বিভাগ - মতামত

মরহুম হাজী আশিক আলী তালুকদার ও কিছু কথা..

প্রকাশিত

সূর্যদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি, ও আমার বাংলাদেশ প্রিয় জন্মভূমি। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পূর্তিতে জীবনের এই প্রথম বিজয়ের মাস ১৬ই ডিসেম্বরের মহান দিনে মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা কিছু কথা, কিছু আবেগ, কিছু বাস্তবতা তুলে ধরার জন্যই লিখতে বসা।

শুরুতেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বাঙালি জাতির সাহসী সিংহপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষক মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে। মুক্তিযুদ্ধের কথা আসলে যাদের নাম না নিলে না হয়; সিলেটের কৃতি সন্তান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীসহ স্বাধীনতার যুদ্ধে যারা দেশমাতৃকার টানে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে প্রিয় জন্মভূমিকে পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত করেছেন সেই সকল বীর শহীদদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। এরপর যার স্মরণে আমার আজকের এই লেখা, যিনি মুক্তিযুদ্ধের হাজারো স্মৃতি বুকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা ও লালন করে নিজের সারাটা জীবন পরিচালনা করেছেন সদ্যপ্রয়াত শ্রদ্ধেয় ছোট চাচা মরহুম হাজী আশিক আলী তালুকদারকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

বিজয়ের এই দিনে আজ বারবার মনে পড়ছে চাচার রেখে যাওয়া কিছু স্মৃতিকথা। আমার নিজের দেখা শ্রদ্ধেয় চাচা মরহুম হাজী আশিক আলী তালুকদার বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জাতীয় দিবস যথাযথ মর্যাদা সহকারে পালন করতেন। ১৬ই ডিসেম্বরের ফজরের নামাজ পড়ে উনি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনতেন এবং মাইক দিয়ে প্রচার করে অন্যদেরকেও শুনাতেন। মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য স্মৃতিকথা তিনি আমার কাছে বলতেন, তার কথা বলার ভঙ্গিতে মনে হতো এসব ঘটনা তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন। খুব সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন তিনি। কথার যুক্তি দিয়ে চাচাকে হারানো খুবই অসম্ভব ব্যাপার ছিল। ১৬ই ডিসেম্বর এবং ২৬শে মার্চের পূর্বে তিনি বাড়ি থেকে শহরে চলে যেতেন এবং প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে যাওয়ার জন্য তিনি সাদা গেঞ্জি, সাদা পায়জামা পড়ে খালি পায়ে বাসা থেকে শহীদ মিনারে যেতেন।

তিনি প্রায়ই নামাজ পড়ে বঙ্গবন্ধুর জন্য দোয়া করতেন। একবারতো লাইলাতুল বরাতের রাতে তিনি আমাদের গ্রামের মসজিদের সম্মিলিত মোনাজাতে চিৎকার করে ক্রন্দনরত অবস্থায় ‘হে আল্লাহ তুমি বঙ্গবন্ধুকে মাফ করো এবং জান্নাত নসিব কর’ বলে উচ্চ আওয়াজে দোয়া করেছিলেন। তার আওয়াজে ইমামসহ সমস্ত মুসল্লীদের মধ্যে নিস্তব্ধ নীরবতা চলে আসে। চাচা একদিন আমাকে বলছিলেন, বাবা দোয়া করো কেয়ামতের দিন আল্লাহ যেন আমাকে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার তৌফিক দেন। যা হোক, আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোন দল করি, কোনো না কোনো দলের আদর্শকে বুকে লালন করি কিন্তু আমরা কয়জন পবিত্র নামাজ পড়ে দলীয় প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধানদের জন্য দোয়া করি এবং পরকালে একসাথে হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি? হিসাবের এই থলিতে আমরা হাত দিলে অনেকেই বাদ পড়ে যাবো। আজ আমরা দুনিয়ার মোহ, ক্ষমতার দাপট, টাকা-পয়সা, পেশী শক্তি, নেতা নেতা ভাব এসবের জন্যেই তো দল বা রাজনীতি করি। কয়জনই বা দলের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা নিয়ে রাজনীতি করে? আজকাল আমরা দলবদলের রাজনীতি করি। সত্যিকারের আদর্শের রাজনীতি থেকে আমরা অনেক দূরে।

বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রাম-গঞ্জে কয়জনই বা খবর রাখি আমরা এইসব আশিক আলী তালুকদারের। কয়জনই বা মূল্যায়ন করি তাদের আবেগ এবং অনুভূতিকে। যারা তাদের জীবনের সর্বস্ব দিয়ে দলকে ভালোবাসে। যাদের খবর পত্রিকার পাতায় আসে না, যাদেরকে দেখা যায়না টিভির পর্দায়। যাদের কোনদিন এমপি-মন্ত্রী কিংবা চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়ার কোন স্বাদ-ইচ্ছা নেই। অথচ তারা তিলে তিলে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয় নিজের দল বা আদর্শের জন্য।

চাচার প্রত্যেকটা জিনিস ছিল স্বতন্ত্র এবং আলাদা। খুব পরিপাটি করে মিলিয়ে পোশাক পরতেন তিনি। খুবই স্মার্ট এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে চলাফেরা করতেন। মরহুম চাচা এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন কিন্তু উনার হাতের লেখা ছিল খুবই চমৎকার। যৌবন বয়সে চাচা আমাদের এলাকার শিক্ষিত সচেতন যুবসমাজ, সমবয়সী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সংঘবদ্ধ করে উত্তরণ যুব সমিতি এবং সমাজ উন্নয়ন সংস্থা নামে সামাজিক সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এসব সমবায় সমিতি সেই সময়ে এলাকায় সমাজসেবা, জনসেবা ও শিক্ষায় পিছিয়েপড়া ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার উৎসাহ প্রদানে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

চাচার যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন সৌদি আরবে। সেই সুযোগে কয়েক বার হজ্ব ও ওমরা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। হাজরে আসওয়াদে কাবা ঘরের দরজায় কড়ানেড়ে চুমু দেয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। মাকামে ইব্রাহীম ও মসজিদে নামাজ পড়ে কান্নার সুযোগ পেয়েছেন বহুবার। মসজিদে নববীতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেকবার সালামও দিয়েছেন তিনি। পারিবারিক জীবনে অবিবাহিত থাকায় দীর্ঘ দিন মায়ের সেবা করার সুযোগও পেয়েছিলেন। চাচার কোন সন্তান না থাকলেও আমাদেরকে ছেলে-সন্তানের মতোই আদর-যতœ করে বড় করেছেন। তিনি ছিলেন খুব স্পষ্টবাদী, নিরব সমাজকর্মী, মুক্তমনা, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, স্বাধীনচেতা ও খাঁটি দেশপ্রেমিক। চাচার জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার অনেক স্মৃতি আমাকে বারবার পীড়া দেয় এবং সাথে সাথে আনন্দও দেয়। চোখ বুঁজলেই সেইসব স্মৃতি আমার মানসপটে চোখের পর্দায় আজো ভেসে ওঠে।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। কিছু ভালো কিছু মন্দ এই মিলিয়েই আমাদের মানবজীবন। চাচার জীবনও ঠিক তাই। চাচার মৃত্যুর পূর্বে বছরখানেক তিনি শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ ছিলেন। কিছুদিন আগে একটা স্ট্রোক করে আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়েন। অবশেষে গত ১২ ডিসেম্বর দুনিয়ার মায়া ছেড়ে মহান প্রভুর ডাকে সারা দিয়ে এই চিরচেনা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। তার বিদায় আমাদেরকে খুবই পীড়া দিয়েছে। প্রিয়জনের বিচ্ছেদ সত্যিই বেদনাদায়ক। কবি কৃষ্ণকান্ত মজুমদারের সেই কথাই মনে পড়ে বারবার ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।’

মানুষ মরণশীল, প্রত্যেক মানুষকেই মরতে হবে। এই ভবেতে কেউই চিরস্থায়ী নয়। চাচার জন্য দোয়া করি আল্লাহ তা’আলা যেন তার সমস্ত অপরাধকে ক্ষমা করে দেন। আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা যেন তার জন্য একজন জীবনসঙ্গী বানিয়ে দেন। মুনিব যেন দয়া করে মায়া করে তার এই হোজ্জাজ চিরকুমারকে জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করে দেন। আমীন।

লিখেছেন- সাংবাদিক সারোয়ার হোসাইন, ব্রাডফোর্ড, যুক্তরাজ্য।