কাজের সময় কীভাবে ব্যায়াম করবেন

প্রকাশিত

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: কর্মক্ষেত্রে থাকাকালীন আপনি যখন ব্যায়াম করেন, তার যেমন স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে তেমনি এতে মেধারও উন্নতি হয়।কখনও কখনও, একটি উৎপাদনশীল দিন এবং সময় নষ্ট হওয়া দিনের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে দিনের মাত্র এক ঘণ্টা।

আপনি কীভাবে কাজ করেন এবং কীভাবে বেঁচে থাকেন তার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এই এক ঘণ্টা।যেমন: এক ঘণ্টার অতিরিক্ত ঘুম, এক ঘণ্টার ব্যায়াম বা এক ঘণ্টা গভীর মনোযোগের সাথে কাজ করা।

ব্যায়াম:
আমরা সবাই জানি ব্যায়াম আমাদের জন্য প্রয়োজন।আমাদের মধ্যে অনেকেই ব্যায়াম করতে ভয় পান। এবং আমাদের প্রায় সকলেই এই ব্যায়াম করার জন্য সময় বের করতে হিমশিম খান।

ঘুমের মতো শরীরচর্চা এমন কিছু নয় যেটা আমাদের প্রতিদিন করতেই হয়। এজন্য আমাদের সুবিধাজনক সময় বের করতে হয়।এবং অনেকে তাদের হাজার কাজের মধ্যেও ব্যায়ামের জন্য আলাদা সময় বের করে নেন।

‘সুবর্ণ সুযোগ’
দিনের বেলায় ব্যায়াম করলে আপনাকে দেখতে ভাল লাগবে, আপনি ভাল বোধ করবেন এবং কাজেও অনেক ভাল করবেন। ব্যায়ামের এই সুবিধাগুলোর ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই জানা আছে।

২০০৮ সালে যুক্তরাজ্যে একটি গবেষণা পরিচালনা করে গবেষকরা দেখতে পেয়েছিলেন যে, কোম্পানির জিম ব্যবহার করেছেন কিংবা কোম্পানির জিম ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন এমন দুই শতাধিক কর্মচারীর কাজে উৎপাদনশীলতা বেশি।প্রতিদিনের কাজের মাঝে যে দিনগুলোয় তারা ব্যায়াম করেছেন সেদিন কাজ শেষে তারা বাড়িও ফিরেছেন মন ভরা সন্তুষ্টি নিয়ে।

২০১৩ সালে, অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বয়স নির্বিশেষে, মানুষ নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম করার কারণে মেধার উন্নয়নে তাৎক্ষণিক উপকারিতা পেয়েছে। যেমন: মাঝারি গতিতে একটানা ১৫ মিনিট সাইকেল চালানো।

এই জরিপ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, সেটা হল, অফিসের আগে বা পরে জিমে সময় কাটানোর চাইতে দিনের বেলা কাজের মধ্যে ব্যায়াম করা বেশি ভাল হতে পারে। শরীরচর্চার সর্বাধিক উপকারিতা এভাবেই পাওয়া সম্ভব। যেমন: ওজন কমানো, ভাল ঘুম হওয়া, ভাল যৌনমিলন, ভাল মেজাজ এবং রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া ইত্যাদি।

পিটার অ্যান্টোনিও, একজন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক, ফিটনেস প্রশিক্ষক এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম স্পোর্ট ইউনিভার্সিটির নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ।তার মতে, মধ্যাহ্নভোজন বা দুপুরের খাবারের বিরতিতে ব্যায়ামের জন্য সময় বের করা ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হতে পারে।

এটি শুধু তার ক্লায়েন্টদের ফিটনেসের লক্ষ্য অর্জনেই সহায়তা করছে তা নয় বরং তবে এটি তাদেরকে দিনের মধ্যভাগে এক ধরণের সাফল্যের অনুভূতি দেয়। “এই অনুভূতি সারা দিনব্যাপী স্থায়ী হতে পারে”, তিনি বলেন।অ্যান্টোনিও আরো বলেন, যে ক্লায়েন্টরা দিনের বেলা ব্যায়াম করেন তারা বেশি বেশি কাজ পান এবং তাদের অসুস্থতার ছুটিও নিতে হয় অনেক কম ।

এছাড়াও, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। কেননা প্রতিদিনের মিটিং, ই-মেইলের ঝড়, চাপ-মুক্তভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেয় এই ব্যায়াম।প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বইতে অনেকেই বিরতির সময়ে ব্যায়াম করার কথা বলেছেন।

এ বিষয়ে গবেষণায় জানা গেছে, প্রতিদিনের একঘেয়ে কাজ থেকে বিরতি নিলে এবং ছকে বাঁধা জীবন থেকে কিছু সময়ের জন্য বাইরে বেরিয়ে এলে মানুষের কাজের প্রতি যেমন মনোযোগ বাড়ে তেমনি পারফর্মেন্সও ভাল হয়।কাজের দিনে ব্যায়াম করার আরও বড় ধরণের সুবিধা রয়েছে।

সমাজের বড় ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা যেগুলো কিনা কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে, সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কর্মক্ষেত্রে শরীরচর্চা বাধ্যতামূলক করা উচিত কিনা তা নিয়ে স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

ব্রিটেনের হার্ট ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুসারে যুক্তরাজ্যের দুই কোটিরও বেশি মানুষ শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে, যার কারণে দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা খাতকে বছরে ১৫০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।

রায়ান হোমস, যিনি হুইটসুইট নামে একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম চালাচ্ছেন, তিনি কয়েক বছর আগে একটি মতামত লিখেছিলেন যা ভাইরাল হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল “কর্মচারীদের বেতন দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ব্যায়াম করার সুযোগ করে দেয়ার সময় কেন এসেছে।”

এর আওতায় তিনি অফিসের শীর্ষ পর্যায় থেকে সবাইকে ঘড়ি ধরে শরীরচর্চার ডাক দেন।সর্বোপরি, তিনি বলেন, মানুষ যদি প্রতিরোধযোগ্য হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় মারা যায় তবে তার একটি শক্তিশালী দল টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

যেভাবে করবেন:
ক্রিস্টিয়ান অ্যালেন ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টনে বাস করেন এবং একটি স্টার্ট-আপ পরিচালনা করেন যা বিভিন্ন সংস্থাকে গ্রাহক পরিষেবা সরবরাহ করে।তিনি বলেন যে ওজন তোলা, যোগব্যায়াম করা বা দৌড়ানোর জন্য তাঁর পছন্দের সময়টি হল কাজের মধ্যে যেকোনো সময়।

কাজের সময়ে ফিটনেসকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিরতি নেয়ার মতো এমন সমমনা লোকদের খুঁজে পাওয়া মি. অ্যালেনের জন্য সহজ হয়েছে।তিনি বলেন, “আমি বলতে পারি যে আমার ১৯ বছরের ডেস্ক জবে আমি যখন নিয়মিত শরীরচর্চা করতাম, আমি সবসময় সুখী ও স্বাস্থ্যবান বোধ করতাম।”

গত ছয় বছর ধরে, তিনি মিটআপ নামের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটি দল সংগঠিত করেছেন যারা প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনের দুপুরে ফুটবল খেলার জন্য জড়ো হয়।পুরানো চাকরিতে থাকার সময় এক লাঞ্চ বিরতিতে তিনি দেখতে পান, দুপুরে একটি দল ফুটবল খেলছে। সেই দিনই এই বুদ্ধিটি তার মাথায় আসে।

“ওই সময় আমি সপ্তাহে কয়েক দিন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতিতে কয়েকজন সহকর্মীর সাথে দৌড়াদৌড়ি করতাম, তবে সেই রুটিনে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু যোগ করার ধারণাটি আমার পছন্দ হয়েছিল।”অ্যালেন একা নন। কর্মক্ষেত্রগুলো ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে যেখানে অনেকের জন্য মধ্যাহ্নভোজনের বিরতিতে শরীরচর্চা করা সহজ করে তোলা হতে পারে।

আরও বেশি বেশি সংস্থা অফিস চত্বরে ব্যায়ামাগার স্থাপন করছে। কিছু ব্যায়ামাগার তাদের পরিষেবার পাশেই কর্মক্ষেত্রকে সংযুক্ত করছে।বিলাসবহুল জিম চেইন ইকুইনক্স এমন একটি উদাহরণ। যেখানে রয়েছে কর্মীদের আকৃষ্ট করার জন্য বড় টেবিল এবং জুস বার।

কর্মীরা এখানে ট্রেডমিল এবং অন্যান্য ব্যায়ামের যন্ত্রপাতির পাশে ল্যাপটপ বসিয়ে সহজেই সেরে নিতে পারেন তাদের জরুরি কাজ।তবুও, যদি আপনি পুরো এক ঘণ্টা (কিংবা তারও বেশি) বিরতি নেয়ার সুযোগ না পান, তবে কী করবেন?

কোন সমস্যা নেই – বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ছোট ছোট কিছু উপায়ে আপনি দিনেরবেলা শরীরচর্চা সেরে ফেলতে পারেন। এবং এজন্য আপনার অফিসের কোন অভিনব ফিটনেস সেন্টারের দরকার নেই।

সান ডিয়েগোভিত্তিক সংস্থা আইডিইএ হেলথ অ্যান্ড ফিটনেস অ্যাসোসিয়েশন-এর প্রধান সম্পাদক স্যান্ডি টড ওয়েবস্টার বলেছেন, “পাঁচ মিনিটের বা এক ঘণ্টার শারীরিক কসরত, সময় যাই হোক না কেন, কাজের দিনগুলিতে যে কোনও ধরণের শারীরিক কসরতেই প্রকৃত স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যায়”।এই সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক এবং ফিটনেস পেশাদারদের সংযুক্ত করেছে।

মি. ওয়েবস্টার বলেন, “যদি আপনি কোনো উপায়ে হাঁটতে বা নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হন তবে তাই করুন। আপনার কোন জিম লাগবে না। শারীরিক কসরতের সুযোগ সর্বত্রই রয়েছে”।”কর্মস্থলে একজোড়া অ্যাথলেটিক জুতা এবং মোজা রাখুন এবং বিরতির সময় অথবা যখনই সুযোগ পান বেরিয়ে পড়ুন, সেটা ৫ মিনিটের জন্য হোক, ১০ মিনিটের জন্য বা ২০ মিনিটের জন্য।

টড ওয়েবস্টার আরও বলেন, “আপনি যদি সিঁড়িযুক্ত বহুতল কোন ভবনে কাজ করেন তবে সব সময় সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করুন বা আপনার অফিসে দীর্ঘতর পথ ধরে হেঁটে যান। এর সব কিছুই ব্যায়াম হিসেবে কাজ করবে।”

আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী বা অফিসের পরিস্থিতি সেটা কোন বিষয় নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে দিনের বেলা এক ঘণ্টার ব্যায়ামকে অফিসের মিটিংয়ের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

টড ওয়েবস্টার বলেন, “মূল বিষয়টি হল ব্যায়ামের জন্য সময় নির্ধারণ করা এজন্য আপনার ক্যালেন্ডারে ওয়ার্কআউট বা ব্যায়াম শব্দটি লিখুন – এবং তারপরে সেখানে চিহ্নিত প্রতিটি অ্যাপয়েন্টমেন্টকে গুরুত্ব দিয়ে দেখুন।”

‘আপনার সম্পর্কে বলুন’
তবুও, এই বিষয়গুলো বলার চাইতে করা কঠিন।এবং সেটা কেবল এই কারণেই নয় যে কিছু অফিসের বস এতোটা উদার নন বা আপনার ক্ষেত্রে জিম শেষে গোসল করা খুব প্রয়োজন হলেও অফিসে সেটার সুযোগ নেই।

এমন অনেক কাজ রয়েছে যা আপনাকে আপনার ডেস্ক থেকে দূরে থাকাটা কঠিন করে তোলে। (সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দূরবর্তী কাজের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলির মধ্যে এটি একটি বড় কারণ হতে পারে)

অ্যালেন বলেন যে, তিনি বেশ ভাগ্যবান তার এমন কিছু জায়গায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে যেখানে কাজ এবং জীবনে ভারসাম্য করা হয়।

তবে এটি সবসময় সহজ ছিল না। অনিয়মিত কাজের সময়সূচী ব্যায়ামের বিরতিতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এবং সহকর্মীদের উপরও এর সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে।

“আমি সবসময় একটি দলের অংশ হিসাবে কাজ করেছি,” তিনি জানান, ব্যায়াম করতে একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তিনি অফিস ছেড়ে গেলে সেটা তার সহকর্মীদের ওপর প্রভাব ফেলবে কিনা সে সম্পর্কে তাকে সচেতন থাকতে হয়েছে।”

“যে সহকর্মীরা আমার মতো এই নীতিমালার সদ্ব্যবহার করতে পারেননা তারা ঈর্ষান্বিত বা বিরক্ত বোধ করছেন কিনা সেটাও আমার বিবেচনা করতে হয়।”তবে তিনি এটাও বলেছেন যে, শরীরচর্চাকে অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোকে ভয় পেলে চলবে না।

“আপনি কী করছেন এবং কেন আপনার কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কে আপনি যেন আরও খোলামেলা হতে পারেন, এসব হচ্ছে তেমন কিছু কারণ “।

error0