দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ৮ বছর, ৭১ বারেও ফিরে গেল তদন্ত প্রতিবেদন

প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: সোমবার ১০ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার প্রতিবেদন জমা পড়লো না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় আদালত নতুন তারিখ দিলেন আগামী ২৩ মার্চ। এ নিয়ে এই দম্পতির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়ে গেল ৭১ বার।

৮ বছর আগে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিজের শোবার ঘরে খুন হয়েছিলেন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। মৃত্যুর পরপরই কারণ অনুসন্ধান করে খুনিদের শাস্তি দিতে সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সময় নিয়েছিলেন ৪৮ ঘণ্টা। কিন্তু আজও সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখেনি কেউ। পরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একইভাবে আশ্বাস দিয়ে গেছেন। এইভাবেই কেটে গেল ৮ বছর।

মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম গত ৮ বছরে ৫ বার হাত বদল হয়েছে। এরপর মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের সরকারি পরিচালক শফিকুল ইসলাম প্রতিবেদন জমা দিতে আদালতের কাছ থেকে দফায় দফায় সময়ও নিয়েছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও প্রতিবেদন আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারলো না।

মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের সহকারি পরিচালক শফিকুল ইসলামের কাছে। তিনি বলেন, মামলাটির তদন্ত প্রায় শেষের দিকে। আশা করছি, খুব শিগগিরই মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করতে পারবো।

মামলার বিষয়ে সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনি বলেন, আমি এখনো বিচারের আশা ছাড়ি নি। যদি ইহকালে বিচার না হয় তাহলে অবশ্যই পরকালে বিচার হবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে মামলাটির বিচার হওয়া সম্ভব। ৩০ বছর পর যদি সগীরা হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল হয়, তাহলে এ মামলারও হতে পারে। কি ঘটেছিল সেদিন তা সবার কাছেই পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রী যদি চান তাহলে শিগগিরই কোনো আদেশ দিলেই তদন্ত সংস্থা দ্রুত তাদের শেষ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এ মামলায় যেসব আসামিদের ধরা হয়েছে তারা সাগর রুনি হত্যার সঙ্গে জড়িত নয়। প্রকৃত আসামিদের আড়াল করে রাখা হচ্ছে। তবে কি কারণে প্রকৃত আসামিদের আড়াল কসেই বিষয়টি আমার জানা নেই। মামলা সম্পর্কে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সাগর রুনি হত্যা মামলা সম্পর্কে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আব্দুল্লাহ আবু বলেন, এটা দুঃখজনক বিষয় যে এতদিনেও প্রতিবেদন আদালতে জমা হলো না। তদন্তে দেরি হলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়। আশা করি দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেবেন। মামলাটির চার্জশিট আশা মাত্র দ্রুত বিচারের জন্য যা যা করা দরকার রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তা করা হবে।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি নিজের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওইদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থলে এসে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করার কথা বলেছিলেন।

২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটি তদন্তের জন্য প্রথমে ডিবি উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলম দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, ওই বছরের ৭ জুন, ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর ও সর্বশেষ ২০১৭ বছরের ২১ মার্চ তদন্তে অগ্রগতি হচ্ছে বলে আদালতের কাছে সময় চাওয়া হয়। যদিও এসব অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিটি প্রতিবেদনে প্রায় একই ধরনের তথ্য ছিল। এভাবেই একের পর এক সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা মঞ্জুর করেন আদালত।

মামলার ৮ আসামির দুই জন বাড়ির দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল ও কথিত বন্ধু তানভীর রহমান জামিনে আছেন। অপর ছয় আসামি মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু, বকুল মিয়া, কামরুল হাসান অরুন, রফিকুল ইসলাম, এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির ও আবু সাঈদ কারাগারে আটক আছেন। আসামিদের মধ্যে তানভীর জামিনে আছেন। এ মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার ৮ জনের কেউই এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেনি।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল হক ও পলাশ রুদ্র পাল ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দেয়। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মো. সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ ও নিহত দম্পতির বন্ধু তানভীর রহমানসহ ৫ জন মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণচন্দ্র হত্যার ঘটনায় র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। এ পর্যন্ত এ মামলার তদন্তে ১৫৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব।

error0