বিভাগ - সারাদেশ

ঠিকাদারের কাজে বাধা দেয়ায় প্রকৌশলীকে বদলি

প্রকাশিত

মঈনুল হাসান রতন হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় রাস্তা পুনর্বাসন ও প্রশস্তকরণ কাজে চুক্তি মোতাবেক সঠিক মান বজায় না রাখায় সংশোধনের জন্য ঠিকাদারকে নোটিশ দেওয়ায় বদলি হতে হলো প্রকৌশলীকে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলীকে বদলির ঘটনাটি উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় নানা মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।মর্তুজা হাসান নামে নোটিশপ্রাপ্ত ওই ঠিকাদার আজমিরীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। অন্যদিকে জামালপুরে বদলির আদেশ পাওয়া উপজেলা প্রকৌশলী হলেন তানজির উল্লাহ সিদ্দিকী। তানজির গত বছরের ১৬ অক্টোবর আজমিরিগঞ্জে উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এলাকায় দায়িত্বশীল প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেকেন্ড রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (আরটিআইপি-২) অধীন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বানিয়াচঙ্গ-আজমিরীগঞ্জ ভায়া শিবপাশার ৪ কিলোমিটার সড়কের পুনর্বাসনের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর দরপত্র আহ্বান করলে ঠিকাদার ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মর্তুজা হাসান কাজটি পান। ৪ কোটি ৯০ লাখ ১৬ হাজার ১শ ৩৪ টাকার এই কাজটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় চলতি বছরের ২১মার্চ। আগামী বছরের ২৭ জুনের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা।ঠিকাদার মর্তুজা হাসান শিডিউল মোতাবেক কাজ করছেন না দেখতে পেয়ে উপজেলা প্রকৌশলী তানজির উল্লাহ ঠিকাদারের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ১৭ নভেম্বর প্রকল্প এলাকার ব্যবহৃত সামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে এলজিইডির ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করান। শিডিউল অনুযায়ী বালুর স্তর ২৫০ এমএম থাকার কথা সেখানে স্থানভেদে সর্বনিম্ন ২শ থেকে সর্বোচ্চ ২শ ৪০ এমএম এবং বালির দানার আকার ০.৫০ এফএম স্থলে ০.৩০ এফএম দিয়ে কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় ধরা পড়ে। এছাড়া সাব বেইজ লেয়ারে বালু ও কংক্রিটের অনুপাত ৫০:৫০ হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ল্যাবরেটরির রিপোর্টে এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২৭:৭৩ এবং সর্বোচ্চ ৩৮:৬২ পাওয়া যায়।১৮ নভেম্বর হবিগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল বাছির ঠিকাদার মর্তুজা হাসানকে এ সমস্ত কাজ সংশোধন ও উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা ও স্পেসিফিকেশন মোতাবেক কাজ করার অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি দেন। অন্যথায় চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।এ ছাড়া তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা আরও সাড়ে ১৪ কোটি টাকার কাজ নির্দিষ্ট সময় পার হলেও তা শেষ করতে পারেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।বদলির পেছনে ঠিকাদার মর্তুজা হাসানকে দায়ী করে প্রকৌশলী তানজির উল্লাহ বলেন, ‘নানা কারণে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১শ ভাগ কাজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আদায় করা কঠিন। তারপরেও চেষ্টা করি ৯৫ ভাগ কাজ সঠিক হোক। সে লক্ষ্যেই কাজের মানের প্রতি আমার আলাদা নজর ছিল। উপজেলা চেয়ারম্যান আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপজেলা পরিষদের উন্নয়নকাজে অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘মূলত তার দুই নম্বরী কাজে বাধা দেওয়ায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম’।

হবিগঞ্জের স্থানীয় সরকার নির্বাহী প্রকৌশলী অফিস সূত্র জানায়, জাইকার অর্থায়নে হিমলিপ (হাওর ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট লাইভলিহুড ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট) প্রকল্পের আওতায় আজমিরীগঞ্জ-পাহাড়পুর সড়ক উন্নয়নে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার আরও দুটি প্রকল্পে কাজ পেয়েছে মর্তুজা হাসানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাহিল-মর্তুজা (জেবি)। গত বছরের ১২ মার্চ কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময়সীমা পার হলেও কাজ চলছে ধীর গতিতে। প্রকল্পে কংক্রিটের ঢালাই ৭ কিলোমিটার ডুবন্ত (সাবমারজিবল) রাস্তা ও ১১টি কালভার্ট রয়েছে।উল্লেখিত দুটো কাজ যথাক্রমে এ বছরের ১৮ মার্চ ও ২১ জুলাই শেষ হওয়ার কথা ছিল। সূত্র জানায়, শিডিউলে ৪ প্যারা (৫ সিএফটি) কংক্রিটের সঙ্গে ১ বস্তা সিমেন্ট ও আড়াই সিএফটি বালু মিশ্রণ করে ঢালাই করার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদার মর্তুজা হাসান ৯ প্যারা (সোয়া ১১ সিএফটি) ইটের কংক্রিট ব্যবহার করছেন দেখে উপজেলা প্রকৌশলী এতে বাধা দেন।এমতাবস্থায় ঠিকাদার রাস্তা ও কালভার্টের কাজ ফেলে রাখায় জনদুর্ভোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাকে কাজ শেষ করার তাগিদ দেওয়া হলেও তিনি কর্ণপাত করছেন না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধিরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।সূত্র আরও জানায়, ঠিকাদার ও উপজেলা চেয়ারম্যান মর্তুজা হাসান তার কাজে যাতে আর কোন বাধা না আসে সে জন্য তার পছন্দের সহকারী প্রকৌশলী শামসুল হক ভূঁইয়াকে বড়লেখা থেকে আজমিরীগঞ্জ ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ হিসেবে বদলি করে আনিয়েছেন। সদ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া শামসুল হক এর আগে আজমিরীগঞ্জের পাশ^বর্তী শাল্লা উপজেলায় কর্মরত ছিলেন।যোগাযোগ করা হলে উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মর্তুজা হাসান বলেন, উপজেলা প্রকৌশলী কেমন লোক তা জানতে হলে অন্য কোন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তার কারণে কোন কাজ বাস্তবায়ন করা যায় নাকাজ যেনতেনভাবে করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার কাজের ত্রুটি নেই। আজ পর্যন্ত কোন চিঠি দেয়া হয়নি। নির্বাহী প্রকৌশলী গত ১৮ নভেম্বরের ১৮২৯ নম্বর স্মারকে দেয়া কাজে ত্রুটি সম্পর্কে চিঠির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেন, বানিয়াচঙ্গ-আজমিরীগঞ্জ সড়কের কাজটি চলমান। কোন ত্রুটি হলে সংশোধন করার সুযোগ আছে।উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাইমা খন্দকার বলেন, পক্ষাঘাত হওয়ায় অনেক সময় তড়িৎ কাজ করতে অসুবিধা হলেও উপজেলা প্রকৌশলী তানজির একজন খুবই দায়িত্বশীল মানুষ।