বেড়েই চলছে টেস্ট অনুপাতে সংক্রমণের হার

প্রকাশিত

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে করোনায় প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। সে হিসেবে ২০ মে করোনার সংক্রমণের ৭৩ তম দিন পার করলো বাংলাদেশ। এই সময়ের মধ্যে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩২টি টেস্ট করে ২৬ হাজার ৭৩৮ জনকে শনাক্ত করা গেছে। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩৮৬ জন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআরের প্রতিদিনের উপাত্ত থেকে দেখা যায় প্রতিদিন সংক্রমণ বেড়ে চলছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু ঘটনা ও সিদ্ধান্তের কারণে এই আক্রান্তের গতি অত্যন্ত তীব্র।

যেহেতু সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে মোট সংক্রমণের হ্রাস-বৃদ্ধি আক্রান্ত এলাকায় মানুষের চলাফেরার মাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত তাই সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ খুঁজতে চারটি সময়কাল ধরে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে বাংলা ট্রিবিউন গবেষণা বিভাগ।

মানুষের চলাচলের উপর প্রভাবের ব্যাপকতার বিবেচনায় তিনটি ঘটনা ও সিদ্ধান্তের তারিখকে পর্যবেক্ষণের আওতায় নেওয়া হয়। তিনটি তারিখ হচ্ছে ৪ এপ্রিল, ২৬ এপ্রিল এবং ১০ মে। ৪ এপ্রিল নানান বিভ্রান্তির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তৈরি পোশাক কর্মীরা ঢাকায় আসে এরপর আবার চলে যায়, ২৬ এপ্রিল দীর্ঘদিন বন্ধের পর গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেওয়া হয়; একই দিনে সীমিত পরিসরে কয়েকটি অফিসও কার্যক্রম শুরু করে। ১০ মে শর্তসাপেক্ষে খুলে দেওয়া হয় মার্কেটও।

এই তিনটি তারিখ বিবেচনায় চারটি সময়কাল নির্ধারন করা হয়। সেগুলো হচ্ছে ৮ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল (শুরুর এক মাস), ৯ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল, ১ মে থেকে ১৪ মে এবং ১৫ মে থেকে ২০ মে।

সিদ্ধান্তের তারিখ থেকে সময়কালের শুরুর তারিখকে করোনাভাইরাসের ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ডে’র বিবেচনায় সংযোজন করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে করোনাভাইরাসের সংক্রমিত হওয়ার পর উপসর্গ আসতে গড়ে ৫-৬ দিন সময় লাগে। তাই আমরা এই পর্যালোচনায় ধরে নিয়েছি যে একটি ঘটনার ৬ দিন পর তার প্রভাব প্রকাশ পেতে শুরু করে। সেই হিসেবে ৪ এপ্রিলের ঘটনার প্রভাব ৯ এপ্রিল থেকে দেখা যাবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এরপর ২৬ এপ্রিলের সিদ্ধান্তের প্রভাব ১ মে থেকে পর্যবেক্ষিত হবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। ১০ মে’র সিদ্ধান্তের প্রভাব ১৫ মে থেকে পর্যবেক্ষিত হবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে প্রাপ্ত তথ্য

উপরোক্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় সংক্রমণের প্রথম মাসে মোট ৪ হাজার ৭৪০ টেস্টের বিপরীতে শনাক্ত করা যায় ২১৮ জনকে। সেই হিসেবে মোটের ওপর টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার ৪.৬ শতাংশ ছিল। যদিও প্রথম মাসের শেষ সপ্তাহে টেস্ট অনুপাতে সংক্রমণের হার কিছুটা কমতে দেখা যায়। শেষ সপ্তাহে টেস্ট অনুপাতে সংক্রমণের হার ছিল ৪.৩ শতাংশ।

৪ এপ্রিল পোশাক শ্রমিকদের ঢাকামুখী যাত্রার প্রভাব পর্যালোচনায় দেখা যায় ৯ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৫৯ হাজার ৩৯৫ টেস্টের বিপরীতে শনাক্ত করা যায় ৭ হাজার ৪৪৯ জনকে। অর্থাৎ মোটের উপর টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১২.৫% কিন্তু এই সময়কালের শেষ সপ্তাহের এই হার ছিল ১২.১ শতাংশ।

২৬ এপ্রিল সীমিত পরিসরে গার্মেন্টস ও কিছু অফিস খোলার প্রভাব পর্যালোচনায় দেখা যায় ১ মে থেকে ১৪ মে সময়কালের মধ্যে ৮৭ হাজার ২৬৪ জনকে টেস্ট করে ১১ হাজার ১৯৬ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ মোটের উপর ১২.৮ শতাংশ জন পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন কিন্তু সময়কালের শেষ সপ্তাহে এই হার ছিল ১৩.৮ শতাংশ।

১০ মে ঈদ শপিংয়ের জন্য মার্কেট ও শপিংমল খুলে দেওয়ার প্রভাব পর্যালোচনায় দেখা যায় ১৫ মে থেকে ২০ মে সময়কালের মধ্যে ৫১ হাজার ৯২২ জনকে টেস্ট করে ৭ হাজার ৮৭৫ জনের মধ্যে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়। এই সময়কালে মোটের ওপর টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার ছিল ১৫.২ শতাংশ।

টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার একটি জনবসতিতে সংক্রমণের মাত্রা নির্দেশ করে। এই হার যত কম হবে বা কমতির দিকে থাকবে ততই ভালো। সেই হিসেবে উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় বাংলাদেশে যত দিন যাচ্ছে ততই সংক্রমণ বাড়ছে এবং এই সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রথম একমাসে টেস্ট অনুপাতে সংক্রমণের হার ছিল ৪.৬ শতাংশ। এই সময়কালের শেষ সপ্তাহে এই হার ছিল ৪.৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রথম এক মাসে সারাদেশে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে।

যদিও তা স্থায়ী করা যায়নি ৪ এপ্রিল নানান বিভ্রান্তির কারণে পোশাক শ্রমিকদের ঢাকামুখী যাত্রার প্রভাবে। ৯ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল মোটের ওপর টেস্ট অনুপাতে সংক্রমণের হার ছিল ১২.৫ শতাংশ। এই সময়কালেরও শেষ সপ্তাহে এই হার ছিল ১২.১ শতাংশ। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও করোনার বিস্তার বেড়ে গেলেও তড়িৎ পদক্ষেপের কারণে সংক্রমণের হারকে একই পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়। শেষ সপ্তাহে নেমে আসার আভাসও দেখা যায়।

কিন্তু এক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। ২৬ এপ্রিল সীমিত পরিসরে গার্মেন্টস ও কিছু অফিস খোলার প্রভাব দেখা যায় ১ মে’র পরবর্তী সময়ে। ১ মে থেকে ১৪ মে পর্যন্ত টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার দেখলে দেখা যায় এই সময়কালে গড়ে টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার ছিল ১২.৮ শতাংশ এবং শেষ সপ্তাহে সেটি আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৮ শতাংশ।

এরই মধ্যে ১০ মে শর্তসাপেক্ষে শপিংমল ও বিভিন্ন মার্কেট খুলে দেওয়া হলে সংক্রমণের হার আরও বেড়ে যায়। ১৫ মে থেকে ২০ মে’র মধ্যে টেস্ট অনুপাতে গড় সংক্রমণের হার পাওয়া যাচ্ছে ১৫.২ শতাংশ। সর্বশেষ ২০ মে এই হার ছিল ১৫.৮ শতাংশ।

এছাড়াও মৃত্যুর সংখ্যাও অন্যান্য সময়কালের চেয়ে বেড়েছে। গত ১১ মে থেকে ২০ মে পর্যন্ত করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন ১৫৮ জন। অথচ ১ মে- ১০ মে পর্যন্ত মারা গেছেন ৬০ জন।

উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে বলা যায়, প্রথম এক মাসে বাংলাদেশে সংক্রমনের হার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও কয়েকটি ঘটনা ও সিদ্ধান্তের প্রভাবে সংক্রমণ বেড়ছে। যতই টেস্ট করা হচ্ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বেড়ে চলছে শনাক্তের সংখ্যা। এ থেকে বুঝা যায় যে, বাংলাদেশের সংক্রমিত এলাকাগুলোর মধ্যে মানুষের চলাচল বাড়ার কারণে করোনাভাইরাসের বিস্তার ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে।

বি. দ্র. আইইডিসিআরের পরিবেশিত ২৪ ঘণ্টার টেস্টের সংখ্যা যোগ করে মোট টেস্টের সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে। আইইডিসিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত মোট সংখ্যার সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার তথ্যের যোগফলে তারতম্য হতে পারে।