বিচার যা হোক, চালক অপরাধ করলেও জামিনটা যেন হয়: শাজাহান খান

প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী ও বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান রবিবার বলেছেন, চালক অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী বিচার যা হওয়ার হবে কিন্তু তার যেন জামিনের ব্যবস্থা রাখা হয়। তিনি বলেন, ‘সড়ক পরিবহনের নতুন আইনে চালক অপরাধ করলে যেন জামিন পায়, সরকারের কাছে এটা আমাদের দাবি। এই দাবি মানা না মানা সরকারের ব্যাপার। সড়ক দুর্ঘটনায় জামিন না পেয়ে দীর্ঘদিন গাড়ি চালাতে না পারলে চালকের ঘাটতি দেখা দেবে।’

সড়কের নতুন আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে জামিন অযোগ্য ধারাটি বাদ দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকরা। রোববার সচিবালয়ে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভা শেষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান সাংবাদিকদের বলেন, নতুন আইনে জামিন অযোগ্য ধারাটি বাতিল হলে এই আইনে বিচার মেনে নিতেও প্রস্তুত তারা।

পরিবহন শ্রমিক নেতারা বলছেন, আইনে জামিন অযোগ্য ধারা থাকায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে জেলে যাওয়ার ভয়ে পরিবহন চালক ও শ্রমিকরা স্বন্ত্রস্ত হয়ে আছেন। শাজাহান খান বলেছেন, জামিন অযোগ্য ধারার কারণে পরিবহন শ্রমিকদের পরিবারে সঙ্কট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি চালকেরও ঘাটতি দেখা দেবে।

তিনি বলেন, “একজন ড্রাইভার তার সীমিত আয় দিয়ে সংসার পরিচালনা করে। মাসে ১৫ দিনের বেশি গাড়ি চালাতে পারে না, ১৫ দিনের আয় দিয়ে তাকে এক মাস সংসার পরিচালনা করতে হয়।

“আমরা সরকারের কাছে দাবি করেছি, একজন ড্রাইভার যদি দুর্ঘটনা ঘটান, সে যদি দীর্ঘদিন জামিন না পান, তবে ড্রাইভারের ঘাটতি পড়ে যাবে। এক বছরে সারাদেশে ৩ থেকে ৪ হাজার দুর্ঘটনা হয়, তাহলে ৩ থেকে ৪ হাজার ড্রাইভারের ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে। আমরা এখনও কিন্তু ৩ থেকে ৪ হাজার ড্রাইভার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে পারছি না, আমাদের সেই ক্যাপাসিটি নেই।”

“এ কারণেই বলেছি, দুর্ঘটনা ঘটালে তদন্ত করে বিচার হবে সেই বিচারে যা হওয়ার হবে, কিন্তু সে যেন জামিনটা পায়। এতে ঘাটতির জায়গাটা পূরণ হবে। জেল যা আছে, সেটা নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই,” বলেন শাজাহান খান।

অপরাধ জামিনযোগ্য করা হলে দুর্ঘটনা আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হবে কি না- প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “এটা ঠিক নয়। কেউ যদি একবার অপরাধ করে, সেই কিন্তু অপরাধ ইচ্ছা করে করে না, করতে চায় না। ”গত বছর ঢাকার সড়কে দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে শাস্তি আরও কঠোর করে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করে সরকার।

শুরু থেকে এই আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। গত সপ্তাহে আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হলে বিভিন্ন জেলায় পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘটে চলে যান। কবে শাজাহান খান বলেন, নানা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পরিবহন শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করলেও কোনো ধর্মঘট ডাকা হয়নি।

রাস্তায় আবার অচলাবস্থা হবে কি না- প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা কেউ ধর্মঘট ডাকিনি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে…আপনারা যেটা বলেছেন ফাঁসি হবে, এই হবে সেই হবে, এ সমস্ত অপপ্রচারের কারণে শ্রমিকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এই অচলাবস্থা করেছে।” সড়কে গাড়ির কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো নামছে না বলে তা মনে হচ্ছে।

“ওই আইনের কারণে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। এই বাস্তবতাটা আপনারা (সাংবাদিকরা) লেখেন না, লেখেন স্বাভাবিক হয়নি। আমি মনে করি, সবই স্বাভাবিক চলছে।”তবে ট্রাক ও কভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মঘট ডাকলে নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। রোববারের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন।

শাজাহান খান বলেন, “বাস্তবতাটা হল এই, লাইসেন্সের কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন অনেক ঘাটতি আছে, লাইসেন্স দিতে পারছে না বিআরটিএ।”স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন ধরনের গাড়ির ফিটনেস, কাগজপত্র হালনাগাদের নতুন সময় দেওয়া হলেও নতুন সড়ক পরিবহন আইনের কোনো অংশ স্থগিত করা হয়নি।

“আইন কিন্তু ইনপ্লিমেন্ট হয়ে গেছে। কয়েকটি বিষয়ে আমাদের দুর্বলতা রয়েছে, যেমন আমার বিআরটিএ লাইসেন্স নবায়ন করতে পারিনি, এটার জন্য অ্যাকশন প্ল্যান করতে শুরু করেছি। লাইসন্সে না দিলে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করব? কয়েকটি জায়গায় ৩০ জুনের মধ্যে সেরে নিতে হবে।

“তাদের বিভিন্ন যানবাহনে যে সমস্যা রয়েছে, সেটিও সমাধান করা হবে। তারা ডিফল্টার হয়ে গিয়েছিল ট্যাক্স টোকেনের বিষয়ে, আবেদন জমা দিলে আশা করি জরিমানা এবারের মধ্যে মাফ করা হবে।”

নতুন আইনের ব্যাখ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আইনে মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা নেই। অপরাধ করলে কত বছর সাজা হবে এবং জরিমানা কত হতে পারে সর্বোচ্চ, তা আইনে লেখা আছে। সর্বোচ্চ লিমিট দেওয়া হয়েছে, জজ সাহেব ব্যবস্থা নেবেন, আমরা সিলিং দিয়েছি সর্বোচ্চ, তিনি ইচ্ছা করলে যে কোনো জায়গায় যেতে পারেন, সেটা তার এখতিয়ার।”

বৈঠকে চারজন সচিবের নেতৃত্বে চারটি সাব কমিটি গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কোন কোন জায়গায় দুর্বলতা আছে, সে বিষয়গুলো কমিটি জানাবে। বিআরটিএকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং তার দুর্বলতাগুলো ঠিক করতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান ও সড়ক সচিব নজর দেবে। “

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয় সচিব এবং স্থানীয় সরকার সচিববের নেতৃত্বে গঠিত ৪টি কমিটি আগামী দুই মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দেবে। “এ সুপারিশ পাওয়ার দুই মাস পর আবার বৈঠক করা হবে এবং সুপারিশের সাথে অ্যাকশন প্ল্যানও তৈরি করে দেবে।”

সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে যে কমিটি সরকার করেছে, তারা ১১১টি সুপারিশ দিয়েছে। ওই সুপারিশ বাস্তবায়নে লক্ষ্যেই উপকমিটিগুলো কাজ করবে।

সুপারিশ বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগছে কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন,“টাস্কফোর্স গঠন করে ১৬ অক্টোবরে গেজেট হয়েছে। এখানে টাক্সফোর্সে কোনো সময় নষ্ট হয়নি। বিআরটিএর দুর্বলতা কাটাতে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, রাস্তাঘাট সংস্কার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করা হবে। জনসচেতনার জন্য তথ্য সচিব কাজ করবেন। স্থানীয় সরকারের অধীনে যে সড়ক রয়েছে তা স্থানীয় সরকার সচিব দেখবে।”