উৎসবে নারীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হলো?

প্রকাশিত

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে ঠিক কুড়ি বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাঁধন নামের একজন নারী প্রকাশ্যে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন।যা সে সময় সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে।

মূলত: তার পরের বছর থেকেই বাংলাদেশে থার্টি ফার্স্ট উদযাপনে নানা রকম কড়াকড়ি আরোপ শুরু হয়। যা ক্রমে বাড়তে বাড়তে এ বছর বাড়ির ছাদেও কোনো উৎসব আয়োজনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পুলিশ।

পুলিশের নির্দেশনায় কী রয়েছে?
৩০শে ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির শেষদিন অর্থাৎ থার্টি ফার্স্ট নাইট এবং নতুন বছরের প্রথম প্রহরে কোন ওপেন এয়ার কনসার্ট, ডিজে পার্টি কিংবা প্রকাশ্য স্থানে কোনো জমায়েত, সমাবেশ বা উৎসব করা যাবেনা।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশংকায় উন্মুক্ত স্থান অর্থাৎ রাস্তা বা ফ্লাইওভার, এমনকি বাড়ির ছাদেও কোনো উৎসব আয়োজন করা যাবে না।

“বাড়ির ছাদ বা খোলা জায়গায় আমরা কোন অনুষ্ঠান অ্যালাও করবো না। আতশবাজি ও পটকা না ফোটাতে আমরা অনুরোধ করবো। এছাড়া গুলশান, বনানী এবং বারিধারা এলাকায় ৩১শে ডিসেম্বর রাত আটটার পর বহিরাগত কোন ব্যক্তি বা যানবাহন অ্যালাও করবো না” – বলেন তিনি।

এছাড়া আজ সন্ধ্যা ছয়টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বহিরাগত কোনো ব্যক্তি বা যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের কী প্রতিক্রিয়া?
উৎসব উদযাপনে এ ধরণের কড়াকড়ি নিয়ে আপত্তি রয়েছে তরুণ প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষের।ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সীমা তামান্না।

তিনি বলেন, “থার্টি ফার্স্টে সবাই একটু আনন্দ করতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে মজা করতে চায়। সেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা ঠিক আছে, কিন্তু একেবারে বাড়ির ছাদে অনুষ্ঠান করা যাবে না এটা ঠিক নয়।”বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিয়া পারভীনও পুলিশের কড়াকড়িকে যথার্থ মনে করেন না।

“যেভাবে কড়াকড়ি দেয়া হয়েছে আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে, ছাদে কিছু করা যাবে না বা কোন কনসার্ট বা এরকম কিছু করা যাবে না, এটা ‘টু-মাচ’। নিরাপত্তার অভাব থাকলে নিরাপত্তা দেন।”আরেকজন শিক্ষার্থী শান্তা সানজিদা বলছিলেন, “যেসব দুর্ঘটনার কথা বলে সেসব দুর্ঘটনা তো বন্ধ হচ্ছে না, তাহলে কি বন্ধ হচ্ছে? বন্ধ হচ্ছে শুধু আমাদের বাড়ির বাইরে যাওয়া!”

উন্নয়ন সংস্থার কর্মী নাফিসা তুলি বলেছেন, “আমার ভালো লাগতো শহরের কোথায় কি অনুষ্ঠান হচ্ছে, তা বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে যদি দেখতে পারতাম, তাহলে।কিন্তু তা তো হবেই না, বরং বাড়ির ছাদেও কোন আয়োজন করা যাবে না। কিন্তু সেখানে তো কেবল বন্ধুরা নয়, পরিবারের মানুষেরাও থাকে।”

উৎসবে নারীর নিরাপত্তায় কতটা অগ্রগতি
১৯৯৯ সালের থার্টি ফার্স্টে বাঁধন ঘটনার পর বাংলাদেশে একে একে বেশ কয়েকটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটে।২০০১ সালে পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে বোমা হামলা এবং ২০০২ সালে সাতক্ষীরায় একটি সিনেমা হলে ও লায়ন্স সার্কাসের প্যানেলে বোমা হামলা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

এরপর ২০১৪ সালে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত অনুষ্ঠান শেষে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে।পরের বছর ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পহেলা বৈশাখের দিনে একজন নারীর শ্লীলতাহানির শিকার হন।

এসব ঘটনা উৎসবে নিরাপত্তা, বিশেষ করে সামাজিক উৎসবে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত দুই দশকে উৎসবে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সামিনা লুৎফা বলছিলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হয় উৎসবগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে পুলিশ ক্রমশ মানুষকে বাড়িতে বন্দি করে ফেলছে।

“গত দুই দশকে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার বা সমাজ। কোন সরকারকে একক ভাবে দায়ী করা যাবে না সেজন্য, ২০ বছরে আমরা কয়েকটি সরকার দেখেছি, কেউই এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি।নারীর নিরাপত্তার জন্য শিক্ষা এবং সংস্কৃতিতে যে গুরুত্ব দেয়ার দরকার ছিল – সেটা কখনো করা হয়নি।”

“পুলিশ যে নিরাপত্তার অভাবের কথা বলছে, সেটা সামাজিক সাংস্কৃতিক ভাবে মোকাবেলা করতে হয়, যেটা আমরা পারিনি।”বাঁধন নিপীড়নের ঘটনায় ২০০০ সালে একটি মামলা করা হয়েছিল, কিন্তু ১১ বছর মামলা চলার পর তিনজন আসামীর সবাই খালাস পেয়ে যায়।অন্যদিকে, টিএসসির বাংলা নববর্ষে যৌন হয়রানির ঘটনায় দায়ের মামলায়ও এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি নেই।সূত্র-বিবিসি বাংলা।

error0