নতুন সড়ক আইন: বিভিন্ন জেলায় অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘটে দুর্ভোগ

প্রকাশিত

ফাইল ছবি

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: বিভিন্ন অপরাধে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের বিরোধিতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো এবং রাজশাহী ও শেরপুরে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে পরিবহন শ্রমিকরা।

সোমবার সকাল থেকে তাদের আকস্মিক এই কর্মসূচির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা। অনেকেই বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ফিরে গেছেন বাস না পেয়ে। কেউ কেউ বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

যশোর-বেনাপোল ও যশোর-সাতক্ষীরার অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো যাত্রীবাহী বাস চলাচল না করলেও ঢাকা-কলকাতা ও বেনাপোল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গত বছর ঢাকায় বাসচাপায় দুই ছাত্রছাত্রীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংসদে পাস হয়। তবে তা এ বছর ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়।

বেপরোয়া মোটরযানের কবলে পড়ে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এ আইনে, যা আগের তুলনায় বেশি। আইনটি প্রণয়নের পর থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র
খুলনা বিভাগীয় শ্রমিক ফেডারশনের যুগ্ম সম্পাদক মোর্তজা হোসেন বলেন, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরা সকাল থেকে ‘স্বেচ্ছায়’ কর্মবিরতি করছেন। “শ্রমিকরা কাউকে ইচ্ছা করে হত্যা করে না। অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার জন্য নতুন সড়ক আইনে তাদেরকে ঘাতক বলা হচ্ছে। তাদের জন্য এমন আইন করা হয়েছে যা সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

“নতুন আইনের অনেক ধারার ব্যাপারে শ্রমিকদের আপত্তি রয়েছে। সরকার সমাধানের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন।” আইন সংশোধনের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মবিরতি চলবে বলে জানান মোর্তজা।

যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, ১৪ নভেম্বর যশোরে এক সমাবেশ থেকে ২০১৮ সালের সড়ক আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছিলেন তারা। এরপর রোববার থেকে যশোরের ১৮ রুটের শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে সোমবার সকালে অন্যান্য জেলাতেও কর্মবিরতি শুরু হয়।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্রী আফসোনা আফরিন পাঁপড়ি কলেজে যাওয়ার জন্য সোমবার সকালে বেনাপোল বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস পাননি। তিনি বলেন, “আমি অসুস্থ, তারপরেও জরুরি কাজে কলেজে যেতে হবে। কিন্তু এখন বাসই বন্ধ, যেতে পারছি না।”

যশোর-বেনাপোল ও যশোর-সাতক্ষীরার অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো যাত্রীবাহী বাস চলাচল না করলেও ঢাকা-কলকাতা ও বেনাপোল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে বলে ‘ঈগল পরিবহনের’ বেনাপোল অফিসের ব্যবস্থাপক এম আর রহমান জানান।এছাড়া প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক, মাহেন্দ্র, নসিমন-করিমন জাতীয় ছোট যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

তবে ঝিনাইদহে ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার চালকরাও কর্মবিরতি পালন করছেন। সকাল থেকে ঝিনাইদহ-যশোর, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ -মাগুরা, ঝিনাইদহ- চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ হাটফাজিলপুর ও ঝিনাইদহ–হরিণাকুণ্ডু রুটে বাস চলাচল বন্ধ।

বাস না পেয়ে অনেকে ইজিবাইক ও মহাসড়কে চলাচলে নিষিদ্ধ তিন চাকার যানবাহনে চলাচল করছেন। স্থানীয় সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও ঢাকাসহ দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহন চলাচল করতে দেখা গেছে।

গাড়াগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে কামাল হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, জরুরি কাজে তার খুলনা যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস বন্ধ থাকায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন তিনি। ঝিনাইদহ বাস, মিনিবাস ও মাইক্রো শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান খোকন বলেন, যান চলাচল ঠেকাতে সড়কে কোনো ব্যারিকেড দেননি তারা। শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় কাজ বন্ধ রেখেছে।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মো. হামানুজ্জামান বলেন, “শ্রমিকদের অঘোষিত কর্মবিরতিতে লোকাল রুটগুলোতে বাস, মিনিবাস চলছে না। তবে দূরপাল্লার রুটে যানবাহন চলাচল করছে।”চুয়াডাঙ্গায় সকাল থেকেই অভ্যন্তরীণ রুটের বাস চলাচল বন্ধ। সকাল ১০টার পর ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা রুটের বাসও বন্ধ হয়ে যায়।

কুষ্টিয়া থেকে খুলনা, মেহেরপুর ও উত্তরবঙ্গের জেলাগলোতে চলাচলকারী সকল যাত্রী পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠন।

তবে ঢাকাগামীসহ উত্তরবঙ্গ চলাচলকারী দূরপাল্লার পরিবহনগুলো যথারীতি চলাচল করছে বলে নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি আজগর আলী।

আঞ্চলিক সড়কে চলাচলকারী যেসব গাড়ি শ্রমিকরা বন্ধ করেছে সেসবের কাগজপত্রে ত্রুটি থাকায় হয়রানি ও শাস্তির ভয়ে তারা চলাচল বন্ধ রেখেছেন বলে এই নেতা মন্তব্য করেন। মাগুরা-যশোর সড়কে সোমবার সকাল থেকে বাসচলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে এ সড়কে যাতায়াতকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিকল্প হিসেবে ইজিবাইক, টেম্পু ও অটোরিকশায় যাতায়াত করতে হচ্ছে।

জেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ইমদাদুর রহমান বলেন, নতুন আইনের বিরোধিতায় সরধারণ শ্রমিকরা এ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। এ আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের আশ্বাস না পেলে শ্রমিকরা ধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ধর্মঘটের ফলে যাত্রীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। বিশেষ করে চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীরা বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।

কলেজ ছাত্র ইমন মিয়া ও চাকরিজীবী আকরাম হোসেন বলেন, তাদের প্রতিদিন যশোর-মাগুরা যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু মাগুরা থেকে যশোরের বাস ভাড়া ৬০ টাকা হলেও এখন এক থেকে দেড়শ টাকা দিয়ে ইজিবাইক, টেম্পু ও সিএনজিতে করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। মাগুরা ভায়না বাস কাউন্টারের নবাব আলী বলেন, মালিক পক্ষ নয়, শ্রমিকেরা তাদের বিরুদ্ধে নতুন আইন করায় এ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের চিত্র
সোমবার সকাল থেকে রাজশাহীর সঙ্গে বিভিন্ন রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। ফলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে সকালে ঢাকাগামী বেশ কয়েকটি বাস রাজশাহী থেকে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে।

সকালে রাজশাহীর নগরীর শিরোইল ও নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল এবং ভদ্রা মোড়ে অবস্থান নিয়ে মোটর শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। এ সময় দু-একটি বাস ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তা আটকে দিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এ সময় তারা নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রত্যাহারের দাবি জানান।

এদিকে, রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতা এভাবে হঠাৎ বাস বন্ধের বিরোধিতা করেছেন। রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে সমর্থন করি না। প্রতিবাদ জানানোর আরও ভাষা আছে। এভাবে বাস বন্ধ করে যাত্রীদের দুর্ভোগে ফেলা আমি সমর্থন করি না।”

শেরপুরের চিত্র
কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই সোমবার সকালে শেরপুর থেকে ঢাকাসহ সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন মোটর শ্রমিকরা। সোমবার দুপুরে শেরপুর জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার ঘোষ এবং শেরপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান বলেন, সকাল ৮টা পর্যন্ত বাস চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও বাস চালক-শ্রমিকরা নতুন পরিবহন আইনের ভয়ে স্বেচ্ছায় ঢাকাসহ সব রুটে বাস চালানো বন্ধ করে দিয়েছে।

বাস বন্ধ রাখার ব্যাপারে সংগঠনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে এই শ্রমিক নেতারা জানান, বিক্ষিপ্তভাবে কোনো কোনো রুটে দু-একটি বাস চলছে।