বিভাগ - সারাদেশ

ব্রাহ্মণপাড়ার সিদলাই গ্রামে দলাদলি ও সহিংসতায় শতাধিক পরিবার বাড়ী ঘর ছাড়া

প্রকাশিত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজস্ব প্রতিবেদক কুমিল্লা: কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার অতি পরিচিত গ্রাম সিদলাই। দহ্মিন সিদলাই গ্রামের ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের দলাদলি ও সহিংসতা গত ৮০ বছর যাবৎ চলমান আছে। জমি জমা সংক্রান্ত দ্বন্ধে প্রথম জরিয়ে পড়েন মিরাজ আলী সরকার গং বনাম রইস উদ্দিন গংদের মধ্যে। তাঁর পর থেকে এ দুটি ওয়ার্ডে দলাদলি মারামারি চলতেই থাকে। সর্বশেষ বেশ কয়েক বছর যাবৎ মো: সামসুল হক গং বনাম মফিজ, লিটন, জাহাঙ্গীর, সফিক ও বাবুল মিয়া গংদের মাঝে খুন, বশতি ভিটা অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, চুরি, ডাকাতি, লুটপাটসহ ব্যাপক সহিংসতা বিগত দিনের সকল ঘটনাকে হাড় মানিয়েছে। বর্বর, বিভৎস্য এসব ঘটনায় গত ৩ বছরে এ গ্রামে সহিংসতায় ৫ জন নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। অগ্নিকান্ডে উভয় দলের ক্ষতি হয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক পরিবারের। এ দুটি ওয়ার্ডের প্রায় শতাধিক পরিবার গত ৩ বছর যাবৎ বাড়ী ঘর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছে প্রায় ৩০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তানগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটে লেখা-পড়া ছেড়ে দিয়েছে অনেকেই। বর্তমানে ওই গ্রামে থমথম পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সহিংসতা চলাকালিন অনেকের বাড়ীর দেয়াল ও ছাদ থেকে ইট খুলে নিয়ে যায় প্রতিপক্ষরা। আগুন দিয়ে জালিয়ে মাটির সাথে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে অনেক টিনের ঘর ও আধা পাকা বিল্ডিং। জালিয়ে দেয়া হয়েছে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরুগীসহ ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। যা মধ্যযুগেীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে স্কুল ও মাদ্রাসা পড়–য়া মেয়েরা বাড়ীতে থাকতে পারেনি। এমনকি এখনও অনেকে বাড়ীতে ফিরে আসতে সাহস পাচ্ছে না। ছোটদল ও বড়দল নামে পরিচিত সামসু ও মফিজ গংদের মধ্যে মফিজ মারা গেলেও সেদলের নের্তৃত্বে আছে তার সহযোগী লিটন, জাহাদ্দীর, সফিক ও বাবুল গংরা। ছোট দলের সামসুল হক আমেরিকা প্রবাসী হলেও অহিদ মেম্বারসহ তার অনুসারীরা সে দলের নের্তৃত্ব দিচ্ছেন। ভয়াবহ এ দাঙ্গা হামলায় গত ৩ বছরের নৃশংস্বভাবে মৃত্যুবরণ করেছে খোরশেদ আলম ও সানু মিয়া। এছাড়া এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৃত বরন করেছে মফিজ, রমিজ ও তাহের। ৯ নং ওয়ার্ডের এলাকা ছাড়া হারুনুর রশীদের ছেলে কুমিল্লায় কর্মরত মটর মেকানিক মো: সোহেল রানা এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমরা কোন দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আমাদেরকে ছোট দলের সমর্থক বানিয়ে বড় দলের লোকজন ২০১৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী বাড়ী ঘরে হামলা করে আমার বাবা-মাসহ পরিবারের লোকজনকে বের করে দেয়। এরপর আমরা সবাই নিরুপায় হয়ে কুমিল্লা শহরে আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের মত শতাধিক পরিবার ওই দিনের হামলায় বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। বর্তমানে তারা কুমিল্লা, ঢাকা ও চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। পালিয়ে থাকা পরিবারগুলো এলাকায় যাবার ইচ্ছে থাকলেও বড় দলের লোকজনের হামলার ভয়ে এলাকায় যেতে পারছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক ব্যাক্তি বলেন, গত ৩ বছরে দু-পক্ষের ২৩ টি মামলা হয়েছে। পঙ্গু হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩০ জন মানবেতর জীবন-যাপন করছে। দোকান-পাট, বাড়ী-ঘর, আসবাবপত্র ভাংচুর করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য হবে কয়েক কোটি টাকা। একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামী নাজনীন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজুল ইসলাম দুলালসহ ২৫/৩০ জেল হাজতে আছে। উভয় দলের ওয়ারেন্টের আসামী আছে প্রায় ৩ শতাধিক। ওয়ারেন্টের আসামীরা পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে এলাকায় চলাচল করছে। এব্যাপারে সিদলাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন মুহাম্মদ এ গ্রতিনিধিকে বলেন, গত ৩ বছরে দক্ষিন সিদলাই ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডে যেসব ঘটনা ঘটেছে আমি তার তীব্র নিদ্ধা জানাই। কোন সভ্য সমাজে এসব ঘটনা ঘটতে পারেনা। বিষয়টি নিশ্পত্তির লক্ষ্যে আমি মাননীয় সাংসদ সাবেক মন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু’র সাথে আলোচনা করেছি। তিনি ২০১৮ সালের আগষ্ট মাসে এ বিষয়ে একটি সুরাহার উদ্দ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু কি এক অদৃশ্য কারনে তা আর এগুতে পারিনি। আমি আবারও সমাধানের লক্ষ্যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এব্যাপারে থানার অফিসার ইনর্চাজ (ওসি) আজম উদ্দিন মাহামুদ এ প্রতিনিধিকে বলেন, দক্ষিণ সিদলাই গ্রামের দীর্ঘদিনের দলাদলি সামাজিকভাবে মিমাংসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার গণ্যমাণ্য ব্যাক্তিবর্গ। ওই এলাকাটি ব্রাহ্মণপাড়া থানা পুলিশ সার্বক্ষণিক নজরদারীতে রেখেছে। আইনশৃংখলা অবনতী হচ্ছে এমন কোন কর্মকান্ডকে কোন অবস্থাতেই ছাড় দেয়া হবে না। ইতিমধ্যে ওয়ারেন্টভ’ক্ত অনেক আসামীকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। ওয়ারেন্টভ’ক্ত বাকী আসামীদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।