বিভাগ - অপরাজিতা

ফারহানা কানন লাকীর নকশি কাঁথা ও নকশি পণ্যের ভালোবাসার গল্প

প্রকাশিত

ফারহানা কানন লাকী ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন. তারপর একটি স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানির কোয়ালিটি কন্ট্রোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন. সময়ের প্রয়োজনে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে স্বামী-সন্তানসহ পাড়ি জমান দক্ষিণ কোরিয়ায় । দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘ প্রবাস জীবনে কোরিয়ানদের একটি জিনিস তার মনকে মারাত্মকভাবে আলোড়িত করে। সেটা হলো কোরিয়ানদের নিজেদের পণ্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

ফারহানা কানন লাকী বলেন, ঘরের বাসন মাজুনি থেকে শুরু করে ঘর সাজানো সরঞ্জামাদি কোরিয়ানরা নিজেরাই তৈরি করেন। কোথাও বেড়াতে গেলে তারা নিজেদের হাতে তৈরি জিনিস উপহার হিসাবে সাথে করে নিয়ে যান। নিজেদের দেশের পণ্য – নিজেদের তৈরি পণ্য ব্যবহার করা কে তাঁরা সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন , গর্ব বোধ করেন । অথচ আমরা বিদেশি পণ্য ব্যবহার করা কে নিজেদের আভিজাত্য মনে করি । আমাদের দেশীয় পণ্য গুলো গুনে মানে বিদেশি পণ্যের চেয়ে অনেক বেশি অভিজাত এবং গুণগত মান সম্পন্ন । যত বেশি বিদেশিদের নিজেদের পণ্যের প্রতি ভালোবাসা দেখেছি ততই আমাদের মানসিক দৈন্যতা আমার কাছে প্রকট হয়ে উঠেছে । কোরিয়াতে বসেই ভেবেছি কিভাবে নিজের দেশকে – দেশের পণ্যগুলোকে বিশ্ব ব্যাপী তুলে ধরা যায় । স্টাডি করতে থাকি আমাদের ঐতিহ্য প্রকাশ পায় আবার দৃষ্টিনন্দন এমন কি কি আছে তাই নিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রথম সারির একটি দেশে বসবাস করবার সুবর্ণ সুযোগের হাতছানি পেছনে ফেলে নিজের দেশে ফিরে আসলাম। ডুবে গেলাম নকশিকাঁথা ও নকশি পণ্যের ভালোবাসায়।

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মহিলারা তাদের অবসর সময়ে সুচ আর রঙিন সুতা দিয়ে যে ভালোবাসার কাব্য রচনা করে সেটি হচ্ছে নকশীকাঁথা। প্রতিটি নকশিকাঁথা একেকটা জীবনের গল্প। বর্ষায় যখন বাইরের কাজ কম থাকে কিংবা অলস দুপুরে তাদের পান সুপারির সঙ্গী হয় সুচ আর নানান রঙের সুতা । গল্পগুলো সুইসুতোর আচড়ে ফুটে উঠে তার নিজস্ব অবয়ব নিয়ে. এই গল্প আমাদের অভ্যন্তরে যে সুপ্ত মন আছে তার গল্প । যা কেবল মানুষ ভেবে যায় কিন্তু মুখে কখনোই বলা হয় না । কিন্তু সুযোগ পেলেই দক্ষ শিল্পী হয়ে উঠে সেই ভাবুক মন আর নকশীর ক্যানভাস ভরে তুলেন একটি পুরো গল্পে।

বাংলাদেশের এই নকশী শিল্পীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। এমনকি নকশীকাঁথার ভৌগোলিক স্বীকৃতি ও নেই আমাদের , দিতে পারিনি আমরা. পাশবর্তী দেশ ভারত ২০০৮ সালে নকশিকাঁথাকে নিজেদের পণ্য হিসাবে ভৌগলিক স্বীকৃতি নিয়ে নিয়েছে । তারপরেও আমাদের দেশের নকশি শিল্পীরা একদম নিজেদের মতো করে মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করে আশ্চর্য সব নকশি কাঁথা। এই নকশী কাঁথা নিয়ে আছে অনেক সাহিত্য। পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের “নকশী কাঁথার মাঠ” তার মধ্যে অন্যতম । আমরা অনেকেই জানিনা মূল গল্পটা কি. পুলিশের ভয়ে ফেরারি রুপাইয়ের বিরহে প্রিয়তমা স্ত্রী সাজু নকশিকাঁথা বুনতে শুরু করে. সুইয়ের আচড়ে ফুটিয়ে তুলে তার ব্যাথিত মনের কথা আর রুপাই এর প্রতি তার ভালোবাসার গভীরতা . গ্রাম বাংলার প্রায় অনেক জায়গায় অতি প্রাচীন কাল থেকে এমন নকশি বুননের কাজ হয়ে আসছে. আর বাণিজ্যিক হিসাব করলে, দেশে তো বটেই বিদেশের মাটিতেও এই সব নকশী কাঁথার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে । এখনো সৌখিন লোকেরা নিজেদের ঘর সাজানোর পাশাপাশি বিদেশী কাউকে উপহার হিসেবে নকশি পণ্য দিয়ে থাকে। তবু সরকারি বা বেসরকারি ভাবে এই শিল্পের কারিগরদের প্রতি সঠিক নজর পড়েনি বলে একটা ধ্বংস প্রায় শিল্পে পরিণত হতে চলেছে. তাই এই দেশীয় শিল্পকে বিলুপ্ত হবার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি বা ব্যাক্তি উদ্যোগ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে এদের কাজের উপযুক্ত সম্মান নিশ্চিত করা ।

নকশিকাঁথা শিল্পীদের সময় এবং শ্রম এর পাশে এর মূল্য অতি সামান্য। একেকটি নকশী কাঁথা দেখলে মনে হয় তাদের হাতে যেন জাদু আছে। আমাদের অবহেলিত এই জাদুকরদের জাদুর ছোয়া গুলোর দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জন্যই কাজ করবে Farhana’s Dream। ভালো থাকুক দেশ ভালো থাকুক আমাদের নিজস্ব পণ্য এটাই এই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন.

Farhana’s Dream এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২৫ শে জানুয়ারি ২০২০। ধানমন্ডি ২৭ এর women voluntery Association এ কেক কেটে উদ্বোধন করেন e Cab এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাজিব আহমেদ ।