আইসিজে’তে শুনানি, রাখাইনে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার সুচির

প্রকাশিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি আজ আইসিজে’তে শুনানিতে রোহিঙ্গা নৃশংসতায় ‘গণহত্যার অভিযোগ’ নাকচ করে দিয়ে নিজ দেশের সামরিক জান্তার পক্ষেই জোড়ালো সাফাই গেয়েছেন।

হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের সবোর্চ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ‘গণহত্যার অভিযোগ’ শুনানির দ্বিতীয় দিন আজ বুধবার মিয়ানমারের বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচি দেশটির পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা মামলার শুনানি গতকাল ১০ ডিসেম্বর শুরু হয়। তিনদিন ব্যাপী শুনানির প্রথম দিন গতকাল গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন। শুনানির দ্বিতীয় দিন আজ মিয়ানমারের পক্ষে বক্তব্য রাখেন দেশটির বেসামরিক নেতা অং সান সুচি। আগামীকাল দু’পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

অং সান সুচি হেগে আদালতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কোন কোন সদস্য ‘অতিরিক্ত বল’ প্রয়োগ করে থাকতে পারে বলে স্বীকার করেছেন। তবে, তিনি বলেন, সংখ্যালঘু গোষ্ঠিটিকে বিতারিত করার চেষ্টা চালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালে সামরিক বাহিনীর অভিযানে রক্তক্ষয়ী ঘটনায় গাম্বিয়া জাতিসংঘের সবোর্চ্চ আদালত (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে মামলা করে। রাখাইনে এ ঘটনায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাচাঁতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

সুচি বলেন, রাখাইন রাজ্যের ঘটনায় গাম্বিয়া অসম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। এ সময় সুচির পরনে ছিল মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী বর্মী পোশাক এবং মাথার চুলের খোপায় বাধা ছিল ফুল।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালে শত শত রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সামরিক ক্যাম্পে হামলা চালায়। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা শুধুমাত্র এই হামলার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা বিভাগের সদস্যরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে কিছুটা বাড়াবাড়ি করেছে। এ জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, গণহত্যার অভিযোগটি একেবারেই মনগড়া বলে দাবি করেন তিনি। গাম্বিয়া মামলার আর্জিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের আলোকে অভিযোগ এনে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা বন্ধে এখনি জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আদালতের প্রতি আহবান জানিয়েছে।

জাতিসংঘ তদন্ত দল গত বছর তদন্তে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্য প্রমাণ পেয়েছে। যদিও সুচি বলেছে, ১৯৪৬ সালে গঠিত আদালত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধের ওপর রুল জারি করে। এই রুলের আলোকে ১৯৯০ দশকে বলকান যুদ্ধে বেসামরিক লোকদের গণবিস্ফোরণের ঘটনায় নেয়া ব্যবস্থাকে গণহত্যা হিসাবে গণ্য করা হয়নি।

আদালতে শুনানি চলাকালে প্রায় ২৫০ জন মিয়ানমারপন্থী বিক্ষোভকারি আইসিজে’র সামনে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করে। তারা অং সান সুচির পক্ষে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। তাদের হতে বিভিন্ন শ্লোগান লেখা প্লাকার্ড ছিল। শ্লোগানের ভাষা ছিল, ‘আমরা তোমার পাশে আছি। তারা সুচির ছবি সম্বলিত প্লাকার্ডও বহন করে।

অপরদিকে রোহিঙ্গাদের সমর্থনে একটি গ্রুপও গণহত্যার বিচার চেয়ে আদালতের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা অং সান সুচিকে উদ্দেশ্য করে শেম শেম বলে শ্লোগান দেয়। একজন বিক্ষোভকারি মিয়ানমারের একজন জেনারেলের ছবি বহন করে। ছবির নিচে লেখা ছিল ‘গণহত্যার মূল নায়ক’।গাম্বিয়ার বিচারপতি আবুবাচার তামবাদাওউ বলেন, সুচি তার মিয়ানমারের নৃশংসতার অভিযোগ পুনরায় অস্বীকার করলে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি গণহত্যা বন্ধ করতে সুচিকে নিদের্শ দিতে আদালতের প্রতি আহবান জানান।

আইসিজে বিচারকগণ এক সময়ে ১৯৯৫ সালে বসনিয়ায় নৃশংসতার ঘটনায় গণহত্যা বলে রুল জারি করেছিল। তারা বলেন, সুচি নিজেকে দেশে অধিক জনপ্রিয় করতে তার দেশের পক্ষে সাফাই গাওয়া এটি নিতান্তই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এটি সত্য রোহিঙ্গারা নিজ আবাস ভূমিতে নির্যাতিত হয়ে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

অং সান সুচি এক সময়ে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং মহত্মাা গান্ধীর সমতুল্য নেতা হিসাবে বিশ্বব্যাপী খ্যতি অর্জন করেছিলেন। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তার অবস্থানের জন্য ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। একটানা দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকার পর ২০১০ সালে তিনি মুক্তি পান এবং ২০১৫ সালের নির্বাচনে তার দল বিজয়ী হয়। তবে, এখন সেই মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হচ্ছেন।