বর্ষার পানিতে নিঃস্ব কৃষক মুক্তার

প্রকাশিত

ইসমাইল খন্দকার.সিরাজদিখান(মুন্সীগঞ্জ) থেকে: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে বর্ষার পানিতে তলিয়ে গেলো কৃষক মুক্তারের স্বপ্ন । হঠাৎ পানি বৃদ্ধি হওয়ায় এই কৃষকের ক্ষতির যেন শেষ নেই। মুলা, লালশাক, পুঁইশাক,লাউ শাক, বেগুনসহ অন্যান্য শাকসবজি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ২৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে কথা বলে জানা যায়, লতব্দী ইউনিয়নের কংশপুরা চন্ডিবদ্দি গ্রামের বিলে কৃষক মুক্তারের ছয় বিঘা জমিতে বেগুন চাষে ৩ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। কাগজ ও মাটি দিয়ে বান দেওয়ায় আরও ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে বেগুনের জমি যদি নষ্ট না হয় তবে এখান থেকে আমার ২০ লক্ষ টাকার বেশি আসবে। আর ১৪ বিঘা শাক বিক্রি হতো প্রায় ৩ লক্ষ টাকা। সব মিলিয়ে মোট ২৩ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা সবজি বিক্রি হতো।

উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের কংশপুরা গ্রামের মুক্তার হোসেন ৪৮ বলেন, এবছর আমি ছয় বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছি। এতে আমার ৩ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। এখন বেগুনের ফলন দেওয়া শুরু করেছে। এ জমি থেকে একবার বেগুন সংগ্রহ করেছি। টানা ৮ মাস বেগুন সংগ্রহ করা যাবে। প্রতিবারে ৬০ মন বেগুন সংগ্রহ করা যায়। যদি আমি ১ হাজার টাকা মন বিক্রি করি প্রতিবারে ৬০ হাজার টাকা। পাঁচ দিনেই একবার করে বেগুন সংগ্রহ করা যায়। আর এ জমি গুলো পানিতে সব নষ্ট করে দিয়েছে। এ জমিতে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বর্ষার পানি উঠেনি। হঠাৎ পানি বৃদ্ধিতে এ সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো। এখন আমি বাজার থেকে কাগজ কিনে আনলাম আর এ কাগজ ও মাটি দিয়ে বান দিতেই আমার ৩৫ হাজার টাকার মতো খরচ হবে। তিনি আরো বলেন, মোট ২০ বিঘা জমি বর্ষার পানিতে তলিয়ে গেছে। এরমধ্যে ছয় বিঘা বেগুন আর ১৪ বিঘা জমির লাউয়ের ডগা, লাল শাক,পুইশাক, মুলা,বেগুন ,ডাটা সহ অন্যান্য শাক-সবজি সব পানিতে তলিয়ে গেছে। আমার ১৪ বিঘা জমির শাক বিঘা প্রতি
২০ হাজার টাকা আসতো তবে প্রায় ৩ লাখ টাকার মতো আসত। এখন আমার মাছের চাষটা নিয়ে আমি অনেক চিন্তিত আছি। যেকোনো মুহূর্তেই আমার পুকুরে পানি চলে আসবে। পানি চলে আসলে ৫ লক্ষ টাকার মাছ চলে যাবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি ১০ বছর ধরে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। তবে এখনো পর্যন্ত কৃষি অফিসার বা কৃষি কর্মকর্তা কেউই আমার এখানে আসেনি এবং আমাকে কোনো পরামর্শও দেয়নি।

সহযোগিতা তো দূরের কথা। সারা বছরই আমি চাষাবাদ করি। আমি এত বড় একটা কৃষক হয়েও সরকারি কোন সার কীটনাশক কিছুই পাইলাম না। এই সার, ওষুধগুলো গেল কই। যাদের বড় মানুষের সাথে হাত আছে তারাই পাচ্ছে। আমাদের শরীরে মাটি লেগে থাকে তাই আমাদের কেউই পছন্দ করেনা। অন্যদিকে ভাইরাসের কারণে কারো কাছ থেকে টাকা ধার চাইলেও কেউ দেয় না। তাই আমি ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৮ লক্ষ টাকা কিস্তি উঠেছি এবং এগুলো কৃষিতে ব্যয় করেছি। বেগুনের যেহেতু ধর শুরু হয়েছিল তাই বেগুন বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করার চিন্তাভাবনা ছিল।

পানিতে সব শেষ হয়ে গেল। এ বেগুনের জমিতে গতবছর আমি মেশিন দিয়ে পানি দিছি আর এবছর পানি জমি থেকে সরাতে পারছি না। গতকাল ও আজকের বৃষ্টির কারোনে বেগুনের জমি টিকিয়ে রাখতে পারলাম না। তিনি আরো বলেন, গত বছর ট্রাক্টর মেশিনের আঘাতের কারণে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি ছিলাম। তখন আমার ৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। এখন আমি কাজ কর্ম করতে পারি না। মানুষ দিয়ে করাতে হয়।

কৃষক মুক্তারের স্ত্রী ফাতেমা বলেন, আমার ২ মেয়ে ২ ছেলে এই কৃষি কাজের মাধ্যমে সংসার চলছে। এ পানির কারণে সবকিছুই শেষ। কিভাবে কিস্তির টাকা দিব বুঝতে পারতেছি না। বর্তমানে আমাদের খাবারের সমস্যা। তিনি আরো বলেন, আরেকটু পানি বারলেই এ পুকুরে পানি চলে আসবে। এখন জাল কিনার টাকা নেই।

একই গ্রামের আজিজুল্লাহ বলেন, মুক্তারের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তাতে ক্ষতি পোষানো সম্ভব না। তবে বেগুন ক্ষেতে পানি সেচের জন্য আমার মেশিন দিয়ে গেলাম। যদি তার কোন উপকারে আসে। আমার কোন টাকা লাগবে না।

একই গ্রামের মৎস্য চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, আমি এবছর পুকুর লিছে নিয়ে রুই, কাতলা,সরপুটি, সিলভার কার্পসহ দুই লাখ টাকার মাছ ছেড়ে ছিলাম। পানি বারার কারণে ানেক মাছ চলে গেছে তবে নি বে থাকলে থাকবে। বৃষ্টির কারণে হঠাৎ করে রাতেই পানি বেড়ে যাওয়ায় এখন বেড়া দিতেছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র রায় বলেন, পানিতে আক্রান্ত ৫০ হেক্টর সবজি ও ৫০ হেক্টর রোপা আমন ধান আক্রান্ত হয়েছে। তবে এক সপ্তাহ বা ১০ দিন পানি এভাবে থাকলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরো বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কোন অনুদান আসেনি, তবে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ সহ পানি কিভাবে সরানো যায় এ পরামর্শ দিচ্ছি।