বিভাগ - সারাদেশ

ডিজিটাল যুগেও কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীসহ নারী-পুরুষের রশি টেনে নৌকায় পারাপার

প্রকাশিত

রাসেল কবির মুরাদ , কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি ঃ কলাপাড়ায় চম্পাপুর ও ধানখালী দুইটি ইউনিয়নে যোগাযোগের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সেতুর অভাব ও চম্পাপুর ও ধানখালী দুইটি ইউনিয়নের দেবপুর-পাঁচজুনিয়া গ্রামসংলগ্ন খালে সেতুর অভাবে পাঁচ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পায়রাবন্দর ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের শতশত শ্রমিক, শিশু শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ ও এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে বছরের পর বছর রশিটানা নৌকায় পারাপার হতে হয়। এপারে পশ্চিম পাঁচজুনিয়া, ওপারে পুর্ব দেবপুর। দু‘পারের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ‘দেবপুর’ নামক একটি খাল। আর সেই খাল পারাপারের একমাত্র ভরসা ছোট্ট ডিঙি নৌকা। কিন্তু নৌকার নির্ধারিত কোন মাঝি নেই, রশি টেনে পারাপার হতে হয়। ্এরফলে শিশুদের জীবনের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ পাঁচজুনিয়ায় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় শিশু শিক্ষার্থীদের খাল পেড়িয়ে বিদ্যার্জনে জন্য যেতে হয় দক্ষিন দেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাই ছাত্র ছাত্রীদের জীবন বাজি রেখে নৌকায় পারাপার হতে হয় এবং রশি টানতে গিয়ে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। মাঝিবিহীন আটজন চলাচল উপযোগী এ নৌকার দুই প্রান্তে বাঁধা দুটি রশি ঐ রশি টেনেই এপার-ওপার পারাপার হতে হচ্ছে যাত্রীদের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চম্পাপুর ইউনিয়নের খালের একপাড়ে রয়েছে চম্পাপুর ইউনিয়নের সোমবাড়িয়া বাজার। এ বাজারকে কেন্দ্র করে এপারে গড়ে উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদ, হাসপাতাল, পোস্ট অফিস, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বেশ কয়েকটি অফিস, প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ মাদ্রাসা। শতশত শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এ খেয়া পার হয়েই তাদের প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।

ধানখালী ইউনিয়নের চার হাজার মানুষ বিভক্ত হয়ে আছে দেবপুর খাল দ্বারা। গ্রামের মানুষদের যাতায়াত সুবিধার জন্য স্থানীয়রা নিজস্ব অর্থায়নে দেরপুর খালে চালু করেন খেয়া নৌকা। মাঝিবিহীন এ নৌকার সংস্কার কাজও করে থাকেন নিজেদের চাঁদার টাকায়।

বর্ষা মৌসুমে অথৈ পানিতে খালটি থৈ-থৈ করলেও শুকনো মৌসুমে হাঁটু পানিতে কচুরিপানায় পূর্ণ হয়ে যায় খালটি। এ সময় খেয়া চলাচল হয়ে পড়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তখন কলেজ বাজার হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হয় এলাকাবাসীদেরকে। দীর্ঘদিন একটি সেতুর অভাবে তিন ফসলি জমির এলাকা দেবপুর, নিশানবাড়ীয়া, চালতাবুনিয়া, ধানখালী, ছৈলাবুনিয়া, পাঁচজুনিয়া গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে ভোগান্তিসহ অতিরিক্ত পরিবহন খরচ বহন করতে হয়। ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজসহ চিকিৎসা নিতে ঝুঁকিপূর্ণ এ খেয়া পার হতে হয়। এতে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় বৃদ্ধা ও গর্ভবতী মায়েদের।

এমন পরিস্থিতিতে ওই খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণের দীর্ঘদিনের দাবি শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর। একটি সেতুই পারবে, শিক্ষার্থীদের জীবন বাজির ঝুঁকিমুক্ত করতে। নৌকায় রশি টেনে পারাপারে ঝুঁকি থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয় আসা-যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। অভিভাবকরা আতঙ্কের কারণে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। দক্ষিন দেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী তানজিলা আক্তার বলে, অনেক সময় রশি টানতে যাইয়া খালে পইরা যাই। বই-পুস্তক ভিজে যায়, রশিতে পেচিয়ে পরি।

স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানায়, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় দু’পাড়ের মানুষ নৌকায় পারাপার হয়। এলাকাবাসীর উদ্যোগে দেবপুর খালে পারাপারের জন্য একটি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। তবে নৌকা চালানোর জন্য নির্ধারিত কোন মাঝি নেই। দু’পাড়ে নৌকার সঙ্গে বাঁধা রশি টেনে আসা-যাওয়া করে স্কুল শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে খালের পশ্চির্মাংশের পাঁচজুনিয়া এলাকায় কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেক বেশি। যা শুধু শিক্ষার্থী নয়, দুর্ভোগ পুরো এলাকাবাসীর।

স্থানীয়রা বলেছেন, নির্বাচন এলেই প্রার্থী ও নেতারা এই খালে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর আর তাদের মনে থাকে না। সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে দ’ুবছর আগে সোমবাড়িয়া বাজার থেকে খেয়াঘাট পর্যন্ত ইটের রাস্তা এবং পাকা ঘাট নির্মাণ করেন এলজিএসপি’র সংস্থা।

দক্ষিন দেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসা. মেহেরুন্নেছা বলেন, দক্ষিন দেবপুর থেকে শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আমাদের স্কুলে প্রতিদিন নিয়মিত ক্লাশ করে। নৌকায় পারাপারে ঝুঁকি থাকায় অনেকে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারেনা। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে খালটিতে একটি সেতু নির্মাণ করা জরুরী প্রয়োজন।

চম্পাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রিন্টু তালুকদার বলেন, পাঁচজুনিয়া ও দেবপুর দুই গ্রামের মাঝখানে এই নদী এখানে একটি ব্রিজ হলে স্কুলÑকলেজ ছাত্রÑছাত্রী ও লোকজনের চলাচলের অনেক সুবিধা হতো। এ বছর জানুয়ারী মাসে ইউনিয়ন পরিষদের করের টাকা দিয়ে একটি বাঁশের সাঁকোর ব্যবস্থা করা হবে।

কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এস,এম, রাকিবুল আহসান বলেন, ছোট ছোট কালর্ভাট করে দেয়ার সামর্থ উপজেলা পরিষদের আছে। কিন্তু একটি গার্ডার সেতু নির্মাণের মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা উপজেলা পরিষদের নেই।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তরের এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবদুল মান্নান বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী দেবপুর খালের ওপর একটি সেতুর নির্মাণের প্রয়োজন। এজন্য স্কুল-কলেজের ছাত্রÑছাত্রী ও এলাকার লোকজনের চলাচলের সুবিধার জন্য ওই জায়গায় একটি ব্রিজের তালিকা ইতিমধ্যে মন্ত্রনালয় পাঠানো হয়েছে।