ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে বললেন ডা. মাবুদের ছেলে

প্রকাশিত

এওয়ান নিউজ: নতুন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের যেসব ঘাটতি, ভুলভ্রান্তি রয়েছে, তা স্বীকার করে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকককে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জনিয়েছেন কোভিড-১৯ এ মারা যাওয়া এক চিকিৎসকের ছেলে।

ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ইউরোলজির চিকিৎসক বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আবদুল মাবুদ চৌধুরী (৫৩) কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে এ মাসের শুরুর দিকে পূর্ব লন্ডনের কুইন্স হাসপাতালে মারা যান।

মারা যাওয়ার আগে তিনি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি থাকার কথা বলেছিলেন। ডা. মাবুদের ছেলে ইনতিসার চৌধুরী বলেন, জনগণের কাছে ক্ষমা চাইলে তাদের আস্থার উন্নতি হবে।

পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হ্যানকক, এলবিসি রেডিওকে বলেছেন, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনে থেকে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের পরামর্শে সরকারের কাজের বেশ উন্নতি হয়েছে। তবে যারা স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ (পিপিই) পেতে সহায়তা করছেন, তাদের কাজটিকে খাটো করতে চাননা বলেও জানিয়েছেন তিনি।

“বিপুল সংখ্যক লোক যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করছে এবং সঙ্কটের শুরু থেকে অনেককিছু করেছেও। সঙ্কট মোকাবেলায় হাজার হাজার মানুষ যেভাবে সবসময় অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে, আমি তাদের খাটো করতে চাই না।”

এলবিসি রেডির ওই অনুষ্ঠানের ফোনে সরাসরি যুক্ত হয়ে ইনতিসার চৌধুরী ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বলেন, “সরকার এটি (করোনাভাইরাস সঙ্কট) নিখুঁতভাবে মোকাবেলা করতে পারবে, এটা জনগণ আশা করে না। আমরা শুধু চাইছি, অনেক ভুলভ্রান্তি যে রয়েছে, সেটা আপনি খোলাখুলিভাবে স্বীকার করবেন। “প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করা মানে কোনো অপরাধ স্বীকার করা নয়, এটি বরং আপনাকে আরও বেশি মানবিক করবে। অনুগ্রহ করে আপনি কি আমার জন্য আজকের সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশে ক্ষমা চাইবেন?”

ইনতিসারের প্রশ্নের জবাবে হ্যানকক বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পরিস্থিতির কিভাবে আরও উন্নতি করা যায় সে বিষয়ে আমরা প্রতিনিয়তই শিখছি এবং আমি মনে করি আমাদের উন্নতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সামনে যারা আছেন, তাদের কথা শোনা।”

এর আগে বিবিসি ফোর রেডিওর টুডে অনুষ্ঠানে এসে ইনতিসার বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি মন্ত্রীদের বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে জনগণের আস্থা বাড়বে।

“আমি মনে করি শুধু পিপিইর ক্ষেত্রেই নয়, পুরো সঙ্কটই ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারছে না সরকার, তাই আমি অবশ্যই জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে। তাহলে আমরা ক্ষমাও করে দিতে পারি, কারণ এটা এমন একটা অভাবনীয় সঙ্কট, যেখানে কখন কি করা উচিত তা বোঝা কঠিন। কিন্তু তাদের (সরকার) ‍উচিত নিজেদের জাবাবদিহি করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং এমন কিছু করা যাতে আমরা তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারি।”

ব্রিটিশ সরকারের হিসাবে এ পর্যন্ত ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ৮২ জন কর্মকর্তা ও ১৬ জন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তবে বিবিসি নিউজের হিসাবে যুক্তরাজ্যে এই ভাইরাসে অন্তত ১১৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

ব্রিটিশ সরকার যে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যায় পিপিই কিনতে ব্যর্থ হয়েছে, বিবিসি প্যানোরমার এক অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে আসার পরই স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানালেন ইনতিসার চৌধুরী।

কোভিড-১৯ যখন যুক্তরাজ্যে হানা দেয়, তখনও সরকারের কাছে এই মহামারী মোকাবেলায় পর্যাপ্ত গাউন, মাস্ক, নমুনা সংগ্রহের সোয়াব এবং এমনকি মৃতদেহ নেওয়া মতো ব্যাগও ছিল না বলে অনুসন্ধানে এসেছে।

ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সুপরিচিত মুখ আবদুল মাবুদ চৌধুরী গত ২৩ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাঁচ দিন আগে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ যুদ্ধে সামনের কাতারে থাকা ডাক্তার/নার্স/স্বাস্থ্য কর্মীদের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তাদের রক্ষার জন্য বরিস জনসনকে উদ্দেশ্য করে ফেইসবুকে পোস্ট দেন।

সেখানে তিনি লিখেন, “প্রিয় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, দয়া করে ব্রিটেনে এনএইচএসের (জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা) সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষার জিনিসপত্র নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, আমরা যারা ডাক্তার/নার্স/স্বাস্থ্যকর্মী, তাদের প্রতিদিন সরাসরি রোগীদের সংস্পর্শে আসতে হয়। কিন্তু আমরাও মানুষ, আমাদেরও মানবাধিকার আছে; এই পৃথিবীতে সন্তান এবং পরিবার পরিজন নিয়ে রোগমুক্তভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আমাদেরও আছে।”

এর কয়েকদিন পর তিনি ও জনসন- দুজনই নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। দুজনের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী সেরে উঠেলেও বাঁচতে পারেননি বাংলাদেশি এই চিকিৎসক। মাবুদের স্ত্রীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন।

মাবুদ চৌধুরী পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশের সিলেট ক্যাডেট কলেজ এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। স্ত্রী, এক ছেলে এবং এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার।