বিভাগ - কৃষি

অভিমানি কৃষক, ‘আমরা সারাজীবন শুধু কষ্ট করেই যাই’

প্রকাশিত

হেদায়েত হোসাইন,বাগেরহাট:‘করোনার পরিস্থিতির কারণে আমরা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছি। আবারও নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছি। কষ্ট করে চাষ করি আমরা, কিন্তু ভাল কো ন ফলাফল পাই না।’এ বক্তব্য বাগেরহাটের এক অভিমানি কৃষকের।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার আদিখালী গ্রামের মো. মাসুম গাজী নামের এই কৃষক বলেন, ‘সরকারি অনেক সহযোগিতা আসে। কিন্তু তা আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌছায় না।আমরা সারাজীবন শুধু কষ্ট করে যাই। নিজেদের অসহায়ত্ব নিয়ে মাসুম গাজী আরো বলেন, ‘ধান রোপণের সময় কৃষি অফিসাররা বলেছিলেন কৃষি কার্ড কর। ধান বিক্রি করার সময় এক হাজার টাকা করে রেট পাবা। কিন্তু সরকার যখন ধান কেনা শুরু করে তখন আর আমরা ধান বেচতে পারি না। কারণ আমাদের ধান কাটা ও বিক্রি শেষ হওয়ার পরে সরকার ধানক্রয় শুরু করে।কষ্ট করতে করতে কৃষক মরবে, মরার তালেই আছে। কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন নেই।’শুধু মাসুম গাজী নয়, বাগেরহাটের বেশিরভাগ কৃষকের একই অবস্থা।করোনার কারণে সময়মত সবজির বীজ রোপণ করতে না পেরে একধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে চাষাবাদ শুরু করেছেন হতদরিদ্র চাষিরা। তবে ভাল ফলন ও দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সার্বিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন প্রান্তিক চাষিরা।

চিতলমারী উপজেলার সন্তোষপুর, উমাজুড়ি ও আদিখালী গ্রামের আকবর আলী, বেলাল হোসেন, মর্জিনাসহ সবজি চাষিরা জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি।বর্তমানে সবজি বীজ, সার, কীটনাশক, জ্বালানী তেল, বাঁশ, সুতা- সবকিছুর দামই আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু উৎপাদিত ফসল তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হয় এই চাষিদেরকেই। তাদের দাবি, সবজি উৎপাদনের পর বিক্রি করার ক্ষেত্রে সরাসরি মোকামে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে, তবেই চাষিরা ন্যায্য মূল্য পাবে। আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এই অবস্থায় বিনা সুদে ঋণের দাবিও জানিয়েছেন তারা। বাগেরহাট জেলায় ২ লক্ষ ৪৪ হাজার কৃষক রয়েছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই জেলার দশ লক্ষাধিক মানুষ কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল।এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার চাষি রয়েছেন- যারা সবজি চাষ করেন।

জেলার বাগেরহাট সদর, চিতলমারী, কচুয়া, মোল্লাহাট, ফকিরহাট উপজেলায় সব থেকে বেশি সবজি উৎপাদন হয়। জেলায় প্রতি বছর প্রায় দেড় লক্ষ মেট্রিকটন সবজি উৎপাদন হয়।বেগুন, করলা, শসা, পেপে, বরবটি, পুইশাক, ঢেঁড়সের চারা রোপণ করছেন এখন। কিন্তু গত বছর এই দিনে এসব সবজি চড়া দামে বাজারে বিক্রি করেছেন কৃষকরা। এবার কি হবে তা জানেন না তারা।

এদিকে চিতলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঋতুরাজ সরকার বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে ঘেরের আইলে সবজির জন্য যে মাচা দেওয়া হয়, মাচা তৈরির জন্য বাঁশ আসতে বিলম্ব হয়েছে। যার ফলে চাষিদের সবজি চাষ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। তারপরও সবার সম্মিলিত চেষ্টায় প্রায় আশি শতাংশ কৃষক তাদের জমিতে চাষ শুরু করেছেন। আমরা কৃষকদের সব ধরণের প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্ভুদ্ধ করছি।কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।’বাগেরহাট জেলা কৃষি ঋণ বিতরণ ও আদায় মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব এবং বাগেরহাট অগ্রনী ব্যাংকের সহকারি মহাব্যবস্থাপক দেপাল চন্দ্র রায় বলেন, ‘কৃষকদের প্রনোদনার জন্য আমাদের ১৪টি শাখায় এক কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ১০ টাকা দিয়ে একটি হিসাব খুলে ৫০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে কৃষকরা ঋণ নিতে পারবেন।’

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রঘুনাথ কর বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে এ পর্যন্ত সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় ২৫ হাজার চাষিকে বিনামূল্যে বিভিন্ন প্রকার বীজ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৬৫টি ইউনিয়নে ৩২টি করে আদর্শ সবজি পুষ্টি বাগান তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। প্রান্তিক কৃষকদের অর্থ সহায়তা দেওয়ার জন্য আমরা ব্যাংকের সাথে কথা বলেছি। কৃষকরা সহজ শর্তে ঋণ পাবে। আমরা কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের নায্যমূল্য নিশ্চিতে কাজ করছি।’বাগেরহাট জেলায় ৬ হাজার ২‘শ ৭৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ শুরু হয়েছে।