চলছে ক্ষমতা অপপ্রয়োগের মহামারী

প্রকাশিত

এ্যাডঃ তৈমূর আলম খন্দকার
বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম। “কর্তা যা না বলে সভাসদ বলে তার বহু গুন” কবির এমন একটি পংক্তি সমাজে চালু আছে। এ প্রবাদটির যথেষ্ট বাস্তবতা রয়েছে। দেশে আইনের শাসন নাই, এ অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। চলছে ব্যক্তির শাসন এবং ব্যক্তিটি যাদের দ্বারা দেশব্যাপী শাসন কার্য পরিচালনা করেন তাদের ক্ষমতা এখন আকাশ ছোয়া যা প্রয়োগে অনেক সময় তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সীমা লংঘন এখন চরম পর্যায়ে চলে গেছে। ক্ষমতা অপপ্রয়োগের সীমা রেখা এখন পাবলিক পারসেপশনের ধার ধারে না। গণমানুষ ক্ষমতাধারীদের এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগকে সমর্থন করুক বা না করুক, এতে ক্ষমতা ধারীদের কোন আসে যায় না। কিন্তু ক্ষমতাধারীদের ক্ষমতার অপব্যবহারের খতিয়ান যার একাউন্ট থেকে “গণআস্থা” ডিডাক্ট হওয়ার কথা তা সঠিক ভাবেই ডিডাক্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে ব্যালেন্সসীট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত যার নামে একাউন্ট তিনি টের পাচ্ছেন না, টের যদিও পেয়ে থাকেন তবে বোধদয় হচ্ছে বলে মনে হয় না। জনগণ গোপন কক্ষে স্বাধীন ভাবে ব্যালটে সীল মারার যদি কোন দিন সূযোগ পায় তবেই ব্যালেন্সসীট চূড়ান্ত ভাবেই প্রকাশ পেয়ে যাবে, যা ইতোপূর্বে অনেক স্বৈরশাসকের বেলাতেই হয়েছে। জনগণ ব্যালেন্সশীট দেখার অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়।

বিরোধী দলের নেতাকর্মীর পক্ষে আদালত কোন সিদ্ধান্ত বা রায় প্রদান করলে দুদক তৎক্ষনাত সে রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করে। সেটা যে কোন আদেশই হউক, শুধুমাত্র বিরোধী দলের পক্ষে গেলেই হলো। অতি সম্প্রতি দুদকের দায়েকৃত মামলায় সরকারী দলের সাবেক এম.পি এবং পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তার স্ত্রী জেলা মহিলা লীগ সভানেত্রীর জামিন না দেয়ায় জেলা জজ’কে বদলী করে একই দিনে ভারপ্রাপ্ত জজ’কে দিয়ে জামিন করার ব্যবস্থা নিলেন আইন ও বিচার মন্ত্রী এবং এ মর্মে মন্ত্রী যে সাফাই দিয়েছেন তা শিশু বাচ্চাদের মন ভুলাতে পারে, কিন্তু কোন বিবেকমান মানুষ তা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে না এবং এটা আমার নিজস্ব ধারনা যা আমি দৃঢ় ভাবেই বলতে চাই। দুদকের মামলায় স্বস্ত্রীক আওয়ামী লীগ সাবেক এম.পি’কে জামিন না দিয়ে পিরোজপুর জেলা জজ কি ভুলটি করেছে তা কিন্তু আইনমন্ত্রীর সাফাই গাওয়া পূর্ণ বক্তব্যে পাওয়া যায় না। দুদকের মামলায় বিএনপি নেতাদের অহরহ জামিন বাতিল হচ্ছে, মানহানীর মত জামিন যোগ্য মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের জামিনের জন্য হাই কোর্ট পর্যন্ত আসতে হয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগ নেতার জামিন হলেও দুদক এ জামিনের বিরুদ্ধে আপীল করে নাই। এখানেই দুদকের পক্ষ পাতিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ মিলে। সরকারী দলের জন্য আইনের প্রয়োগ হয় এক ভাবে এবং একই আইন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগ ভিন্ন ভাবে হলে, এটাকি ক্ষমতার অপব্যবহার নহে? অন্যদিকে জেলা জজ যদি এম.পি মন্ত্রীদের ক্রীড়ানক বা গিনিপিকের মত ব্যবহ্নত হয় তবে বিচার বিভাগের মান সম্মান থাকে কোথায়? বিচার বিভাগের একজন অভিবাবক রয়েছেন, তিনিই বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। এ ছাড়াও তাদের এসোসিয়েশন রয়েছে। বর্ণিত বিষয় নিয়ে অভিবাবক বা এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কোন প্রকার প্রতিবাদ করা হয় নাই। তবে কি আসামী সরকারী দলের হওয়ার কারণেই এ হীনমান্যতা (!)

সরকারী আমলাদের এখন একমাত্র কাজ হলো সরকার প্রধানের গুনর্কীতন করে আস্থা অর্জন করত: নিজ মর্জিতে জনগণ’কে শোষন শাসন। স্বদেশী আন্দোলনের নায়ক নেতাজী সুভাষ বোসকে রিমান্ডে নিয়ে ব্রিটিশ কর্মচারী ভারতীয় পুলিশ যে আচরন করেছে, ১৯৫২ সনে পাকিস্তানী কর্মচারী বাঙ্গালী পুলিশ রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি করে যে ভাষায় আইনী সাফাই গেয়েছে, সে একই ভাবে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই সংগ্রাম করা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপর বাংলাদেশী পুলিশ অনুরূপ আচরণ করছে। রাষ্ট্রের পরিবর্তন হয়েছে, সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সরকারী কর্মচারীদের আচরনগত নির্যাতন থেকে গণমানুষ রক্ষা পাচ্ছে না। ফলে স্বাধীনতার সুফল আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাই খেয়ে ফেলছে।

কেসিনিও সমাচার, টাকার গোডাউন আবিষ্কার, হোটেল ওয়েষ্টিন ক্যালেঙ্কারীর ঘটনা ধামাচাপা পড়তে না পড়তেই গাজীপুরের সরকারী দলের নারী নেত্রী কর্তৃক প্রকাশ্যে নারী পুলিশকে চড়মারার কাহিনী প্রকাশিত হলো। সরকার সড়ক দূর্ঘটনা রোধে কঠিন কঠিন আইন প্রনয়ন করলেও সরকারী দলের বিরুদ্ধে এ আইন প্রযোজ্য নহে মানসিকতার কারণেই নারী নেত্রীর এ ক্ষমতার দাপট, যা দেখে দেখে পুলিশ অভ্যস্ত হলেও ভাগ্যদোষে প্রকাশ্যে রাজপথে হওয়ায় বিধিবামের কারণে নারী নেত্রীকে জেলে যেতে হয়েছে, নতুবা চড় খাওয়া সে দুই নারী পুলিশকেই বদলীর আতঙ্কে থাকতে হতো। ইতোপূর্বেও সরকারী দল কর্তৃক অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নাজেহাল এমনকি পিটুনী পর্যন্ত খেয়েছে, কিন্তু সে নেতাদের জেলে যেতে হয় নাই, যেমনি হয়েছে গাজীপুরের নারী নেত্রীর ক্ষেত্রে। হোটেল ওয়েষ্টিনের এই ঘটনা এক দিনের নহে, বরং দীর্ঘ দিনের প্যাকটিস। ঘটনার নায়িকা নরসিংদীর ঐ মহিলা নেত্রী ও তার স্বামী যদি সরকারী দলের না হতো তবে নিশ্চয় ঐ নষ্ঠা নারীর পক্ষে রাজনৈতিক অংঙ্গনে প্রবেশ করে ক্ষমতার এতো দাপট দেখানো সম্ভব হতো না। এ ধরনের ঘটনার জন্য একজন নষ্টা নারী যেমন দায়ী, তেমনি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তারা একই দোষে দোষী হলেও অদ্যবদি সংশ্লিষ্ট সরকারী আমলাকে আইনের আওতায় আনা হয় নাই। এখানেই আইন প্রয়োগে পক্ষপাতিত্ব করে ক্ষমতার অপব্যবহার। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সূলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় কুড়িগ্রামের বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে বাড়ী থেকে তুলে এনে মাদক মামলায় ১ বছরের বিনা শ্রম সাজা দেয়া হয়েছে। এ সাজা প্রদানে আইনের ব্যাপ্তয়তো ঘটেছেই, অধিকন্তু জেলা প্রশাসক ও আর ডিসি সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। এমনি ভাবে অর্থের বিনিময়ে পুলিশ অনেককেই মাদক দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছে। দেশে মাদকের মহামারী চলছে, পুলিশ বিভাগের কেহ কেহ নিজেও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, মাদক বিষয়ে সরকারের মূখে জিরো টলারেন্সের কথা থাকলেও বাস্তবে রয়েছে এর ভিন্নতা। মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ এবং দেশে মাদক উৎপাদন বন্ধ করতে না পারলে মাদকের মহামারী ঠেকানো যাবে না, অন্যদিকে মাদক ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণীর লোকের যেহেতু হাত রয়েছে সেহেতু মাদকের মহামারী ঠেকানো সম্ভবপর নহে। সারকারী আমলারা ক্ষমতায় অপব্যবহার কোন পর্যন্ত যেতে পারে এটাই এর অন্যতম উদাহারণ। মধ্য রাতে ৪০ জনের একটি বাহিনী একজন সাংবাদিককে ধরতে যাওয়ার বিষয়ে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি জনাব মোঃ আশরাফুল কামাল এবং বিচারপতি জনাব সরদার মোঃ রশিদ জাহাঙ্গীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন ব্যাঞ্চ বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। মহামান্য উচ্চ আদালতের দৃর্ষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই যে, এঘটনা শুধু নিছক কুড়িগ্রামের নহে, সমগ্র বাংলাদেশে এ চিত্র বিরাজমান। ক্ষমতা অপব্যবহারের ব্ল্যাঙ্ক চেক থেকেই এ মানসিকতার উৎপত্তি, যার জন্য জনগণ হয়রান হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে অধিকার বঞ্চিত সাধারণ মানুষ।

আমলাদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দায়িত্বের অবহেলা চলছে একই গতিতে। অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত এক নারী ছাত্রী পেটের ব্যাথায় সরকারী হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করে। ছাত্রীটি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল না। ছাত্রীটি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে সন্দেহে অনেক চিৎকার করার পরও সরকারী বেতন ভুক্ত ডাক্তারা ছাত্রীটিকে ঔষধ দেয়া তো দূরের কথা, কাছেও যায় নাই। আমি মনে করি বাংলাদেশ বলে এটা সম্ভব হয়েছে। পৃথিবীর অন্য যে কোন রাষ্ট্র হউক গণতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক, এ ধরনের দায়িত্ব অবহেলার জন্য জবাবদিহি হতে হতো। বাংলাদেশে এ ধরনের দায়িত্ব অবহেলা সম্ভব হওয়ার কারণে ডাক্তার সাবেহরাও এখন সক্রিয় রাজনীতি করে। শুধু তাই নয় পেশাজীবি সরকারী ডাক্তারদের প্রমোশন ও পোষ্টিং হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। সরকারী দল না করলে ঢাকায় পোষ্টিং সম্ভব হয়ে উঠে না এবং ভুক্ত ভোগীদের ইহাও একটি অভিযোগ।

২১/০৩/২০২০ ইং তারিখে চট্টগ্রামের মিরের সরাইতে সরকারী দলের এক মহিলা নেত্রী এক ব্যক্তিকে মসজীদের ভিতরে যেয়ে জুতাপেটা করেছে। কোন কারণে জুতা পেটা করলো তা সংশ্লিষ্ট সংবাদে জানা যায় নই। হতে পারে সংশ্লিষ্ট কোন জঘন্য বা নিন্দনীয় অপরাধ করেছে। তার পরও এটাই বিবেচ্য বিধয় যে, একজন নারী কর্তৃক একজন পুরুষকে মসজীদের ভিতরে জুতাপেটা করার কাহিনী এটাই প্রথম। উক্ত মহিলা যদি সরকারী দলের নেত্রী না হতো তবে হয়তো ঘটনাটি মসজীদের ভিতরে প্রবেশ করতো না। এখানেই ক্ষমতার দাপট বা অপপ্রয়োগ।

পুলিশ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। পুলিশের ক্ষমতা অপপ্রয়োগ বা অপব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ২০১৩ সালে বিশেষ আইন করা হয়েছে। তারপর পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা কমে নাই। প্রায় প্রায়ই দেখা যায় যে, পুলিশ নির্যাতনে মানুষ হত্যা হচ্ছে। ২১/০৩/২০২০ ইং তারিখে মনিরুজ্জামান হাওলাদার নামে উত্তরখান থানায় পুলিশ হেফাজতে এক আসামীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবী পুলিশ নির্যাতনের কারণে এ হত্যা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, মেধাবী ছাত্র রুবেল হত্যার মামলায় পুলিশের এসিসটেন্ট কমিশনার আকরাম ছাড়া পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর জন্য কোন পুলিশের অদ্যবদি বিচার হয় নাই। বরং একটি অত্যাচারী বাহিনী হিসাবে গড়ে উঠার জন্য সরকার থেকেই পুলিশকে উৎসাহিত করা হয়ে আসছে। সাধারণের উপর অত্যাচার নির্যাতন এবং ক্ষমতাসীনদের কুর্নিস করার পুলিশী সংস্কৃতি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে যা ছিল, বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে তাহাই আছে, কোন পরিবর্তন হয় নাই। বরং তারা রাজনৈতিক সরকারের প্রটেকশন বেশী পাচ্ছে।

সরকারী আমলাদের পক্ষপাতিত্বের কারণে ক্ষমতা অপব্যবহারে অনির্বাচিত এই সরকারের নির্বাচন কাহিনী এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্য সরকারের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য আমলাদের কর্মকান্ড আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত হচ্ছে। গত ১২ই মার্চ যুক্ত রাষ্ট্রের পর রাষ্ট্র দফতরের “কান্ট্রি রিপোটার্স অন হিউম্যান রাইটস প্রাকটিসেস” (Country Repoters on Humen Right Practices) শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, “২০১৮ সালের নির্বাচন অবাধ ও মুক্ত বলে বিবেচিত হয়নি। ব্যালট বাক্স ভরা, বিরোধী প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। নির্বাচনি প্রচারনার সময় বিরোধী দলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের হয়রানী, নির্বিচারে গ্রেফতার ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে” এবং এগুলিও সম্ভব হয়েছে ক্ষমতা অপব্যবহারের মহামারীর কারণে।

সর্ব সময়ে সরকারী দল মানেই ক্ষমতার অপব্যবহার, একটি স্বাধীন দেশে তা চলতে দেয়া যায় না। করোনা ভাইরাস, সড়ক দূর্ঘটনা, দূর্নীতির মহামারীর পাশাপাশি ক্ষমতা অপব্যবহারের মহামারীতে সরকারী দল ভিন্ন সকলেই নির্বিচারে আক্রান্ত। ক্ষমতা অপব্যবহারের মহামারী থেকে বাচার জন্য গণমানুষ কোন হাসপাতালে ভর্তি হবে?

লেখক
রাজনীতিক, কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)