বিভাগ - বিনোদন

নব্বই দশকের অভিনেত্রী দিবা নার্গিস কি অভিনয় ছেড়েই দিলেন?

প্রকাশিত

বিনোদন ডেস্ক: নব্বই দশকের শুরুর দিকে টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন দিবা নার্গিস। ‘পাথরসময়’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে দারুণ সাড়া পেয়েছিলেন। অভিনয় করেছিলেন গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবিতেও। এ দেশের প্রথম ডেইলি সোপ ‘জোয়ারভাটা’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘শোধ’, ‘বাবা’ ইত্যাদি নাটকে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল। তাঁর বাবা প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল–মামুনের প্রতিষ্ঠিত থিয়েটার স্কুলে পড়েছেন দিবা নার্গিস। নাট্যদল ‘থিয়েটার’–এর নাটকে অভিনয় করেছেন। মঞ্চ থেকে শিখে টিভিতে গিয়েছেন। পেয়েছেন দর্শকপ্রিয়তা।

থিয়েটার ছেড়েছেন বহু বছর আগে। টিভি না ছাড়লেও অনিয়মিত। এতটাই অনিয়মিত যে দর্শকেরা প্রায়ই তাঁকে প্রশ্ন করেন, তিনি অভিনয় ছাড়লেন কেন! শমী, বিপাশা, মিমিদের মুখ পর্দায় কদাচিৎ ভেসে উঠলেও দিবা কেন ডুব মেরে আছেন? এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা যোগাযোগ করি একসময়ের প্রিয় মুখের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘আমার শুরুটা হয়েছিল অভিনয় দিয়ে। সেই অভিনয়টাই বলতে গেলে করা হয় না। গত কয়েক বছরে বিজ্ঞাপনের কিছু কাজ আমি করেছি। নিয়মিত উপস্থাপনা করেছি। বিটিভিতে একটা অনুষ্ঠান করতাম। মাছরাঙা টিভিতে ১৮-১৯ সাল জুড়ে একটা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছি।’

দিবা জানান, ‘১১ সালের দিকে বিটিভিতে শেষ নাটক করেছেন। সেটাও অসমাপ্ত, প্রচারিত হয়নি। মাঝখানে টুকটাক নাটক করেছেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেন, সেগুলো তেমন আলোচনায় আসেনি। শেষ দশ বছরে করা তাঁর কাজের কথা তাঁরই ঠিকঠাক মনে নেই। যে জন্য দর্শকদের তিনি দোষারোপ করেন না। নাটক থেকে দূরে যাওয়ার কারণ উঠে আসে দিবার কণ্ঠে, ‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড। এ তো সত্যি কথা! নিজের জীবন দিয়ে আমি জেনেছি। মানুষকে প্রতিনিয়ত পর্দায় হাজির হয়ে মনে করিয়ে দিতে হয় যে আমি কিন্তু আছি। সব সময় এখন যোগাযোগ রাখতে হয়। যোগাযোগের পৃথিবী হয়ে গেছে শোবিজটা।’

দিবা জানান, শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগটা হয়ে গেছে শিল্পী সংঘকেন্দ্রিক। নির্বাচনের সময় শিল্পীরা তাঁর খোঁজখবর নেন। ‘বাবার সঙ্গে যাঁরা কাজ করতেন, বাবাকে ভাই ডাকতেন, আমরাও পরবর্তীকালে যাঁদেরকে “ভাই” ডাকতাম, তাঁদেরও আমাকে প্রয়োজন হয় না। এটা আমি ক্ষোভ থেকে বলছি না, এটাই বাস্তবতা’, বলেন দিবা। দিবা অবাক হন যে নাটকের প্রস্তাব না এলেও কীভাবে যেন বিজ্ঞাপনের লোকদের মাথায় তিনি রয়ে গেছেন। দিবা বলেন, ‘আমার কাছে নিয়মিত বিজ্ঞাপনের অফার আসে। গত এক সপ্তাহে চারটা বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব পেয়েছি। করোনার কারণে আমি রাজি হইনি। কিছুটা অসুস্থও ছিলাম। যে জন্য আর কাজগুলো করা হয়নি।’

দিবা জানান, অভিনয় থেকে তিনি কখনোই বিরতি নেননি। ‘চরিত্র যদি ভালো হয়, পার্শ্বচরিত্র হলেও আমি করব। নায়িকাই করব শুধু এমন চিন্তা ছিল না কখনো।’ দর্শকেরা যে তাঁকে এখনো মনে রেখেছেন, এটা তাঁর অভিজ্ঞতায় আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রায়ই মহিলা দর্শকেরা এসে আমাকে বলেন, আপা, আপনি কেন কাজ করেন না? সেটা আমার কাছে ভালো। মাছরাঙায় যখন উপস্থাপনা করতাম, বলতাম যে আপনারা এই অনুষ্ঠানটা দেখতে পারেন। তখন তাঁরা ঠিকই দেখতেন।’

অভিনয়ে ব্যস্ততার মধ্যেই ১৯৯১ সালে বিয়ে করেন দিবা নার্গিস। তাঁর স্বামী সৈয়দ একরামুল্লাহ ব্যবসায়ী। তিনি আবদুল্লাহ আল–মামুন পরিচালিত ‘দুই জীবন’ ছবির প্রযোজক ছিলেন। তাঁদের সংসারে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে নদী অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে থাকেন। ছোট মেয়ে অর্পা স্কলাসটিকা স্কুলে এ লেভেল পড়ছে। অভিনয় একসময় দিবা নার্গিসের একমাত্র পেশা ছিল। ১৭ বছর ধরে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি চাকরি করছেন। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতা পেশায় আছেন। বেশির ভাগ সময় তিনি শিক্ষকতাই করেছেন। তাঁদের আত্মীয়–পরিজনের মধ্যে অনেকেই শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত। দিবা নার্গিসরা তিন বোন, এক ভাই। ভাই থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। বোনেরা সবাই দেশেই আছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই একসময় অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখন শুধু দিবার সঙ্গেই অভিনয়ের সূত্রটা রয়ে গেছে।

তখনকার সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের তুলনা দিতে গিয়ে দিবা নার্গিস বলেন, ‘আগে আমার সময়ের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে একটা দূরত্ব ছিল। শুধু থিয়েটারে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বটা আটকে থাকত। এখন দেখি ফেসবুকে ব্যক্তিগত যোগাযোগটা খুব প্রবল। সবাই গ্রুপ গ্রুপ করে যোগাযোগটা রাখছেন। এটা আমার ভালো লাগে। যদিও আমি নিজে এই যোগাযেগের বাইরে। প্রচণ্ড একটা ব্যবধান হয়ে গেছে।’

কাজের পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে দিবা বলেন, ‘তখন প্রডাকশনের সবার সঙ্গে সিনিয়র শিল্পীদের একটা ব্যক্তিগত হৃদ্যতা ছিল। পরিবেশটা ছিল সেই অর্থে পারিবারিক। পেশাদারত্ব কম ছিল। এখন পেশাদারত্ব বেড়েছে। দুই শিফট কাজ করলে দুই শিফটের টাকাটা বুঝে নিচ্ছি। কিন্তু পরিবেশটা কি ঠিক থাকছে? আমি এক জায়গায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নির্মাতা সেটের মধ্যে গালাগাল করছেন। তিনি আমার বাবার সমসাময়িক একজন নির্মাতার ছেলে। অথচ বাবা কখনো সেটে মুখ খারাপ করেননি। আবার উল্টো পরিবেশও পেয়েছি। যেখানে আমাকে যথেষ্ট সম্মান করা হয়েছে। যে পরিবেশটা হলে কাজ করতে অস্বস্তিবোধ থাকে না।’

আজকাল স্বজন পোষণের কথা খুব শোনা যাচ্ছে। আবদুল্লাহ আল–মামুনের মেয়ে দিবা নার্গিস। তিনি কখনো লোকের কথা শুনেছেন কি? দিবা বলেন, ‘তখন মানুষের মনে এত জটিলতা ছিল না; বরং মানুষ চাইতেন সিনিয়র অভিনয়শিল্পীর ছেলে-মেয়েরা অভিনয়ে আসুক। তারা কেমন করে দেখি। আজকের মতো এত কথা তখন হতো না। শমী, বিপাশা আর আমি ছাড়া সবাই তো বাইরে থেকে এসেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নেপোটিজমের কথা তখন বলতে শোনাই যেত না।’