শুক্রবার 14 ডিসেম্বর 2018 - ৩০, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫

চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন

ক্যামেরার পেছনের খুব শক্ত পরিশ্রমী একজন

ঢাকা | প্রকাশিত ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১১:২৫:০৬

ওমর ফারুক: একের পর এক দৃশ্য সাজিয়েছেন যিনি নিপুণ হাতে, সেই আনোয়ার হোসেনের ব্যক্তিজীবন কিন্তু মোটেও সাজানো-গোছানো ছবির মতো ছিল না। সেখানে ছিল নানা উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনা, মান-অভিমানের এক মহা-উপাখ্যান। সূর্য দীঘল বাড়ী করার সময় পরিচয় হয় অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম, ১৯৭৯ সালে বিয়ে। এরপর বহু সময় কেটে গেছে, পরিবর্তন এসেছে অনেক কিছুরই। ’৯১-এর জুলাইয়ে মারা গেছেন স্ত্রী ডলি আনোয়ার। এরপর বছর পাঁচেক পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ডে।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ‘চলচ্চিত্র পত্র’-এর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র ওপর। সেখানে প্রকাশিত এক লেখায় কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মন্তব্য করেন, ‘এই ছবির ক্যামেরার কাজ জীবন্ত শিল্পের মতো। মনে হতে পারে যে, ক্যামেরাকে অগাধ স্বাধীনতা দিয়ে পরিচালকরা বসেছিলেন অনেক পেছনে। একটির পর একটি দৃশ্য এমনভাবে সাজানো হয়েছে, পরিচালকদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। পেছনে বসে খুব শক্ত ও পরিশ্রমী এবং সর্বোপরি সৃজনশীল হাতে নিয়ন্ত্রণ না করলে ক্যামেরার স্বতঃস্ফূর্ততা এভাবে অনুভব করা যেত না।’ ক্যামেরার পেছনের খুব শক্ত পরিশ্রমী এই সৃজনশীল মানুষটির নাম আনোয়ার হোসেন—যাঁর প্রতিভা ও কর্মকুশলতায় এদেশের চলচ্চিত্র পেয়েছে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র মতো বেশকিছু অসাধারণ চলচ্চিত্র।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

১৯৪৮ সালের ৬ অক্টোবর পুরান ঢাকার আগানবাব দেউড়িতে আনোয়ার হোসেনের জন্ম। বর্তমানে যেখানে তাজমহল সিনেমা হল, ঠিক তার পেছনে। বাঁশের বেড়ার সব ঘর, তার মধ্য দিয়ে চলে গেছে সরু গলি। এতটাই সরু যে, দুজন লোক একসঙ্গে সাইকেলে যেতে পারে না। এখানেই কেটেছে আনোয়ার হোসেনের শৈশব।

বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না, তবে লেখাপড়ায় আনোয়ার হোসেনের আগ্রহ ছিল প্রচণ্ড। প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটায় উঠে পড়তে বসতেন। পড়া যখন সব তৈরি, ততক্ষণে সকাল হয়ে যেত। পাড়ার বাকি ছেলেরা আসত। হাফপ্যান্ট পরা, খালি গা-খালি পা। ওদের সঙ্গে একটা করে বস্তা নিয়ে চলে যেতেন হাটে। ওখানে কাঠ চেরা হতো, সেই কাঠের ছোট টুকরো জড়ো করে বস্তায় ভরতেন। বস্তা প্রতি দাম ছিল আট-ন আনা। এ পরিমাণ রান্নার কাঠ কিনতে গেলে ৩-৪ টাকা পড়ত। সেখান থেকে ফিরে বাজার করে দিয়ে, যেতে হতো স্কুলে।

স্কুলে গিয়ে তাঁকে পড়তে হতো বিচিত্র পরিস্থিতিতে। যদিও বরাবর ফার্স্ট হতেন, কিন্তু ক্লাসে রোল কলের সময় প্রায়ই তাঁর নাম ডাকা হতো না, কারণ বিভিন্ন স্কলারশিপ থেকে টাকা পেলেও সময়মতো মাসিক বেতন পরিশোধ করতে পারতেন না।

স্কুলজীবনে তাঁকে বেশ কয়েকবার বিব্রতকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একবার আরমানিটোলা স্কুলে নিয়ম করা হলো, অ্যাসেম্বলিতে সবাইকে সাদা কাপড় পরতে হবে। কিন্তু তাঁর সাদা কাপড় ছিল না। সাদা কাপড়ের পোশাক ম্যানেজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভবও ছিল না। শেষে তাঁর বাবা হেডস্যারকে বলে কয়ে তাঁর জন্য সেই নিয়ম শিথিল করালেন। এরকম আরো দু-একজন ছিল। কিন্তু তাঁর এটা খুবই খারাপ লাগত। সবার মধ্যে তাঁরা তিন-চার জন আলাদা, স্কুলড্রেসবিহীন।

স্কুল থেকে ফিরে তিনি বাড়ির টুকটাক কাজ করতেন। এরপর সন্ধ্যা হলে পাড়ার বন্ধু সেলিম, দীন ইসলাম, পাশা সবাই মিলে উঠোনে একটা চৌকিতে গোল হয়ে বসে যেতেন লেখাপড়ায়। তাতে করে এক হারিকেনেই সবার কাজ চলত। পড়তে বসা নিয়ে মজার একটা ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন এভাবে—‘‘স্কুলে কী একটা বিষয় নিয়ে রচনা লিখতে বলা হয়েছিল। তখন আমি আমাদের পড়তে বসার একটা বর্ণনা লিখেছিলাম, তাতে আমাদের কুয়োর মতো গোল হয়ে বসা, ওপরে একটা অন্ধকার, তার পরেও ওপরে আকাশ দেখা যাচ্ছে, পাশে একটা ডালিম গাছ, ওপর দিয়ে মেঘ যাচ্ছে, বয়ে নিয়ে যাচ্ছে কত শিশুর সাধ-কল্পনা—এরকম একটা কিছু লিখেছিলাম আর কি? লেখাটা পড়ে আমাদের এক শিক্ষক খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আমি অনেক রচনা পড়েছি, কিন্তু এত সুন্দর রচনা কখনো পাইনি।’’ মেধাবী ছাত্রের প্রতিভাকে যথাযথই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি। এটাই হয়েতো আনোয়ার হোসেনের সৃজনশীলতার প্রথম প্রকাশ এবং প্রথম সংবর্ধনা।

চলচ্চিত্রের রঙিন ভুবন

বাবার সিনেমা অফিসের চাকরির সুবাদে দুটো সুবিধা পেতেন আনোয়ার হোসেন। প্রথমটি সিনেমা দেখার সুবিধা। আশপাশের তাজমহল, শাবিস্তানসহ কয়েকটি সিনেমা হলে নিয়ে গিয়ে বাবা সেখানকার গেটকিপারদের সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ‘আমার ছেলেটা ইংরেজিতে ভালো, কাজেই ইংরেজি ছবি এলে ওকে একটু দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েন।’ সেইমতো সবগুলো ছবি দেখা হয়ে যেত। ‘কত যে ছবি দেখেছি তখন হিসেব নেই। ব্লু লেগুন (সাদা-কালো), ডিসিকা পরিচালিত সোফিয়া লরেনের একটি ছবি, রোমিও-জুলিয়েট, টারজান (সাদা-কালো)। বাংলা ও উর্দু ছবিও দেখা হয়েছে বেশকিছু। ধারাপাত, সুতরাং, জাগো হুয়া সাবেরা... ।’ এইসব ছবি দেখতে দেখতেই অবচেতনে তৈরি হচ্ছিল আগামী দিনের এক আলোকচিত্রশিল্পীর সম্ভাবনা।

আরেকটা জিনিস পেতেন তিনি বিনে পয়সায়। সেটা হলো সিনেমার পোস্টার। তাদের ঘর ছিল বাঁশের বেড়ার। এসব পোস্টার দিয়ে ঘরের বেড়ার ফাঁক বন্ধ করা হতো—যাতে করে ঠাণ্ডা বাতাস ঘরে ঢুকতে না পারে। কিছুটা আব্রুও রক্ষা হতো। এখনকার মোটাদাগের রং-চংয়ে অশ্লীল পোস্টার ছিল না ওগুলো। ছিল দৃষ্টিনন্দন, চিত্তহারী। পোস্টারের প্রায়োগিক দিক নয়, আনোয়ার হোসেনের নজর কেড়েছিল, বলা যায় তাঁর চিত্তকে আচ্ছন্ন করেছিল পোস্টারের ওইসব চমত্কার ছবি। ওসব দেখে দেখে আঁকার ভূতও মাথায় এসে ঢুকল তাঁর। ভেবেছিলেন চিত্রশিল্পী হবেন। ভর্তিও হয়েছিলেন শিশুকলা ভবনে। বেশ কিছুদিন চলেছিল ছবি আঁকা। পরপর দু’বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন ছবি এঁকে। পুরস্কার পেলে বাসার সবাই খুশি হতো। ছবি আঁকার সরঞ্জাম কিনতে হতো না, শিশুকলা ভবন থেকেই পেতেন। তখন যে ছবিগুলো আঁকতেন সেগুলো ছিল নিতান্তই শিশুতোষ। একজন শিশুর পক্ষে যা আঁকা সম্ভব। বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট-প্রকৃতি আর ওপরে সুপারম্যান উড়ে যাচ্ছে বা টারজান এসে হাজির হচ্ছে—এইসব ছিল তাঁর ছবির বিষয়বস্তু। এই নিয়ে শিক্ষকরা বেশ হাসাহাসি করতেন। শিশু আনোয়ার হোসেনের কাছে তখন কিন্তু বাংলার আকাশে টারজান বা সুপারম্যানকে অসম্ভব বা অদ্ভুত লাগেনি। বরং এরকমটা ভাবতে তাঁর ভালোই লাগত।

অনুপ্রেরণা উত্সাহের অভাবেই হয়তো সে-পথে আর বেশি দূর এগোনো হয়নি। তাছাড়া ষাটের দশকে বাংলাদেশের দরিদ্র ঘরের এক ছাত্রের পক্ষে চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। বাসার সবার ইচ্ছা ভালো করে পড়াশোনাটা করা। তাই সেটাই করতে লাগলেন তিনি। লেখাপড়ায় বরাবরই ভালো ছিলেন। এসএসসির রেজাল্টও ভালোই হলো। পাস করলেন স্ট্যান্ড করে। মেধাতালিকায় অবস্থান ছিল পঞ্চম। এরপর ভর্তি হলেন নটর ডেম কলেজে।

ছবি তোলায় হাতেখড়ি

পাঠ্যবই পড়তেন নিয়মিত। কিন্তু পেইন্টিংয়ের বইগুলো পীড়া দিত। ভ্যানগগ, পিকাসো, রবি ঠাকুরের কাটাকুটি ইত্যাদি। তুলি, রঙ-এর জন্য শূন্য হাতটা নিসপিস করত। কলেজে উঠে স্কলারশিপের টাকা দিয়ে ৩০ টাকায় এক বন্ধুর কাছ থেকে কিনে ফেলেন ‘আগফা ক্লাক’, একটা ক্যামেরা। শুরু হলো ছবি তোলার পালা। ছবি আঁকার অপূর্ণ ইচ্ছাই যেন ক্যামেরায় ছবি তোলার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেতে লাগল।

এর মধ্যে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি হয়েছেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। থার্ড ইয়ার পর্যন্ত ক্লাসে প্রথম হয়েছেন। কিন্তু ছবি তোলার নেশাটা যত চালিয়ে যেতে থাকলেন, লেখাপড়ায় ততই ভাটা পড়ল। শুধু ছবি তোলার জন্য ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে সাইকেল নিয়ে চলে যেতেন বুড়িগঙ্গার ওপারে। কিন্তু পরিবার, আত্মীয়স্বজন সবার কাছ থেকে চাপ—পড়াশোনাটা ভালো করে করতে হবে। তাদের চাওয়া নিশ্চিত একটা জীবন।

নিশ্চিন্ত একটা জীবন নাকি ভালোবাসা, এমনি এক দোদুল্যমান অবস্থায় প্রকৃত শিল্পী যেটা করেন, আনোয়ার হোসেনও তা-ই করলেন। ১৯৭৪-এ স্কলারশিপ নিয়ে আচমকাই সিনেমাটোগ্রাফির ওপর ডিপ্লোমা করতে চলে গেলেন ভারতের পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। পড়ে রইল আর্কিটেক্টের নিশ্চিন্ত জীবন, কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে পা বাড়ালেন অনিশ্চিত রোমাঞ্চকর এক জীবনে।

পুনার স্মৃতি

আনোয়ার হোসেনের জীবনে পুনা এক অসাধারণ অধ্যায়। ছোটবেলা পুরান ঢাকায় তাঁর জীবনটা ছিল—একসঙ্গে কাজ করা, লেখাপড়া, খেলাধুলা, হঠাত্ কাছের কোনো গ্রামে চলে সবাই দল বেঁধে দেউড়ি থেকে ঘোড়ার মতো করে দৌড়াতে দৌড়াতে ননস্টপ চলে এসেছেন রমনা পার্ক। মাঝে মাঝে কার্জন হলের কাঠবিড়ালির সঙ্গে কথা বলে আবার ফিরে গেছেন। এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও সবাই মিলে যে আনন্দ, এই আনন্দময় সময় আবার খুঁজে পেয়েছিলেন পুনাতে গিয়ে। যেন পুরান ঢাকারই একটা সেলুলয়েড রূপ। আর একটা বিষয়—শিক্ষকদের অফুরান ভালোবাসা। দেশে যেমন সব জায়গায়, সব শিক্ষকের ভালোবাসা পেয়েছেন; পুনাতে গিয়েও ঠিক তেমনি প্রতিটি শিক্ষক তাঁকে ভালোবাসতেন। বিশেষ করে অধ্যক্ষ তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। অন্যদের চেয়ে একটু অগ্রসর ছিলেন, সে জন্যই হয়তো নজর কেড়েছিলেন সবার।

আখিরা কুরোসাওয়ার ক্ষণিক সান্নিধ্য

প্রায় প্রতি মাসে একজন করে বিখ্যাত লোক আসতেন পুনায়, তাঁদের সঙ্গে পরিচয় হতো ইনস্টিটিউটের ছাত্রদের—এই অভিজ্ঞতাও ছিল বেশ মজার। একবার জাপানি পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া এলেন ওখানে, তখন তাঁদের ডিন তাঁর সঙ্গে আনোয়ার হোসেনকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এ বাংলাদেশ থেকে এসেছে, আমাদের একজন স্পেশাল ছাত্র। ও খুব ভালো ছবি তোলে, আমি অনুমতি দিয়েছি, এখন যদি আপনি একটু অনুমতি দেন তাহলে আজকের দিনটা আপনার সঙ্গে থেকে কিছু ছবি তুলবে।’

কুরোসাওয়া অনুমতি দিলেন। তাঁর ছবি তুলতে তুলতে একটা বিষয় নিয়ে খুব বিরক্ত হচ্ছিলেন আনোয়ার হোসেন। সেটা হলো কুরোসাওয়ার চোখের চশমা। বাইরে তো বটেই, এমনকি প্রিন্সিপালের রুমে যখন আলাপ করছিলেন তখনো ওনার চোখে আঁটা ছিল কালো কুচকুচে ওই চশমা। মুহূর্তের জন্যও খুলছেন না। যেন ওটা তাঁর শরীরেরই একটা অংশ। আনোয়ার হোসেন একপর্যায়ে তাঁকে বলেই ফেললেন, ‘এটা কেমন কথা, আপনি আপনার চোখ দিয়ে মানুষের হূদয় দেখেন, ছবি বানান, অথচ নিজে চোখে সারাক্ষণ চশমা পরে থাকেন। এটা একটা খারাপ বিষয়। আপনি যদি চশমাটা খুলতেন, এটা আমি আমার ছবির জন্য চাচ্ছি, কারণ চোখ তো কথা বলে, চলচ্চিত্রে আপনার ক্লোজ-আপগুলোও কথা বলে...’ একটু মুচকি হেসে কুরোসাওয়া তাঁর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর প্রিন্সিপালকে বললেন, ‘এই ছেলেটা তো বেশ, চলচ্চিত্র আর ভিজ্যুয়াল মাধ্যমটা বেশ ভালো বুঝেছে।’ তখন প্রিন্সিপাল বললেন, ‘এই জন্যই তো শুধু তাঁকেই আমরা আপনার সঙ্গে থেকে ছবি তোলার সুযোগ দিয়েছি।’ যাহোক, কুরোসাওয়া শেষ পর্যন্ত চশমা খুললেন না। বললেন, ‘আমারও তো কন্ডিশন থাকতে পারে বাছা। আমার একটা কারণ আছে যার জন্য আমি চশমা খুলব না। তুমি তোমার হূদয় দিয়েই দেখ। উনি চশমা না খুললেও ওনার সঙ্গ ছিল আনেয়ার হোসেনের জন্য এক অন্যরকম পাওয়া। আনোয়ার হোসেনের মতে, ‘সে সময়টা ছিল আমার জীবনের স্বর্ণযুগ। ওখানকার প্রতিটি দিন আমার কাছে স্বপ্নময় একেকটা দিন।’

সূর্য দীঘল বাড়ী এবং

ডিপ্লোমা শেষ করে পুনা থেকে দেশে ফিরে এলেন। কাজ শুরু করলেন মসিউদ্দিন শাকেরের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ আর বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ দিয়ে। পকেট তখন গড়ের মাঠ। সাত মাসের বাড়িভাড়া বাকি। ছোট ভাই আলী হোসেন বাবুর এসএসসি পরীক্ষার ফি দিতে পারেননি বলে ওর আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। কিন্তু এতসব কিছুর মাঝেও তাঁর ধ্যান তখন একটাই, ছবি দুটোর কাজ শেষ করতে হবে। চলচ্চিত্রকর্মের প্রথমদিককার কথা স্মরণ করে তিনি বলতেন, কাজ তো নয় যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র।

স্বেচ্ছানির্বাসন

আনোয়ার হোসেনের মতে, ‘এই অঙ্গনে কাজ করতে এসে প্রথম দিন থেকে যে বাধা সেই বাধা শেষ হয়নি। ভালো কাজ করতে গেলেই বিভিন্ন সময় নানামুখী বাধা এসেছে।’ এদেশের নানা প্রতিষ্ঠানে অরাজকতা এবং শিল্পীর অপমান তাঁকে ক্ষুব্ধ করত নিয়তই। শেষপর্যন্ত ১৯৯৩ সালে অভিমান করে দেশ ছেড়ে চলেই যান। বসবাস শুরু করেন প্যারিসে। এটা ছিল তাঁর একধরনের ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’।

দেশত্যাগের কারণ বিস্তারিতভাবে না বললেও তাঁর কয়েকটি আফসোসের কথা জানা যায়, ‘আমার প্রকাশিত চারটা বই থেকে পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে সবাই যার যেমন খুশি তেমন করে ব্যবহার করছে, কিন্তু নিচে আমার নামটা লিখে সামান্য সৌজন্য দেখানোর প্রয়োজনও কেউ বোধ করে না। ‘অন্য জীবন’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক মনোনীত হলে সেই পুরস্কার তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং কেন প্রত্যাখ্যান করলেন তা ই-মেইল করে এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটা দৈনিকে লিখিত বার্তা পাঠিয়েছেন কিন্তু কেউ সেটা ছাপেনি। আবার ‘লালসালু’ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক হিসেবে যে পুরস্কার তিনি পান সেটা তাঁর অজান্তেই এফডিসিরই একজন গ্রহণ করেছেন। যদিও সে পুরস্কারের খবর সরকারিভাবে তাঁর কাছে পৌঁছায়নি।’ পুরস্কার-সম্মাননা ইত্যাদির প্রতি কোনোকালেই তাঁর আগ্রহ ছিল না।

যখন যাযাবর জীবন

একের পর এক দৃশ্য সাজিয়েছেন যিনি নিপুণ হাতে, সেই আনোয়ার হোসেনের ব্যক্তিজীবন কিন্তু মোটেও সাজানো-গোছানো ছবির মতো ছিল না। সেখানে ছিল নানা উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনা, মান-অভিমানের এক মহা-উপাখ্যান। সূর্য দীঘল বাড়ী করার সময় পরিচয় হয় অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম, ১৯৭৯ সালে বিয়ে। এরপর বহু সময় কেটে গেছে, পরিবর্তন এসেছে অনেক কিছুরই। ’৯১-এর জুলাইয়ে মারা গেছেন স্ত্রী ডলি আনোয়ার। এরপর বছর পাঁচেক পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ডে। অবশেষে ১৯৯৬ সালে আবার বিয়ে। স্ত্রী মরিয়াম ফরাসি, ফ্রান্সেই থাকতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ এবং ফ্রান্স দু দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে কাটিয়েছেন এক যাযাবর জীবন। একধরনের অভিমান থেকেই ১৯৯৩ থেকে অবস্থান করেছেন প্যারিসে। সেখানে স্ত্রী ও দুই ছেলে আকাশ ও মেঘদূত রয়েছে। কিন্তু তারপরও কাজের অজুহাতে বারবার ফিরে আসতেন দেশে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

ক্যামেরা কেনার পর প্রথম দিনের প্রথম রিলের শেষ ছবির বিষয় ছিল ‘ধোপা কাপড় ধুচ্ছে’। ১৯৬৯ সালে এই ছবিটাই গোলাম কাশেম ড্যাডির ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব আয়োজিত প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কার পায়। তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার পান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাপানের আশাহি পেইন্টিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে। চতুর্থ পুরস্কার পেয়েছিলেন সে-বার। সেই মেডেল এবং সার্টিফিকেট করাচিতে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছিল।

তবে যে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্তির কথা নানা কারণে তাঁর মনে দাগ কাটত সেটি ’৭৮ সালের ঘটনা। সে-বার কানাডায় কমনওলেথ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ৯টির মধ্যে ৬টি মেডেলই জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। বিচারকমণ্ডলীর প্রধান ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ইউসুফ কার্শ। এই অসাধারণ সাফল্যের সুবাদেই পরের বছর সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় একক বিচারক হিসেবে তাঁকে মনোনীত করা হয়। মাত্র ৩২ বছর বয়সে এমন মর্যাদা এর আগে অন্য কেউ পাননি।

তবে যে পুরস্কারটি তাঁর মনকে ভরিয়ে দিয়েছিল কানায় কানায় সেটি তাঁর সেই আগানবাব দেউড়ির ছোটবেলার বন্ধুদের দেওয়া। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি এক ঘরোয়া সংবর্ধনায় তাঁরা তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন একটা সিলভার প্লেটের প্লাক। শৈশবের বন্ধুদের সেই উপহার তিনি অন্তরের মণিকোঠায় আমৃত্যু তুলে রেখেছিলেন।



এ সম্পর্কিত খবর

হবিগঞ্জের বানিয়াচং দু’পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত

হবিগঞ্জের বানিয়াচং দু’পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত

মঈনুল হাসান রতন হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় বিল দখল নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে মতিউর রহমান

নির্বাচনে তিন স্তরের নিরাপত্তা, ২৪ ডিসেম্বর সেনা মোতায়েন

নির্বাচনে তিন স্তরের নিরাপত্তা, ২৪ ডিসেম্বর সেনা মোতায়েন

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে

বড়দিনের এপেটাইজার ‘সান্তা ডেভিল এগ’

বড়দিনের এপেটাইজার ‘সান্তা ডেভিল এগ’

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: বড়দিনে অতিথি এলে একটু ভিন্ন কিছু খাওয়াতে না পারলে যেন গৃহিণীর কিছুতেই


আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়লেন ১০২ বছর বয়সী এক নারী (ভিডিও)

আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়লেন ১০২ বছর বয়সী এক নারী (ভিডিও)

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ার লংহর্ন ক্রিকের মাঝ আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়লেন ১০২ বছর বয়সী এক

কুড়িগ্রাম-১ আসনে কর্মী নেই, প্রার্থীর নিজেই মাইকিং করে প্রচারণা!

কুড়িগ্রাম-১ আসনে কর্মী নেই, প্রার্থীর নিজেই মাইকিং করে প্রচারণা!

অনিরুদ্ধ রেজা,কুড়িগ্রাম: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীরা নিজে, দলের কর্মী এবং সমর্থক নিয়ে নির্বাচনী

কলাপাড়ায় “জনতার ইশতিহারে জনদাবী” তৃনমূল পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন     

কলাপাড়ায় “জনতার ইশতিহারে জনদাবী” তৃনমূল পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন     

রাসেল কবির মুরাদ , কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি ঃ  কলাপাড়ায় আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃনমূল


বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের যারা রক্ষার চেষ্টা করছে, তাদেরও বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী

বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের যারা রক্ষার চেষ্টা করছে, তাদেরও বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

জনগণের কল্যানে তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে: আবু হাসান টিপু

জনগণের কল্যানে তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে: আবু হাসান টিপু

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য জননেতা কমরেড আবু হাসান টিপু বলেছেন,

প্রবাসী বান্ধব নির্বাচনী ইশতেহারের জোর দাবি আয়েবার

প্রবাসী বান্ধব নির্বাচনী ইশতেহারের জোর দাবি আয়েবার

মাঈনুল ইসলাম নাসিম : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই তাদের



আরো সংবাদ

মওলানা ভাসানীর জন্মবার্ষিকী আজ

মওলানা ভাসানীর জন্মবার্ষিকী আজ

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১১:১৩

‘আমাদের সেই যোগ্যতা আছে’

‘আমাদের সেই যোগ্যতা আছে’

১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:২৮


বেগম রোকেয়ার জন্ম-মৃত্যু দিন আজ 

বেগম রোকেয়ার জন্ম-মৃত্যু দিন আজ 

০৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১১:৩৮

বলিউডের প্লেব্যাক রাণী

বলিউডের প্লেব্যাক রাণী

০৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১১:২২





এই শহরে একদিন এলেন এক নায়ক

এই শহরে একদিন এলেন এক নায়ক

৩০ নভেম্বর, ২০১৮ ২২:৫৮


ম্যারাডোনা '৯০ কীর্তি!

ম্যারাডোনা '৯০ কীর্তি!

২৯ নভেম্বর, ২০১৮ ১৮:৫৯


ব্রেকিং নিউজ