন পরিষদ ডিসেম্বরের প্রথম দিনটি ‘মুক্তিযোদ্ধা দিবস’ হিসেবে পালন করবে। এ উপলক্ষে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিখা চিরন্তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

এছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ সকাল ১০টায় বিজয়ের মাসকে স্বাগত জানিয়ে আলোচনা সভা এবং বিজয় সমাবেশের আয়োজন করেছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY