বিভাগ - ধর্ম

বদকারদের মৃত্যুকালীন অবস্থা

প্রকাশিত

মুফতি মুহাম্মাদ আকতার আল-হুসাইন

মৃত্যু একটি চিরন্তন সত্য। তাঁর স্বাদ সকলকেই নিতে হবে। এর স্বাদ কারো জন্য হবে সুখের আবার কারো জন্য হবে কষ্টের। আর এসব নির্ভর করে প্রত্যেকের নিজ আমলের উপর। যারা নেককার বান্দা তাদের মৃত্যু যেমন আরামে হয় ঠিক তার উল্টো তথা বদকার বান্দাদের মৃত্যুর সময় বড় কষ্ট হয়। সেই কষ্ট কেমন হতে পারে কুরআন হাদিসের আলোকে খুব সংক্ষেপে আমরা জানব ইনশা আল্লাহ।

🔶️ মৃত্যু থেকে পলায়ন করা সম্ভব হবে না।

বদকার বান্দা মৃত্যু থেকে পলায়ন করতে চাইবে কিন্তু এটা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। সূরা জুমার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “হে নবী আপনি বলুন! যে মৃত্যু হতে তোমরা পলায়ন করছ তা অবশ্যই তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে। তারপর তোমাদেরকে অদৃশ্য ও দৃশ্য সম্পর্কে পরিজ্ঞাত আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেয়া হবে। তারপর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা তোমরা করতে”।

✍ এখানে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার উক্তি, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলুন- তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সেই মৃত্যুর সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবেই। অতঃপর তোমরা প্রত্যানীত হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট এবং তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে যা তোমরা করতে। যেমন সূরা নিসার ৭৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও”।

✍ তিবরানী (রহঃ) এর মু’জাম গ্রন্থে হযরত সমরা (রাঃ) হতে একটি মারফু হাদীস বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি মৃত্যু হতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত হলো ঐ খেকশিয়াল যার কাছে ভূমি তার প্রদত্ত ঋণ চায়। তখন সে দ্রুত বেগে পালাতে শুরু করে। শেষে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তার গর্তে ঢুকে পড়ে। তখন ভূমি তাকে বলে, হে খেকশিয়াল! আমাকে আমার ঋণ দিয়ে দাও। একথা শুনে সে পুনরায় লেজগুটিয়ে ভীষণ বেগে দৌড়াতে শুরু করে। অবশেষে তার গর্দান ভেঙ্গে যায় এবং সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

🔶️ মৃত্যুর সময় কোন অবকাশ দেওয়া হবে না।

কারো মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে আসবে তখন সে আরো কিছুক্ষণ সময় চাইবে তথা একটু দেরিতে যেন তার মৃত্যু হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এর কোন সুযোগ দিবেন না। সূরা মুনাফিকুনের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর আল্লাহ কখনো কোন প্রাণকেই অবকাশ দেবেন না, যখন তার নির্ধারিত সময় এসে যাবে। আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত”।

✍ এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেন- নির্ধারিত সময়কাল যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, আল্লাহ কখনো কাউকেও অবকাশ দিবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। এ লোকগুলোকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে এসব কথা তারা ভুলে যাবে এবং পূর্বে যে কাজ করতো পুনরায় ঐ কাজই করতে থাকবে।

✍ মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে- “একদা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে বেশী বয়সের আলোচনা করেন। তখন তিনি বলেন- নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ কখনো অবকাশ দিবেন না। বয়সের আধিক্য এই ভাবে হয় যে, আল্লাহ তায়ালা কোন বান্দাকে সুসন্তান দান করেন এবং ঐ সন্তানরা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তার জন্যে দোয়া করতে থাকে। ঐ দোয়া তার কবরে পৌঁছে থাকে”।

🔶️ তাদের চেহারায় ও পশ্চাতে আঘাত করা হবে।

যারা আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হুকুম অমান্য করে নিজের ইচ্ছা মত জীবন যাপন করেছেন তাদের মৃত্যুর সময় বড় কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সূরা আনফালের ৫০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “আর যদি আপনি দেখতেন, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের প্রাণ হরণ করছিল, তাদের চেহারায় ও পশ্চাতে আঘাত করে, আর বলছিলেন তোমরা জ্বলন্ত আগুনের আযাব আস্বাদন কর”।

✍ এখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ফেরেশতারা কত জঘন্যভাবে কাফিরদের রূহ কবয করে থাকে তা যদি তুমি দেখতে! তারা ঐ সময় কাফিরদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে মারতে থাকে এবং বলেন, নিজেদের দুষ্কার্যের প্রতিফল হিসেবে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর। সূরা আন-আমের ৯৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “হে নবী আপনি যদি দেখতেন, যখন যালিমরা মৃত্যু যাতনায় থাকবে এবং ফেরেশতারা তাদের হস্তগুলো (তাদেরকে মারার জন্যে) প্রসারিত করবে এবং বলবে, বের কর স্বীয় আত্মা। আজ তোমাদেরকে দেয়া হবে অবমাননাকর শাস্তি, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অন্যায় কথা বলতে এবং তার নিদর্শনাবলী হতে গর্বভরে মুখ ফিরিয়ে নিতে”। সূরা মুহাম্মাদের ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “অতঃপর তাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ফেরেশতারা তাদের মুখমন্ডল ও পৃষ্ঠদেশসমূহে আঘাত করতে করতে তাদের জীবনাবসান ঘটাবে”?

✍ এই রকম আয়াতের বর্ণনায় তাফসীরের কিতাবের মধ্যে এসেছে, যেহেতু তারা ছিল নাফরমান লোক, সেহেতু তাদের মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের দ্বারা তাদেরকে খুবই কষ্ট দেয়া হয়।তাদের দুঙ্কার্যের কারণে তাদের রূহসমূহ তাদের দেহের মধ্যে লুকিয়ে যায়। সুতরাং ফেরেশতাগণ ওগুলো জোরপূর্বক বের করেন এবং বলেন, তোমার জন্যে আল্লাহর গজব রয়েছে।

🔶️ তাদের জন্য আসমানের দরজা খোলা হয় না। ইবনে মাজাহ শরীফের হাদিসে এসেছে- “হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তি বদকার হলে ফেরেশতা বলেন, হে নিকৃষ্ট দেহের নিকৃষ্ট আত্মা! নিন্দিত অবস্থায় বের হয়ে আয় এবং উত্তপ্ত গরম পানি ও রক্ত-পুঁজের দুঃসংবাদ গ্রহণ কর এবং অনুরূপ বহু বিষাক্ত বস্তুর। রূহ বের হয়ে আসা পর্যন্ত তারা এভাবে আহবান জানাতে থাকেন। অতঃপর তারা রূহসহ উর্দ্ধাকাশে আরোহণ করেন। কিন্তু তার জন্য দরজা খোলা হয় না। জিজ্ঞেস করা হয়, এ ব্যক্তি কে? বলা হয়, অমুক। তখন বলা হয়, নিকৃষ্ট দেহের নিকৃষ্ট আত্মার জন্য নাই কোন সাদর সম্ভাষণ। তুই নিন্দিত অবস্থায় ফিরে যা। কারণ তোর জন্য আকাশের দ্বারসমূহ খোলা হবে না। অতঃপর একে আসমান থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং তা কবরে ফিরে আসে”।

✍ আহমদ ও আবু দাউদ শরীফে একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে- “হযরত বারা ইবনে আযেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- যখন কোন কাফের বান্দা দুনিয়া থেকে প্রস্থান ও আখেরাতে যাত্রার সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়, তার নিকট আসমান থেকে কালো চেহারার ফেরেশতারা অবতরণ করে, তাদের সাথে থাকে ‘মুসুহ’ (মোটা-পুরু কাপড়), অতঃপর তারা তার নিকট বসে তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত, অতঃপর মালাকুল মউত আসেন ও তার মাথার কাছে বসেন। অতঃপর বলেন, হে খবিস নফস, আল্লাহর গোস্বা ও গজবের জন্য বের হও। তিনি বলেন, ফলে সে তার শরীরে ছড়িয়ে যায়, অতঃপর সে তাকে টেনে বের করে যেমন ভেজা উল থেকে (লোহার) সিক বের করা হয়। অতঃপর সে তা গ্রহণ করে, আর যখন সে তা গ্রহণ করে চোখের পলকের মুহূর্ত হাতে না রেখে ফেরেশতারা তা ঐ মোটা-পুরু কাপড়ে রাখে, তার থেকে মৃত দেহের যত কঠিন দুর্গন্ধ দুনিয়াতে হতে পারে সে রকমের দুর্গন্ধ বের হয়। অতঃপর তাকে নিয়ে তারা ওপরে উঠে, তাকেসহ তারা যখনই ফেরেশতাদের কোন দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখনই তারা বলে, এ খবিস রুহ কে? তারা বলেন, অমুকের সন্তান অমুক, সবচেয়ে নিকৃষ্ট নাম ধরে যার মাধ্যমে তাকে দুনিয়াতে ডাকা হত, এভাবে তাকে নিয়ে দুনিয়ার আসমানে যাওয়া হয়, তার জন্য দরজা খুলতে বলা হয়, কিন্তু তার জন্য দরজা খোলা হবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা আরাফের ৪০ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন- তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না ‎এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না ‎উট সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে। (সূরা আরাফ ৪০)। ‎অতঃপর আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তার আমলনামা জমিনে সর্বনিম্নে সিজ্জিনে লেখ। অতঃপর তার রুহ সজোরে নিক্ষেপ করা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা হজের ৩১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন- আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন ‎আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ ‎‎মেরে নিয়ে গেল কিম্বা বাতাস তাকে দূরের কোন ‎জায়গায় নিক্ষেপ করল”।

🤲 আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে যেন মৃত্যুর এই কঠিন যন্ত্রণা থেকে হেফাজত করেন। আমাদের মৃত্যু যেন উত্তম মৃত্যু হয়। আমরা রাব্বে কারীমের দরবারে এই ফরিয়াদ করি। (আমিন)

লেখক ইমাম ও খতিব ওল্ডহাম জামে মসজিদ, যুক্তরাজ্য।