রোমাঞ্চ শেষে মাইলফলক টেস্টে পাকিস্তানের জয়

ক্রীড়া ডেস্ক: পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ৪০০তম টেস্টে জয়ের মঞ্চ প্রস্তুতই ছিল। প্রায় সাড়ে তিনদিন আধিপত্য বিস্তার করার পথে দুবাই টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২২২ রানের বড় লিড পাওয়া মিসবাহ উল হকের দল বড় জয় পাবে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচে রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনে। একটা সময় মনে হচ্ছিল প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে দুবাই টেস্টে বুঝি জিতেই যাবে ক্যারিবিয়ানরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় হলো পাকিস্তানেরই। নিজেদের আনপ্রেডিক্টেবল চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৫৬ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল মিসবাহর দল।

দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তান ৩ উইকেটে ৫৭৯ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে ইনিংস ঘোষণা করে। এর জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে রোববার টেস্টের চতুর্থ দিন প্রথম সেশনে ৩৫৭ রানে গুটিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফলে ২২২ রানের বড় লিড পায় পাকিস্তান।

ক্যারিবিয়ানদের ফলোঅনে না ফেলে ২২২ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে দেবেন্দ্র বিশুর বোলিং তোপে পড়ে মাত্র ১২৩ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে ৩৪৬ রানের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায়। সেটির পেছনে ছুটতে গিয়ে একসময় ৪ উইকেটে ১৯৪ রান করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বোলারদের তোপের মুখে পড়ে ২৮৯ রানেই গুটিয়ে যায়। ফলে ৫৬ রানের জয় দিয়ে সিরিজে ১-০ তে এগিয়ে গেল পাকিস্তান।

আগের দিনের ২ উইকেটে ৯৫ রান নিয়ে সোমবার টেস্টের পঞ্চম দিনে ব্যাটিংয়ে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান ব্রাভো (২৬) ও স্যামুয়েলস (৪)। জয়ের জন্য এদিন দলটির আরো ২৫১ রান প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দিনের শুরুতেই ক্যারিবিয় স্কোর বোর্ডে আর কোনো রান যোগ না হতেই স্যামুয়েলসকে সাজঘরে ফেরান মোহাম্মদ আমির। এর কিছুক্ষণ পরই জার্মেইন ব্লাকউডকে (১৫) এলবি ডাব্লিয়ের ফাঁদে ফেলেন মোহাম্মদ নাওয়াজ। ১১৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে এসময় বেশ চাপে পড়ে জেসন হোল্ডারের দল। কিন্তু একপ্রান্তে আগলে থেকে দলকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন ব্রাভো।

পঞ্চম উইকেটে রোস্টন চেইজের সঙ্গে ৭৭ রানের জুটি গড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জয়ের স্বপ্ন দেখান ব্রাভো। পাকিস্তানি বোলারদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসের মতো এই ইনিংসেও দারুণ ব্যাটিং করেন এই বাঁহাতি। এসময় চেইজকে (৩৫) বোল্ড করে এই বিপদজনক জুটি ভাঙেন ইয়াসির শাহ। এরপরের ওভারেই শেন ডরউইচকে (০) সাজঘরে ফিরিয়ে পাকিস্তানকে ম্যাচে ফেরান ওয়াহাব রিয়াজ।

তবে একপ্রান্তে ঠিকই অবিচল ছিলেন ব্রাভো। সপ্তম উইকেটে অধিনায়ক জেসন হোল্ডারকে নিয়ে আবারো পাক বোলারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েন তিনি। এরমধ্যে ইনিংসের ৮১তম ওভারে মোহাম্মদ আমিরের প্রথম বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে চার হাঁকিয়ে এশিয়ার মাঠে পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন ব্রাভো।

সেঞ্চুরির পর অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি ব্রাভোর ইনিংস। হোল্ডারের সঙ্গে ৬৯ রানের দারুণ এক জুটি গড়ে ব্যক্তিগত ১১৬ রানে দলীয় ২৬৩ রানের মাথায় ইয়াসির শাহর বলে তার হাতেই ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন এই বাঁহাতি।

ব্রাভোর বিদায়ের পর দলীয় স্কোর বোর্ডে আর মাত্র ২৬ রান যোগ হতেই গুটিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ পর্যন্ত জেসন হোল্ডার ৪০ রানে অপরাজিত ছিলেন। ফলে ৫৬ রানের জয় নিয়ে মাঠে ছাড়ে পাকিস্তান। পাকিস্তানের হয়ে মোহাম্মদ আমির ৩টি উইকেট নিয়েছেন। এছাড়া ইয়াসির শাহ ও মোহাম্মদ নাওয়াজ নেন ২টি করে উইকেট।

এর আগে জয়ের জন্য ৩৪৬ রান লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলীয় ২৭ রানের মাথায় ক্রেইগ ব্রাফেটের (৬) উইকেট হারায়। এরপর দ্বিতীয় উইকেটে ড্যারেন ব্রাভো-জনসন চার্লস মিলে ৬০ রানের দারুণ এক জুটি গড়ে ক্যারিবিয়ানদের ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন। দলীয় ৮৭ রানের মাথায় জনসন ফিরে গেলেও চতুর্থ দিনের বাকি সময়টুকু নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দিয়েছিলেন ব্রাভো ও মারলন স্যামুয়েলস। কিন্তু টেস্টের পঞ্চম দিনে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেও হার এড়াতে পারেনি দলটি।

এর আগে ২২২ রানের বড় লিড নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তানকে একাই ধসিয়ে দেন বিশু। পাকিস্তানের প্রথম উইকেটটি শেনন গ্যাব্রিয়েল ও অষ্টম উইকেটটি নেন জেসন হোল্ডার। বাকি আটজনকেই সাজঘরে ফেরার বিশু। এই ক্যারিবিয়ান স্পিনারের দাপটের মুখে পড়েই ১১ রানে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে ১২৩ রানে গুটিয়েছিল পাকিস্তান। দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তানের হয়ে সামি আসলাম সর্বোচ্চ ৪৪ ও বাবর আজম করেন ২১ রান। মিসবাহ উল হক ও সরফরাজ আহমেদ সমান ১৫ রানের ইনিংস খেলেন।

৪৯ রানের বিনিময়ে ৮ উইকেট নেয়া বিশু এশিয়ার মাটিতে সফরকারী বোলারদের মধ্যে সেরা বোলিং ফিগারের রেকর্ড গড়েন। সেই সঙ্গে দুবাইয়ে যেকোনো বোলারের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ডও এটি।

রোববার টেস্টের চতুর্থ দিন ৬ উইকেটে ৩১৫ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে ইয়াসির শাহ ও মোহাম্মদ নওয়াজের বোলিং তোপে পড়ে বেশি দূরে এগোতে পারেনি দলটি। ৩৫৭ রান তুলতেই গুটিয়ে যায় ক্যারিবিয়ানরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্যারেন ব্রাভো ৮৭ ও মারলন স্যামুয়েলস ৭৬ রান করে লড়াইয়ের ইঙ্গিতই দিয়ে রেখেছিলেন। এছাড়া জার্মেইন ব্লাকউড ৩৭, শেন ডরউইচ ও ক্রেইগ ব্রাফেট সমান ৩২ রানের ইনিংস খেললেও অন্যান্যদের ব্যর্থতায় ৩৫৭ রানে গুটিয়ে গিয়ে পরাজয়ের শঙ্কার মুখে পড়েছিল ক্যারিবিয়ানরা।

পাকিস্তানের সফলতম বোলার দ্বিতীয় দ্রুততম ম্যাচে ১০০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়া ইয়াসির। ১২১ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট নেন তিনি। এছাড়া অভিষিক্ত নওয়াজ এবং পেসার ওয়াহাব রিয়াজ নেন দুটি করে উইকেট। সোহেল খান ১ উইকেট পেলেও ২২ ওভারে ৫৪ রান দিয়ে উইকেট শূন্য থাকেন মোহাম্মদ আমির।

এর আগে আজহার আলির ট্রিপল সেঞ্চুরি এবং সামি আসলাম, আসাদ শফিক ও বাবর আজমের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সুবাদে প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেটে ৫৭৯ রানের পাহাড় গড়ে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করেছিল পাকিস্তান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে প্রথম ইনিংসে দেবেন্দ্র বিশু দুটি ও রোস্টন চেইজ নেন একটি উইকেট। বাকি পাঁচ ক্যারিবিয়ান বোলারই উইকেট শূন্য থাকেন।

প্রসঙ্গত, টেস্ট সিরিজের আগে প্রথমে টি-টুয়েন্টি সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে সরফরাজ আহমেদের পাকিস্তান। এরপর ওয়ানডে সিরিজেও একই ব্যবধানে ক্যারিবিয়ানদের হোয়াইটওয়াশ করে আজহার আলির দল। এবার তিন ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথম টেস্টে জিতে ১-০তে এগিয়ে গেল পাকিস্তান।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

পাকিস্তান ১ম ইনিংস: (১৫৫.৩ ওভারে ৫৭৯/৩ ইনিংস ঘোষণা. (আসলাম ৯০, আজহার ৩০২*, শফিক ৬৭, বাবর ৬৯, মিসবাহ ২৯*; বিশু ২/১২৫, চেইজ ১/১০৯ ও দ্বিতীয় ইনিংস ৩১.৫ ওভারে ১২৩/১০ (সামি ৪৪, বাবর ২১, মিসবাহ ১৫. সরফরাজ ১৫; বিশু ৮/৪৯)।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: (আগের দিন ৬/৩১৫) ১২৩.৫ ওভারে ১০/৩৫৭ (ব্রাফেট ৩২, ব্রাভো ৮৭, স্যামুয়েলস ৭৬, ব্ল্যাকউড ৩৭, ডরউইচ ৩২; ইয়াসির ৫/১২১. ওয়াহাব ২/৬৫, নওয়াজ ২/৩৮, সোহেল ১/৫৬) ও দ্বিতীয় ইনিংস: ১০৯ ওভারে ২৮৯/১০ (জনসন ৪৭, ব্রাভো ১১৬, চেইজ ৩৫, হোল্ডার ৪০*; আমির ৩/৬৩, ইয়াসির ২/১১৩, নাওয়াজ ২/৩২, ওয়াহাব ১/৪৭)।

ফল: পাকিস্তান ৫৬ রানে জয়ী

ম্যান অব দ্যা ম্যাচ: আজহার আলি

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY