চট্টগ্রামে র‌্যাবের সাথে ‘গোলাগুলিতে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত


চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম নগরীতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অসীম রায় বাবু (৪০) নামে একজন নিহত হয়েছেন। অসীম রায় বাবু ইয়াবাসহ একাধিক মাদক মামলার আসামি। চট্টগ্রামে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল।

বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) রাত ১২ টার দিকে নগরীর মুরাদপুর-বিবিরহাট সড়কের রেলক্রসিং এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। পাল্টাপাল্টি গোলাগুলিতে র‌্যাবের চট্টগ্রাম জোনের একজন উপ-অধিনায়কসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তারা হলেন, র‌্যাবের উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার শাফায়াত জামিল ফাহিম, র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর হাসান, ল্যান্স কর্পোরাল শহীদ ও আবু।

তাদের চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের চট্টগ্রাম জোনের সহকারি পরিচালক এএসপি মিমতানুর রহমান।ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মিমতানুর বলেন, প্রাইভেট কারে চড়ে অসীম রায় বাবু বিবিরহাটের দিকে যাচ্ছিলেন। র‌্যাবের চেকপোস্টে গাড়ি থামানোর সংকেত দিলে অসীম তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এসময় র‌্যাব সদস্যরা পাল্টা গুলি ছোড়ে। পাল্টাপাল্টি গুলিতে অসীম গুলিবিদ্ধ হয়। র‌্যাবেরও চার সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ঘটনার সময় অসীম রায় বাবুর মাদক ব্যবসার সহযোগী গাড়িচালক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে জানান মিমতানুর।তবে ঘটনার প্রায় একঘন্টা পর অসীম রায় বাবুর গাড়িচালক জাহেদ হোসেনকে নগরীর মুরাদপুরে মানুষের জটলার মধ্যে পাওয়া যায়।

কিশোর বয়সী জাহেদ হোসেন জানান, রাত ১২ টার দিকে অসীম রায় বাবু তার এফ প্রিমিও মডেলের প্রাইভেট কারে চড়ে নগরীর ষোলশহর সুন্নিয়া মাদ্রাসার পাশের এলাকায় নিজ বাসায় যাচ্ছিলেন। রেলক্রসিংয়ের সামনে একদল সাদা পোশাক পরিহিত লোক গাড়ির গতিরোধ করে। এসময় অসীম রায় বাবু গাড়ির কাচ নামিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চান। তখন তারা অস্ত্র বের করে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। গোলাগুলির মধ্যে দৌড়ে মুরাদপুরের দিকে তিনি পালিয়ে আসেন বলে জানিয়েছেন।

ঘটনার পর র‌্যাবের একজন সদস্যকে কড়া প্রহরায় অসীম রায় বাবুর গাড়িটি চালিয়ে নিতে দেখা গেছে। গাড়ির চালকের বামপাশে যাত্রীর সিটের সঙ্গে লাগোয়া কাচ ভাঙ্গা দেখা গেছে। তবে গাড়ির অন্য কোথাও তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়নি।

ঘটনা শুনে সেখানে যাওয়া নগরীর পাঁচলাইশ থানার এসআই আব্দুল গফুর বলেন, ঘটনাস্থলে একজনের লাশ দেখেছি। আরও দুজনকে আহত অবস্থায় দেখেছি। র‌্যাব কর্মকর্তা এএসপি মিমতানুর রহমান জানান, ঘটনার খবর পেয়ে অসীমের বাবা ও ভাই ঘটনাস্থলে আসেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

অসীম রায় বাবু নগর পুলিশের তালিকায় ডাইল বাবু হিসেবে পরিচিত। তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল গ্রামের গুরুসদয় রায়ের ছেলে। নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারের মোহাম্মদীয়া প্লাজায় তার একটি দোকান আছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর একটি থানার ওসি বলেন, রিয়াজউদ্দিন বাজারের দোকানটি ছিল মূলত তার ইয়াবা কেনাবেচার ঘাঁটি। সেখান থেকেই পুরো নগরীতে সে ইয়াবা ছড়িয়ে দিত।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ৫ মার্চ ও ১৩ মার্চ অসীম রায় বাবুর বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় মাদক আইনে দুটি মামলা দায়ের হয়। ১ মার্চ মারামারি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল।চলতি বছরের ৫ মার্চ মধ্যরাতে নগরীর নন্দনকাননে কেন্দ্রীয় যুবলীগের উপ-অর্থ বিষয়ক সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের বাসা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে অসীম রায় বাবু। এই ঘটনায় বাবরের ভাই বাদি হয়ে কোতোয়ালী থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ ও অসীমের ঘনিষ্ঠজনদের সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম নগরীর মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করে এমইএস কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন অসীম। তখন তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছাত্রলীগের ক্যাডার হিসেবে পরিচিতি পান। ওই বছরই অস্ত্রসহ গ্রেফতারের পর তার সাত বছরের জেল হয়।

যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী হিসেবে দীর্ঘদিন নগরীর নন্দনকানন, রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ আশপাশের এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নগরীর আলকরণ ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।তিন বছর আগে বাবরের গ্রুপ ছেড়ে যান অসীম রায় বাবু। এর আগেই অসীম ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন বলে তথ্য আছে পুলিশের কাছে।

সূত্রমতে, মূলত বাবরের বন্ধু কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য গাজী জাফরউল্লাহ’র সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে অসীম রায় বাবু আলাদা একটি বলয় তৈরি করেন। নিজেকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। নিজেকে যুবলীগ নেতা হিসেবেও পরিচয় দিতে থাকেন। এরপরই অসীম রায় বাবু আরও বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনদের কয়েকজন জানিয়েছেন।


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের  কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।