বিভাগ - মতামত

ক্ষমা করবেন ভাষা বীর রওশন আরা বাচ্চু

প্রকাশিত

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া: ভাষা সৈনিক মতিনের জন্মদিনে চীর বিদায় নিলেন ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চু। ৩ ডিসম্বর ২০১৯, ছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের প্রধানতম নায়ক ভাষাবীর, ভাষা সৈনিক আবদুল মতিনের ৯৩ তম জন্মবার্ষিকী। খুব বেশী আয়োজন ছিল না। এরই মাঝে হঠাৎ ফোন পেলাম ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চু আর নেই।

খুব কষ্ট পেলাম। আমরা রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে যখনই ভাষা মতিন, রওশন আরা বাচ্চু’র নিকট ছুটে গেছি আমাদের ডাকে সারা দিয়েছেন। অনুষ্ঠান কত বড়, কত দাবী, অথবা কোথায় এই কথাগুলো কখনই জানতে চাইতেন না। সন্তানের মত স্নেহ মাখা হৃদয় নিয়েই চলে আসতেন। কথা বলতেন, স্মৃতিচারণ করতেন।

ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চু’র মনে আপক্ষেপ ছিল, ছিল কষ্ট। যেই ভাষা আন্দোলনে প্রথম সারীতে থেকে লড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন সেই ভাষা আন্দোলনের একুশে পদক থেকে রাষ্ট্র তাকে বঞ্চিত করেছে। তার অনেক ছোট, অথবা ভাষা আন্দোলনে ছিলন না এমন কেউ কেউ হয়তো একুশে পদক পেয়েছেন, তিনি পাননি। কেন ? অপরাধটা কি তার ?? নাকি রাষ্ট্রের অবহেলা ???

বিকালে লাশ আনা হলো বাংলা একাডেমী চত্ত্বরে। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন গুনি মানুষ আর আমাদের মত অল্প কিছু সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা জানালাম তাকে। সরকারের পক্ষে কাউকে দেখি নাই। হয়তো তারা অনেক বেশী ব্যস্ত। আর একজন ভাষা সৈনিকের চলে যাওয়ায় তাদের কি আসে যায়। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে জানাযার কথা শোনা গেলেও সেখানে তা হয় নাই। কেন হয় নাই তার উত্তর খোজার চেষ্টা করছি। কিন্তু, পাই নাই।

তার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে লাশ নিয়ে উপস্থিত হলাম। জানাযা পরলাম মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ। একান্তই তার ভক্ত যারা তারাই। তবে, কৃতজ্ঞ ঢাবি’র ভারপ্রাপ্ত ভিসির নিকট। খবরই পেয়েই ছুটে এসেছেন তিনি। শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চুর প্রতি। প্রশ্ন জেগেছে, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে সেখানে ডাকসু কি করলো ? ডাকসুর কি কোন দায়বদ্ধতা নাই। তাদের কি উচিত ছিল না এই ভাষা সৈনিকের প্রতি নূন্যতম শ্রদ্ধা জানানো। কিংবা ঢাবিতে কার্যকরী ছাত্র সংগঠনগুলোর কি কোন দায়িত্বই ছিল না ? নাকি তারাও তাদের পূর্বসূরীদের সম্মান করতে চায় না। নাকি পেছনের ইতিহাস জানতে চান না তারা ? বিষয়টি বড্ড জানতে ইচ্ছে করে। আর ইচ্ছে করলেই জানাবে কে ?

দেখা পাই নাই, যারা ভাষা আন্দোলন নিয়ে না না বাণিজ্যে জড়িত, যারা নিজেদের ভাষা আন্দোলনের গবেষক বা চেতনার দাবীদার বলে দাবী করেন অথবা প্রতিনিয়ত অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা তুলেন তাদের কাউকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবীদার এত এত রাজনৈতিক নেতার ভীড় যেথানে সেখানে তাদেরও দেখা যায় নাই। বড্ড কষ্টের ছিল বিষয়টি।

যে শহীদ মিনার ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত, সেই শহীদ মিনারে এক মুহুর্তের জন্যও জায়গা হয় নাই ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চুর। বন্ধু উপস্থাপন টিমুনি খান সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের এক শীর্ষ নেতাকে এ বিষয়ে ব্যাবস্থা গ্রহনে কথা বললেও তিনি তা করেন নাই। বরং পরবর্তীতে টিমুনি খানের মোবাইল রিসিভ করারও প্রয়োজন বা দায়িত্ব অনুভব করে নাই। এরাই আবার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মান বা ভাষা আন্দোলনের চেতনা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন।

বড়ই হতাশার বিষয়, অনাদরে, অবহেলায় চলে গেলেন ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চু। তা দেখে রাষ্ট্রভাষা মতিনের স্ত্রী গুলবদনন্নেছা মনিকা কান্না বিজরিত কন্ঠে বললেন, রাষ্ট্র যেন বাচ্চুকে আর একুশে পদক না দেন। জিবিত থাকতে যে রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি আর সম্মান দিল না, মরনের পর দিয়ে কি হবে ?

তিনি বেশকিছু খ্যাতনামা স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, আজিমপুর গার্লস স্কুল, নজরুল একাডেমি, কাকলি হাইস্কুল। প্রশ্ন জাগে তার কোন ছাত্রও কি তার ইন্তেকালের খবর পাননি ?

ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার উছলাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা এ এম আশ্রাফ আলী, মা মনিরুন্নেসা খাতুন। রওশন আরা বাচ্চু ১৯৪৭ সালে পিরোজপুর গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ১৯৪৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৪৯ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। ১৯৫৩ সালে অনার্স পাস করেন। রওশন আরা বাচ্চু ‘গণতান্ত্রিক প্রগ্রেসিভ ফ্রন্ট’-এ যোগ দিয়ে ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং উইমেন স্টুডেন্টস রেসিডেন্সের সদস্য নির্বাচিত হন। রওশন আরা বাচ্চু সর্বশেষ বিএড কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। অবসর নেন ২০০২ সালে।

ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চুর নামাজে জানাজা বুধবার (৪ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া নবীন চন্দ্র মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।

তাঁর নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ভাষা রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। জানাজা শেষে পার্শবর্তী উছলাপাড়া গ্রামের নিজ পৈতৃক বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়।

আমরা বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই সরকারেরই উচিত ভাষা সৈননিকদের একটি তালিকা তৈরী করা এবং ভাষা বীর হিসাবে তাদের সম্মান জানানো সকল ব্যবস্থা গ্রহন করা। এটি করতে পারলেই হয়তো ভাষা সৈনিকদের যথাযথ সম্মান জানানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, ক্ষমা করবেন আমার ভাষা সৈনিক, ভাষা বীর রওশন আরা বাচ্চু। ক্ষমা করবেন আমাদের। শেষ বিদায় কালেও সম্মান জানাতে পারলাম না আমরা।

(মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ)