শনিবার 19 জানুয়ারী 2019 - ৬, মাঘ, ১৪২৫

"আইয়ুব বাচ্চু কেন এভাবে কাঁদালেন আমায়?"

মিলি সুলতানা   | প্রকাশিত ২১ অক্টোবর, ২০১৮ ১৬:২৪:০৯

ঘটনাটা ৯৫ সালের জুলাইয়ের দিকে। আইয়ুব বাচ্চুর সাক্ষাতকার নেয়ার পরিকল্পনা করলাম। যোগাযোগ করলাম সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন  ছায়াছন্দ ও মনোরমার পক্ষ থেকে। আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ইয়ং জেনারেশনের কাছে যিনি এক দূর্দান্ত ক্রেজে পরিণত হয়েছেন। সাক্ষাতকার  নেয়ার জন্য ঢাকায় আমাকে এক সপ্তাহ বেশি অবস্থান করতে হয়েছিলো। কারণ কোনভাবেই বাচ্চু ভাইয়ের শিডিউল পাওয়া যাচ্ছিলো না। এই মানুষটা এতো বেশি সহজ সরল যে প্রথম ফোনালাপেই আমি তাঁর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়লাম। তাঁর গানের সাথে আমার নিরবিচ্ছিন্ন প্রেম শুরু হলো। ফোনে যখন হ্যালো বলতেন হার্টবিট বেড়ে যেতো আমার। এতো অ্যাট্রাকশন তাঁর কণ্ঠে! ফোনে বাচ্চু ভাইয়ের অসম্ভব স্মার্টলি হ্যালো বলার ধরণ শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়তাম। এদিকে আমাকে শিডিউল দিতে তাকে হিমশিম খেতে দেখেছি। আমাকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছিলেন বাচ্চু ভাই। কারণ আমি ঢাকা গিয়েছি চট্টগ্রাম থেকে ---- এটা তাঁর মাথায় ছিলো। তিনি চট্টগ্রামের ছেলে আর আমি জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের না হলেও স্থায়ী বাসিন্দা।  সুতরাং এখানে একটু চট্টগ্রামপ্রীতি তো ছিলই।


কিন্তু সুরের এই গিটারের নাগাল পাচ্ছিলাম না। একদিন  সন্ধ্যায় ফোনে আমার সাথে তাঁর স্ত্রী চন্দনাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ব্যক্তিগত বিষয়াদি জানতে আমাকে সাহায্য করবে চন্দনা ভাবী। বাচ্চু ভাই বললেন, "চন্দনার সাথে কথা বলে ইন্টারভিউ'র আর্ধেক সেরে ফেলতে পারবেন। বাকী আর্ধেকের জন্য আমার মগবাজারের অফিসে চলে আসবেন।" সেদিনই বুঝেছি আইয়ুব বাচ্চু একজন অসাধারণ ব্যক্তি। খুবই সিম্পল তার মন মানসিকতা। তখন তাঁদের কোলজুড়ে ছিল কন্যা ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব বাবানী। নামটি আমার খুব ভালো লেগেছে। কন্যার জন্য কত উচ্ছ্বাস সেটা দেখেছি তাঁর চোখেমুখে। পরে শুনলাম কন্যার ডাকনাম বাবানী চেঞ্জ করে অন্য নাম রাখা হয়েছে।

আমি ভরদুপুরে মগবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। একটা কথা না বললেই নয়। এসব ক্ষেত্রে আমাকে খুব সহযোগিতা করেছেন আমার সেজোভাবীর মা। আমি মগবাজার যাবো সেজন্য ড্রাইভারসহ নিজের গাড়িটি আমাকে দিয়ে রেখেছিলেন। রাজ্যের জ্যাম ঠেলেঠুলে অবশেষে  মগবাজার গেলাম। কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে  ঢুকলাম। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে হ্যালো স্মার্ট লেডি সম্বোধন করে আমার সাথে হ্যান্ডশেক করলেন বাচ্চু ভাই। মজার ব্যাপার হল আমাদের দুজনের মাথায়ই তখন হ্যাট। বাচ্চু ভাই সহাস্যে বললেন, "আপনিও আমার মত হ্যাট পরেন? আমেজিং। এই প্রথম বাংলাদেশে কোন হ্যাট পরা জার্নালিস্টকে দেখলাম। ভেরি নাইস টু সী ইউ।" আমি কথা হারিয়ে ফেললাম বাচ্চু ভাইকে চোখের সামনে এভাবে দেখে। তাঁর সবগুলো গান আমার মুখস্থ ছিলো। কথাটা বলতেই টেবিল চাপড়ে হেসে উঠলেন, "এমন সুন্দরী ফ্যান থাকলে হাজার হাজার গান গাইতে পারবো। কবরে যাওয়া অবধি গাইতে পারবো।" আমার পিলে চমকে উঠেছিল বাচ্চু ভাইয়ের মুখ থেকে 'কবর' শব্দটা শুনে।  চিরন্তন সত্য কিন্তু ওই মুহূর্তে শুনতে একদম ভালো লাগেনি। 


চা সিঙ্গাড়া চানাচুর শসা  খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সাক্ষাতকার পূর্ব সম্পন্ন করলাম। আমার দিকে একটা সাদা খাম এগিয়ে দিলেন। খামের ভেতর তাঁর দুটি ছবি। সাক্ষাতকারের সাথে ম্যাগাজিনে ছাপানোর জন্য। এই বিরল গুণটি দেখে আমি আরও মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। আমার মুখভঙ্গি দেখে বাচ্চু ভাই সেই জটও খুলে দিলেন। "শোনেন মিলি ম্যাডাম, বাচ্চুর ইন্টারভিউ নেয়ার সময় জার্নালিস্টদের সাথে ফটোগ্রাফার নিয়ে আসতে হয়। ছবি তুলে নিয়ে যেতে হয়। ফটোগ্রাফার ছাড়া ইন্টারভিউ আমি এলাউ করিনা। এইকথা শুনে আমি সরি হলাম। বললাম, বাচ্চু ভাই মিজান ভাই ফটোগ্রাফার পাঠাতে চেয়েছিলেন। আমি উনাকে বলেছি লাগবেনা ফটোগ্রাফার। ছবি আমি নিয়ে আসবো। আমার কথা শেষ না হতেই বাচ্চু ভাই গান গাওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। বললেন, কেন এই কথা বললেন? এতো কনফিডেন্স কেন জানতে পারি? আমি জবাব দিলাম, তা জানিনা। তবে আমার মনে হয়েছিলো আমি আপনার অফিসে আসবো, আপনার ছবি নিয়ে যাবো। চমৎকারভাবে শব্দ করে হাসলেন বাচ্চু ভাই, "মিলি ম্যাডাম এমন কনফিডেন্স কম মানুষের মধ্যে দেখেছি।

 

আপনি আমার মন জয় করে ফেলেছেন। আমার বউও আপনার সাথে কথা বলে আপনাকে  পছন্দ করেছে। থাকুন আমাদের সাথে। আপনি লিখতে থাকবেন। আমি সেগুলোকে সুরে বাঁধবো।" 

বাচ্চু ভাই আসলে মানুষটা অসম্ভব জিনিয়াস। অসাধারণ অবজারভেশন তাঁর। নিজের বুকে আঙ্গুল দিয়ে গুঁতো মেরে বললেন, বাচ্চু আগ বাড়িয়ে কাউকে ছবি দেয়না। আপনাকে দিয়েছে। একটা কানেকশন আছে। জানেন কি সেটা? আমি দেরী না করে বলে ফেললাম, 'চট্টগ্রাম কানেকশন।' সাংঘাতিক খুশি হলেন বাচ্চু ভাই। এটা সত্যি চট্টগ্রামপ্রীতি খুব গুরুত্ব পেয়েছিল। আলাপচারিতার ফাঁকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কয়েকটা বাক্য বললেন। আমি অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। এতটুকু অহংকার নেই তাঁর মধ্যে। মনখুলে হাসেন, কথা বলেন।   অফিসে তাঁর এক সহকারী ছিলো। ড্রয়ার খুলে ক্যামেরা বের করে তাকে বললেন, দুই "হ্যাটবাজের" ছবি তুলে দিতে। "হ্যাটবাজ" শব্দটা আমার পছন্দ হল। কারণ আমরা দুজনই হ্যাটবাজ অর্থাৎ মাথায় হ্যাট পরা। কালো হ্যাট। বাচ্চু ভাই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবিতে পোজ দিলাম। 

পরেরবার ঢাকা গেলে তাঁর সাথে তোলা সেই ছবি আমাকে দেবেন বলে দিলেন। কিন্তু আমার বহুদিন আর ঢাকা যাওয়া হয়নি। সেই ছবিও আর নিজের চোখে দেখতে পাইনি। হয়তো বাচ্চু ভাইয়ের ড্রয়ারে অনেকদিন পড়েছিলো। তারপর কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তাঁর সাথে আর যোগাযোগ রাখতে পারিনি। তিনিও দিন মাস বছর ব্যস্ত ছিলেন সৃষ্টির উল্লাসে। দ্যা লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু 
আজ আমার কাছে কেবলি যন্ত্রণাময় এক স্মৃতির নাম। এখনও অনেক রাত হয়। খোলা আকাশের নিচে না হলেও দেয়ালঘেরা খাঁচায় রাত জেগে আমি স্মৃতিতে তলিয়ে যাই। চোখের পাতা জলে ভরে যায়।   লেখক- সাংবাদিক ও গবেষক, নিউইয়র্ক। 


বার পঠিত

এ সম্পর্কিত খবর

রোদে পোড়া শরীর, নায়িকাদের রুপে বিলীন

রোদে পোড়া শরীর, নায়িকাদের রুপে বিলীন

নিজস্ব প্রতিবেদক: গত ১৫ জানুয়ারি থেকে সংরক্ষিত মহিলা আসনের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে আওয়ামীলীগ।

ডাকসু নির্বাচনে ৫ রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ

ডাকসু নির্বাচনে ৫ রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ

এওয়ান নিউজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়নে ৭

"বড্ড বেরসিক আমি"

মিলি সুলতানা : এক পরিচিত জন আমার কাছে জানতে চাইলেন, পৃথিবীর সেরা হিসেবে স্বীকৃত এমন


গরীব দুঃখি মানুষরাই আল্লাহর কাছের মানুষ-ড. আহমদ হাসান চৌধুরী 

গরীব দুঃখি মানুষরাই আল্লাহর কাছের মানুষ-ড. আহমদ হাসান চৌধুরী 

হাসান আহমদ, ছাতক প্রতিনিধি::শামছুল উলামা আল্লামা ছাহেব ক্বিবলা ফুলতলী (রহঃ) এর সুযোগ্য নাতি, বাংলাদেশ আনজুমানে

'রাজনীতি না করে অভিনেত্রীদের এমপি হতে চাওয়া ইতিবাচক নয়'

'রাজনীতি না করে অভিনেত্রীদের এমপি হতে চাওয়া ইতিবাচক নয়'

বিনোদন ডেস্ক: সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ফরম কেনার হিড়িক লেগেছে চলচ্চিত্র

রিজভীর মন কেনো এমন

রিজভীর মন কেনো এমন

নিজস্ব প্রতিবেদক: জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী এম এইস রিজভী আবারো শ্রোতাদের মনে ঝড় তুললো। বাজারে এলো


‘বেস্ট সেলিং ব্রান্ড’ হলো আতঙ্ক: জাতিসংঘ মহাসচিব

‘বেস্ট সেলিং ব্রান্ড’ হলো আতঙ্ক: জাতিসংঘ মহাসচিব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিস্তৃত আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ।

ঐক্যফ্রন্টের গন্তব্য কি?

ঐক্যফ্রন্টের গন্তব্য কি?

নিজস্ব প্রতিবেদক: বহুল আলোচিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহুর্তে সাত দফা দাবী নিয়ে

দুপুরে আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশ

দুপুরে আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা তৃতীয় বারের জয়লাভের পর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বিজয়



আরো সংবাদ

‘একটু ভালো কইরা লেইখেন ভাই’

‘একটু ভালো কইরা লেইখেন ভাই’

১৯ জানুয়ারী, ২০১৯ ১২:০৭

সুন্দরবনের বাঘ লোকালয়ে

সুন্দরবনের বাঘ লোকালয়ে

১৮ জানুয়ারী, ২০১৯ ২১:১১



‘পাখি সব করে রব’

‘পাখি সব করে রব’

১২ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৪:২৩



সন্তান বিক্রি করতে চান এক দম্পতি

সন্তান বিক্রি করতে চান এক দম্পতি

১০ জানুয়ারী, ২০১৯ ২২:৪৮






ব্রেকিং নিউজ





নোয়াখালীতে আবারও গণধর্ষণ

নোয়াখালীতে আবারও গণধর্ষণ

১৯ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৬:০০



বিজয় উৎসবে শেখ হাসিনা

বিজয় উৎসবে শেখ হাসিনা

১৯ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৫:৪৭

"বড্ড বেরসিক আমি"

১৯ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৫:২১



19/01/2019

19/01/2019

১৯ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৪:১৫