ইসলামে সাম্য- মৈত্রীর দার্শনিক ভিত্তি

প্রকাশিত

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ: মানব সভ্যতায় কোন বনি আদম কখন কোথায় কোন দেশে, কোন বংশে বা গোত্রে বা পরিবারে জন্ম লাভ করবে মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কেউ জানে না। এখানে কারো কোন হাত বা ক্ষমতা নেই। মানুষের জন্ম তার মর্জিমাফিক বা ইচ্ছানুযায়ী হয় না। সৃষ্টিকর্তা যাকে যেখানে যে সম্প্রদায়ে বা গোত্রের জন্য নির্বাচন করে থাকেন তার জন্ম সেখানেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। এ কারনেই জন্ম কোন ভাবেই মানুষের প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য গুরুত্ব বহন করে না। জেনেটিক্যালী সে আকৃতি, রঙ, সাইজ বা শারীরিক কাঠামোর সাথে সাথে বংশ বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে। তার পরিবেশ, পরিবার এবং সঙ্গ তাকে ইহুদী, খৃষ্টান বা মুসলিম-হিন্দু বানায়। মুক্ত ও স্বাভাবিক প্রকৃতি নিয়েই সে জন্মলাভ করে থাকে। তার পারিবারিক আবহে বেড়ে উঠা তাকে বহুমাত্রিক ভাবে মানুষ, পরিবেশ এবং সমাজকে মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়। হয় সে উদার হয়; না হয় রক্ষণশীল। তার সামাজিকরনের পুরো প্রক্রিয়া এখানে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিবার, সমাজ, বন্ধু-বান্ধব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ইসলামী নৈতিকতার সংমিশ্রনে কল্যাণধর্মী চেতনায় উদার, সাম্য, মৈত্রী এবং মানবিকতার সবক সে রপ্ত করতে শেখে।

ইসলাম সাম্য, মৈত্রী ও শান্তির ধর্ম। মানুষে-মানুষে শান্তি, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে শান্তি, সমাজ জীবনে শান্তি, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে শান্তি, জাতি- গোত্রে শান্তিÑ মোট কথা সার্বজনীন শান্তিসুধায় অবগাহনের চেতনায় ইসলাম মহান সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত সর্বশেষ এক জীবন ব্যবস্থা। ইসলামের ব্যুৎপত্তিগত নামই হলো শান্তি। যেখানে অন্যায় অবিচার, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, হানাহানি-মারামারী, ধর্মের নামে নির্যাতন, যুলুম, সন্ত্রাস, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ফিৎনা-ফাসাদ গ্রহণযোগ্য নয়। বর্ণ-গোত্রের কারণে বা শারীরিকভাবে চ্যলেঞ্জজড হওয়ার কারনে কোনোভাবেই কাউকে ভিন্নভাবে দেখা বা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ এখানে নেই। ইসলামের মর্মগত চেতনা ও ভিতরগত সূর বিবাদের নয় বরং পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে তৈরী দৃঢ় বন্ধনে নির্মিত একতা, সাম্য ও মৈত্রীর মোড়কে সংঘবদ্ধভাবে জীবন যাপনের। ইসলামের আবেদন মিলনের এবং ঐক্যের। এর মর্মবাণী হলো, সকলের সম্মিলিত শক্তি একীভূত করে মহান ¯্রষ্ঠার বন্ধনায় মনযোগী হয়ে সৃষ্টিশীল কাজে মনোনিবেশের। যার মাধ্যমে পৃথিবী হয়ে উঠবে বাসযোগ্য; সকলের জন্য প্রশান্তিময়। ইসলামের শক্তির উৎস প্রীতি-প্রেম ও ভালবাসা। জোর-যুলুম, উৎপীড়ন ইত্যাদী পাশব আচরণে নয়। রাসূল (সা.) প্রেরিত হয়েছেন বিশ্ববাসীর জন্য ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ হিসেবে। সমগ্র পৃথিবীর শান্তির দূত হিসেবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান। রাসূল (সা.) পতিত মানবতাকে উদ্ধার কল্পে একই বিশ্ব বিধাতার অধীনে বিশ্বভ্রাতৃত্বের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে বিশ্ববাসীর কাজে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি বলেছেনÑ‘মানুষ সকলে এক আদমের সন্তান আর আদমের সৃষ্টি মাটি থেকে।’ সুতরাং ইসলামের না আছে জাতি ভেদ, না আছে আভিজাত্য ও কৌলিন্যের গর্ব, না আছে বৈষম্য ও ভৌগলিক ব্যববধান। মানবদরদী প্রিয় নবী (সা.) বর্ণ-বৈষম্য ও আভিজাত্যের গর্বকে ভেঙ্গে চুরে একতা,সাম্য-মৈত্রী ও শান্তির ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন। এই শান্তিকে সর্বস্তরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুদৃঢ় করতে মহানবী (সা.) ‘মুসলমান শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘যার হাত ও মুখ থেকে অন্যেরা নিরাপদ নয়, সেই প্রকৃত মুসলমান নয়।’ কথায়, কাজে, আচরণে ও বাস্তব জীবনে ইসলামের মৌলিক নীতির ভিত্তিতে তিনি মানবতার জন্য সমমর্মী চেতনার আদলে একটি সার্বজনীন মমত্ববোধের উজ্জ্বল পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে গেছেন।

ইসলামে জোর জবরদস্তি বা বল প্রয়োগের কোন সিস্টেম নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং যদি আল্লাহ (জোর পূর্বক) চাইতেন তাহলে তারা শিরক করতো না। বস্তুত আমরা তোমাকে তাদের উপর কোনো হেফাজতকারী করে পাঠাইনি এবং তুমি তাদের উপর কোনো ত্ত্বাবধায়কও নও।’ (আনআম: ১০৭) আল্লাহ তায়ালা চাইলে মানুষকে সত্য অনুসরনের জন্য নিশ্চিয়ই বাধ্য করতে পারতেন। কিন্তু মানুষের স্বার্থেই আল্লাহ তায়ালা আগ্রহ করে বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করেন নাই। ‘এবং তাদের গালি দিওনা, যাদেরকে তারা আল্লাহকে ছেড়ে (মাবুদ রূপে) ডাকে, নতুবা তারা অজ্ঞতার কারনে শত্রƒতাবশতঃ আল্লাহকে গালি দিবে।’ (আনআম:১০৮) এখানে প্রতিমা পূজারীদের সংবেদনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ দান করা হয়নি বরং সকল জাতি ও সম্প্রদায়েন মধ্যে বন্ধুত্ব সৌহার্দ্য স্থাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কারণ একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশের স্থিতির জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হিংসা-বিদ্ধেষের অনুসরন করে অন্যের প্রতি অত্যাচার-অবিচার, জোর-যুলুম, নির্যাতন ও নিপীড়ন করার ব্যাপারে কঠোরভাবে নির্দেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষভাব তোমাদের কে যেনো অন্যায়ভাবে কাজ করার উৎসাহ না দেয়।” (আল মায়েদা: ৮) এটা কেন? এটা এ জন্য যাতে করে সমাজের দেয়ালে অশান্তি নামক বিষাক্ত আবহাওয়ার সৃষ্টি হতে না পারে। আর এ জন্য আলকুরআনে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারী করে বলেছেন, “হে বিশ্বাসীগণ! যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের ভিতরকার কোনো সম্প্রদায় যেনো অন্য কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্রƒপ না করে, কেননা শেষোক্ত সম্প্রদায় প্রথমোক্ত সম্প্রদায় থেকে উৎকৃষ্টতর হতে পারে।” (হুজরাত:১১) নবী (সা.) উচুঁ-নীচু, ধনী-গরীব, বর্ণ- গোত্র বা বংশের গেীরবের মূলে কুঠারাঘাত করে সাম্য, মৈত্রী ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন; যেখানে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

রাসূর (সা.) জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, “বিশ্ব জগত আল্লাহর পরিবার। আল্লাহর প্রতি ঐ ব্যক্তি উত্তম যে তার পরিবারের প্রতি (আচার ব্যবহারে) সর্বাপেক্ষা উত্তম।” (হাদীসে কুদসী)এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, বাহায়ী, আলবাবী, জৈন, শিখসহ সকল ধর্মের অনুসারী রয়েছে।সমাজের বুকে যাতে বিন্দু পরিমান অশান্তি সৃষ্টি না হতে পারে, সে জন্য তিনি উদারনীতি মহানভাবে প্রচার করে বিশ্ববাসীর প্রাণে প্রেরণা দান করে গেছেন। ইসলামে মান সম্মান লাভের একমাত্র ভিত্তি আল্লাহ ভীতি। তাই তিনি ঘোষনা করেছেন,“ তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ঐ ব্যক্তি, যে তোমাদের ভিতর সর্বাপেক্ষা ধর্ম পরায়ন।” (হুজরাত:১৩) বিশ্বনবী (সা.) মুসলমানদেরকে এক বিশ্বভ্রাতৃত্ব সমাজে আবদ্ধ করে বলেছেন, “মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই।এক অভিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃ সমাজ। যেমনএকটি বিরাট অট্টালিকা সর্দশ। ইহার একটি ইট ও অন্য ইট থেকে পৃথক করা যায় না।” (আলহাদীস) সকল মুসলমানের প্রাণের মূল্য সমান। তারা অন্যের বিরুদ্ধে এক হস্ত। যে কেহ জামাত থেকে এক বিঘত বের হয়ে যায়, সে ইসলামের বন্ধন তার ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলে। নবী (সা.) কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে সতর্ক করে গেছেনযে, ‘তোমরা কাফের বলবে না, কুফুরীর পাপে তোমরা কাউকে দোষারোপ করবে না এবং কোনো মন্দ কাজের জন্য কাউকে ইসলাম থেকে বহির্গত করোনা, কারো নিন্দা করো না আর গুপ্ত কথা জানবার চেষ্টা করবে না।’ (আলহাদীস)

বিদায় হজ্বের ভাষণে মহানবী (সা.) ঘোষনা করলেন, ‘হে কোরাইশমণ্ডলী! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ভিতর হতে অন্ধকার যুগের গর্ব বিলুপ্ত করেছেন।’ লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে তিনি বলেছেন যে, মানব সন্তান আদম (আ.) হতে এবং আদম (আ.) মাটি হতে সৃজিত। এক দেশবাসী অন্য দেশবাসীর উপর প্রাধান্যের কোনোই কারন নেই। জেনে রাখ, এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। আর সকল মুসলমানকে নিয়ে এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃ সমাজ। যদিও কোনো ক্রীতদাসকেও তোমাদের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের কে পরিচালনা করতে। তা হলে তোমরা সর্বোতভাবে অনুগত হয়ে থাকবে এবং সর্বোতভাবে তার আদেশ মান্য করে চলবে। দেখো, আজকের হজ্ব দিবস যেমন মহান, এইমাস যেমন মহিমাপূর্ণ, প্রত্যেক মুসলমানের সম্পদ, প্রত্যেক মুসলমানের মান-সম্মাননএবং প্রত্যেক মুসলমানের শোনিত বিন্দু ও তোমাদের প্রতি সেই রূপ মহান, সেই রূপ পবিত্র। পূর্বোক্ত বিষয়গুলির পবিত্রতার হানি করাযেমন তোমরা প্রত্যেকেই হারাম বলে বিশ্বাস করে থাকো, কোনো মুসলমানের সম্পত্তির সম্মানের এবং তার প্রাণের ক্ষতিসাধন করাও তোমাদের প্রতি সেইরূপ হারাম, সেইরূপ মহাপাপ।”

বিশ্বের শান্তির দূত হিসেবে রাসূল (সা.) শুধু মানুষের জন্যই নয়, পশু-পাখি, গাছ-পালা ইত্যাদীর জন্যও শান্তির বিধার রেখে গেছেন। মানুষ যদি বিশ্ব নবী (সা.) ও তাঁর দেখানো ও শেখানো বিধান মতো চলতো, তাহলে শান্তির জন্য ব্যর্থ মনোরথ হয়ে বিষাদে পরিপূর্ণ অশান্তির অতল গহŸরে নিমজ্জিত হতে হতো না। এক মানুষ আরেক মানুষের বিরুদ্ধে, এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে, এক জাতি আরেক জাতির বিরুদ্ধে, এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে, সৃষ্টির সেরা মানুষের মধ্যে নির্বিচারে অত্যাচার-অবিচার, জোর-যুলুম, মারামারি-রক্তপাত নিত্য ক্রীড়ার সামগ্রী হতে হতো না। এই দুনিয়া হতো সুখ, শান্তির স্বর্গ রাজ্য।

লেখক: মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
পিএইচডি গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়