বিভাগ - মতামত

ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের আশ্রয় কোথায়?

প্রকাশিত

এ্যাডঃ তৈমূর আলম খন্দকার: বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম। ০২/১২/২০১৯ ইং তারিখে মিডিয়াতে প্রকাশিত রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এর বরাত দিয়ে একটি বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, যাতে তিনি বলেছেন যে, “কচু ছাড়া সবকিছুতেই ফরমালিন, নির্ভেজাল খাবার দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। খাদ্যে ভেজালের কারণে ক্যান্সারসহ জটিল রোগ হচ্ছে। কিছু মানুষ দানব হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে মানুষকে ফেরাতে হবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে শুধু পকেট মারলেই গণপিটুনি দেয়া হতো, এখন খাদ্যে ভেজালকারী মানুষকেও গণপিটুনি দিতে হবে। মানুষকে এ পথ থেকে ফেরাতে হবে। নইলে জাতি হিসেবে আমরা পঙ্গু হয়ে যাবো।” রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে বসে তিনি (রাষ্ট্রপতির বক্তব্য যদি সঠিক ভাবে প্রকাশিত হয়ে থাকে) উক্ত বক্তব্য দিতে পারেন কি না এ মর্মে আইনগত ব্যাখ্যা বা নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত থাকলেও তিনি গণমানুষের মনের কথাটিই বলেছেন। অনুরূপ বক্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রতি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবেও বর্তমান রাজনীতিতে রাজনৈতিকদের অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের অসাহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। যারা তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতি করে তাদেরকে ব্যাংক লুটেরা ব্যবসায়ী ও আমলারা যে ভাবে ল্যং মেরে মাঠ ছাড়া করছেন সে কথাও রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছিলেন, “যে পুলিশ আমার পাছার মধ্যে বাড়ী দিয়েছে সে পুলিশই অবসর গ্রহণের পর আমার সাথে রাজনীতি করতে চায়।” আমাদের সমাজে হাই ব্রীডের প্রভাবে রাজনীতির যে অচল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের অন্যান্য হাস্যপদ কথার মধ্যে উক্ত বক্তব্যও প্রকাশ পেয়েছিল। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি সমার্বতন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উক্ত বক্তব্যগুলি অপ্রাসঙ্গিক হলেও সত্যের অপলাপ ঘটে নাই, বরং কথা ছিল তৃণমূলে রাজনীতি করা মানুষের মনের কথা। খাদ্যে ভেজাল ও রাজনীতিতে হাই ব্রীড নিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তিনি সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এ জন্য তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তাহাকে আরো বেশী কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা যেতো, যদি তিনি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থার অন্যান্য বিষয়গুলি নিয়েও সরাসরি বক্তব্য রাখতেন। একজন মানুষ যখন খাদ্যে ভেজাল দেয় তখন সে আর মানুষ থাকে না বরং হিং¯্র পশুতে পরিণত হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রি আমাদের দেশেই হয়, অন্যকোন দেশে এ ধরনের পৈশাচিকতার কথা না শোনা গেলেও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার এবং শুধু এ কারণেই যার সামর্থ আছে সে বাংলাদেশে চিকিৎসা করানোকে নিরাপদ মনে করে না, ফলে সামান্য চিকিৎসার জন্যও বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশে আইন আছে কিন্তু আইনের কার্যকরীতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন। এখানে আইনের চেয়ে মানুষের নৈতিকথা ও পৈশাচিকতা কতটুকু নীচে নামতে পারে এরও একটি মাপকাঠি প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রপতি থেকে গণমানুষ অনেক কিছু আশা করে। শেখ হাসিনা সরকার প্রতিদন্ধীতা বিহীন যে নির্বাচনী সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা প্রতিরোধে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা থাকলে দেশবাসী তাকে জীবনভর মনে রাখতো। ইসলামী ফাউন্ডেশন সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিটি দপ্তর এখন ডাকাতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে, এ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মানুষ আশা করে।

সম্প্রতি গবেষক ও আবহাওয়াবিদরা প্রকাশ করেছেন যে, বায়ু দূষনের প্রশ্নে ঢাকা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশী দূষিত শহর। ইতোপূর্বেও জাতিসংঘের জরিপে দেখা গিয়েছে যে, ঢাকা বসবাসের অযোগ্য। অন্যদিকে যানজটের কারণে অনেক বৈদেশিক বিনিয়োগ বাংলাদেশে হচ্ছে না বলে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু এ সকল অবস্থার জন্য দায়ী কে? সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশ একটি লুটের রাজ্যে পরিনত হয়েছে। যে যে দিক দিয়ে পারছে লুট করছে, একটু প্রভাবশালী হলেই লুট করতে আর অসুবিধা হয় না। কারণ এ দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অতি সহজেই কেনা যায়, প্রশাসনের মুখ বন্ধ করা যায় অর্থের বিনিময়ে। অতএব, যার অর্থ আছে তার কাছে বাংলাদেশ একটি ভোগের সামগ্রী মাত্র, যে যে দিক দিয়ে পারছে সে দিক থেকেই লুটে খাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে ভোগ করছে এবং সে “ভোগ” বিকৃত রুচির চেয়েও নি¤œস্তরের।

দেশের পরিবেশ ও জীব বৈচিত্রকে রক্ষা করার জন্য সংবিধান (পঞ্চাদেশ সংশোধন) আইন’ ২০১১ এর ১২ ধারা বলে ১৮(ক) অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করা হয়, যাতে উল্লেখ করা হয় যে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষন ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব বৈচিত্র্য জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণির সংরক্ষন ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।” অথচ জনপ্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের সরাসরি মদদে জলাভূমি, তিন ফসলী ভূমি, খাল বিল নদী নালা সব ভরাট করে বড় বড় হাউজিং কোম্পানী আবাসন প্রকল্প করে ঢাকা শহর ও শহরতলীর জনপথকে পদভারে আরো ভারী করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর প্রতিরোধের কোন ভূমিকা নাই। রাষ্ট্রের পক্ষে ভূমিদস্যুদের প্রতিরোধ করা যাদের উপর দায়িত্ব তারাই এখন ভূমিদস্যুদের প্রধান দোসর।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ০২/১২/২০১৯ ইং তারিখে স্পেনের মাদ্রিদে “অ্যাকশন ফর সারভাইভাল ভালনাইরেবল নেশন্স কপ-২৫ লিডার্স সম্মেলনে বক্তব্যে” আগামী প্রজন্মের জন্য বসবাসযোগ্য একটি পৃথিবী গড়ার তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন যে, “জলবায়ু পরিবর্তন গোটা বিশ্বের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখনই কাজ শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে তারা ক্ষমা করবে না। প্রতি মুহুর্তে আমাদের নিষ্ক্রিয়তা পৃথিবীর প্রতিটি জীবিত মানুষকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।” দেশে বিভিন্ন সময় বক্তব্যে তিনি বলেছেন যে, “তিন ফসলী জমিতে কোন প্রকার শিল্প কারখানা বা প্রকল্প স্থাপন করা যাবে না। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগায় রাজধানীর পার্শ্ববর্তী রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের খাল, বিল, নদী, নালা, পুকুর, তিন ফসলী জমি, নাল জমি প্রভৃতি জায়গা বালু দ্বারা ভূমিদস্যুরা ভরাট করে ফেলছে। বিষয়গুলি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এম.পি ও প্রশাসন চোখেও দেখে না, শুনেও শুনে না। প্রধানমন্ত্রীর কথা অগ্রায্য হচ্ছে নির্বিচারে, তারপরও নির্লজ্জার সাথে সুশাসনের দাবী করছে সরকার। পরিবেশের হুমকি ছাড়াও একজনের জমি আর একজন বালু দ্বারা ভর্তি করে ফেলবে এটা কেমন আইন? সরকারই বা কোন্ কারণে এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে? রাষ্ট্রীয় উদ্দ্যেগে ভূমিদস্যুদের যদি প্রতিরোধ না করা হয় তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর উক্ত বক্তব্যগুলি লোকদেখানো বক্তব্যে পরিনত হবে, আক্ষরিক অর্থে নহে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বরণ করিয়ে দিতে চাই যে, পরিবেশ রক্ষার্থে তার কঠিন হুশিয়ারীতে কোন কাজ না হওয়ায় জনগণকে প্রতিকারের জন্য প্রতিনিয়তই হাই কোর্টে দারস্থ হতে হচ্ছে এবং হাই কোর্ট ভূমিকা নিচ্ছে বলেই কোথাও কোথাও এর প্রতিকার হচ্ছে। কিন্তু হাই কোর্টে আসার শক্তি সামর্থ কয়জনের আছে? কোর্টের শরনাপন্ন হলেও ভূমিদস্যুরা বিচার প্রার্থীদের উপর হামলা চালায়, তখন জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কোন প্রকার প্রটেকশন ভূক্তভোগীরা পায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমতাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ আশ্রয় পাবে কোথায়?

লেখক
কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)