বিভাগ - অর্থনীতি

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কোনো দরকার নেই: কৃষিমন্ত্রী

প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃষকের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কোনো দরকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। অন্যদিকে অপরিপক্ব অবস্থায় নতুন পেঁয়াজ বিক্রি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন তিনি। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কোনো দরকার নাই। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল রয়েছে। চাল নিয়ে কারো উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। চালের বাজার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।

শুক্রবার (৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ের সেচ ভবনে কৃষকদের বাজারজাত করা সবজির হাট ‘কৃষকের বাজার’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও শনি দুদিন সকাল ৭টা থেকে বসবে এ বাজার। আজ বাজারের উদ্বোধন করেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।

‘চালের বাজার নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। চিন্তা হতে পারে যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। এখন আপনারা আমাদের সহযোগিতা করেন, কৃষক যাতে তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। খামারে যারা কৃষিকাজ করে তারা যেন সঠিক মূল্য পায়, এটিও আমাদের দেখতে হবে। এক মণ ধান করতে লাগে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। সেটা যদি ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়, কৃষকরা করবে? করবে না। এবার ৭০০ টাকা হয়েছে এটা আমাদের জন্য, বাংলার লাখ লাখ কৃষকের জন্য। তাদের ন্যায্যমূল্য দিতে হবে।

বাজারে মোটা চালের চাহিদা নেই কেন জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, মোটা চাল বিক্রি করতে পারি না আমরা। ওএমএসের গাড়ি যায়, তারা চাল বিক্রি করতে পারে না, ডিলাররা এক টনও চাল তুলছে না। কোনো গ্রাহক নাই। মোটা চাল খারাপ তো কিছু না। পুষ্টির দিক দিয়ে ভালো।

এদিকে বাজারে পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষক পর্যায়ে ছোট ছোট পেঁয়াজ উঠিয়ে ফেলায় সরকার উদ্বিগ্ন বলে জানান কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পেঁয়াজ এখনো বড় হয়নি। আরও অনেক বড় হওয়া দরকার। আমরা এটা নিয়ে শঙ্কিত আছি। সব ছোট ছোট পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছে। জানুয়ারি মাসে কী উপায় হবে? পেঁয়াজের উৎপাদন তো কমে যাবে। এবছর পেঁয়াজের দাম বেশি থাকায় আগামী বছর দেশে অনেক বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি। এতে করে পরবর্তী বছর কৃষক পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাবে কিনা তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, যখন দেশে পেঁয়াজ উত্তোলন করা হয় তখন বিদেশি পেঁয়াজের আমদানির কারণে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারে না আমাদের কৃষকরা। তাই আমরা পেঁয়াজের মৌসুমে তা আমদানি বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।

বাজার উদ্বোধন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এখানকার এই কৃষকের বাজারে যে কৃষকরা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের আমরা গত এক বছর ধরে প্রস্তুত করেছি। সম্পূর্ণরূপে কীটনাশকমুক্ত সবজি এখানে নিয়ে আসছেন তারা। স্বল্প পরিসরে হলেও এটি অব্যাহত থাকবে, এবং ভবিষ্যতে এটি বৃহৎ পরিসরে করার উদ্যোগ আমরা নেবো।

কৃষিখাতে বাংলাদেশের আরও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলে, দানা জাতীয় খাদ্যের ক্ষেত্রে আমরা এখন উদ্বৃত্ত অবস্থায় আছি। এ বছর বাংলাদেশ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের শাকসবজি, খাদ্য ও কৃষি পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। এটি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। গত অর্থবছরে কৃষিক্ষেত্রে রপ্তানির অগ্রগতি হয়েছে ৩৪ ভাগ। অন্যান্য সব সেক্টরের চেয়ে কৃষি সেক্টরে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।

ঢাকার আশপাশের মোট আটটি উপজেলা থেকে অর্গানিক বিভিন্ন সবজি নিয়ে এ বাজারে অংশগ্রহণ করেছেন কৃষকরা। প্রথমবার তাদের পরিবহন খরচ সরকার বহন করে। পরবর্তীতে কৃষকরা নিজে উদ্যোগেই এখানে সবজি নিয়ে আসবেন।

এমন উদ্যোগের প্রশংসা করছেন ক্রেতারা। কীটনাশকমুক্ত সবজির নিশ্চয়তা পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে বেসরকারি চাকরিজীবী সৈয়দ আতিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, প্রথমত ভালো লাগছে যে, এখানে সরাসরি কৃষকরা দাম পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত শাকসবজিগুলো সম্পূর্ণ কীটনাশকমুক্ত। তাই একসঙ্গে অনেক কিনে নিচ্ছি। তবে এ বাজারে বিভিন্ন পণ্যে দামের আধিক্য রয়েছে বলেও অভিযোগ কোনো কোনো ক্রেতার।

এ ব্যাপারে রাজধানীর খামারবাড়ির বাসিন্দা সরকারি চাকরিজীবী নাসিমুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, বাইরের বাজার থেকে এখানে প্রতিটি পণ্যে ১০ থেকে ১৫ টাকা দাম বেশি। যেহেতু পরিবহন খরচ নেই, সেহেতু কৃষকরা আরও কম দামে এগুলো বিক্রি করতে পারেন। এ বিষয়টি আয়োজকদের লক্ষ্য রাখা উচিত ছিল।

এদিকে এ ধরনের অভিযোগের উত্তরে সাভারের ধামরাই থেকে আগত কৃষক সিরাজুল ইসলাম মিয়া বলেন, বাজারে ফুলকপি পাওয়া যায়, আমাদের এখানেও ফুলকপি আছে। কিন্তু এই দুই ফুলকপির মধ্যে অনেক পার্থক্য। আমরা সম্পূর্ন অর্গানিক উপায়ে চাষ করি। এ ধরনের ফসলের বীজ সব জায়গায় পাওয়া যায় না। নির্ধারিত কিছু কিছু জায়গায় পাওয়া যায়, যার দাম সাধারণত বেশি। তাছাড়া আমরা কোনোরূপ কীটনাশক ব্যবহার করি না। দৈনন্দিন আবর্জনা থেকে তৈরি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করি। এক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণসহ ফসলকে পোকামাকড়মুক্ত রাখতে অনেক শ্রম ও খরচ হয়। তাই আমাদের দামটা একটু বেশি। যেমন, একটি ফুলকপির পেছনে খরচ হয় ২০ থেকে ৩০ টাকা। আমরা সেটা বিক্রি করছি ৪০ টাকায়।

বিক্রিবাটতা কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জ থেকে আগত কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বিক্রি ভালো হয়েছে। যা সবজি নিয়ে এসেছিলাম তার সবই বিক্রি হয়ে গেছে। এতো তাড়াতাড়ি সব বিক্রি হয়ে যাবে ভাবিনি। প্রতি শুক্র, শনিবার এ বাজার চলবে, আমরাও নিয়মিত এখানে সবজি নিয়ে আসব।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে কৃষকের বাজারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ছাড়াও আরও উপস্থিত ছিলেন- বিএডিসির চেয়ারম্যান মো সায়েদুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ, বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রবার্ট ড. সিমপন প্রমুখ।