বিভাগ - বিনোদন

মহানায়ক উত্তম কুমার : উত্থান ও পতনের সোনাঝরা দিনগুলি

প্রকাশিত

বিনোদন ডেস্ক:
১.
বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা নায়ক কে? এই প্রশ্নে বিব্রত হন না, হবেনও না কেউ-ই। সংশয়হীনভাবে, একবাক্যে সবাই বলবেন, সমস্বরে একটিই নাম- উত্তম কুমার। বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহানায়ক’ বললেই যার ছবি চোখে ভেসে ওঠে, তিনিই উত্তম কুমার। ১৯৮০ সালের আজকের দিনে, ২৪ জুলাই অজস্র ভক্তকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নেন এই মহানায়ক। প্রিয় মহানায়ক উত্তম কুমারের মহাপ্রয়াণের তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। উল্লেখ্য যে, তাঁর জন্ম কলকাতায়, ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। তাঁর সেই ভুবন মোহন হাসি, অকৃত্রিম রোমান্টিক চোখের দৃষ্টি আর অতুলনীয় অভিনয়ের গুণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও বাঙালি দর্শকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় আজও তিনিই মহানায়ক।

১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে শুরু আর ১৯৮০ সালে এসে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবিতে অভিনয় করার সময় জীবনাবসান। মাত্র ৫৪ বছরের ক্ষণজন্মা কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমার চলচ্চিত্র শিল্পকে সেবা দিয়েছেন ৩২ বছর। তবুও অতৃপ্তি মেটে না। মিটবে কী করে? উত্তম কুমারের মতোন বিরল শিল্পীর জন্ম তো আর বারবার হয় না, হবেও না কোনোদিন। তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া ছিল বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের এক আলোকবর্তিকার মৃত্যু। তিন তিনবার ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেতা সম্পর্কে যতই বলা হোক না কেন তারপরও অতৃপ্তি যেন থেকেই যায়। মৃত্যুর এতো বছর পরও অসাধারণ জনপ্রিয় এই তারকার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাঁর অভিনয় প্রতিভার আলোয় আজো আমরা শিহরিত হই, আলোড়িত হই। হঠাৎ-হঠাৎ ক্যামেরার প্রতি ঘুরে এক ভুবনমোহিনী হাসি বা চিত্তহরা চাহনির উত্তম কুমারকে ভুলে থাকা কোন নারী-পুরুষের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব।

২.
বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেতা, চিত্রপ্রযোজক এবং পরিচালক উত্তম কুমারের (ইংরেজি: Uttam Kumar) (জন্ম: সেপ্টেম্বর ৩, ১৯২৬ – মৃত্যু: জুলাই ২৪, ১৯৮০) প্রকৃত নাম অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তাঁকেই একমাত্র ‘মহানায়ক’ উপাধি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্রে অভিনয় ছাড়াও তিনি সফলভাবে মঞ্চেও অভিনয় করেছিলেন। কলকাতার পোর্টে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারেননি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা পেতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। নানা পুরস্কার আর সম্মাননার পরও ব্যক্তি উত্তম ছিলেন একবারেই সাধারণ মানুষ। দুস্থ শিল্পীদের কল্যাণে নিজে তৈরি করেছিলেন আর্থিক ফান্ড। দু’হাতে দান করেছেন মানুষকে। বাংলাদেশের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল ছিলেন উত্তম কুমার। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গোপনে অর্থ সাহায্য করেছিলেন। সেজন্য অবশ্য তাকে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। নকশাল ছেলেরা গিয়ে তাকে ধমকে এসেছিল। তাদের আচরণে কষ্ট পেয়েছিলেন অনেক। ফলে মাস কয়েকের জন্য মুম্বাই চলে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর আবার ফিরে আসেন কলকাতায়।

৩.
কিংবদন্তি ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেতা, চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক উত্তম কুমার কলকাতার ৫১নং আজিরী টোলা স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদু আদর করে ডাকতেন উত্তম। তবে আসল নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। তার বাবার নাম সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়, মা চপলা দেবী। অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে কাটে উত্তমের ছেলেবেলা। কিন্তু যার জন্মই হয়েছে আকাশছোঁয়ার জন্য দারিদ্র্য পারেনি তাকে দমিয়ে রাখতে। অভিনয় জগতে আসার পেছনে তার পরিবারের প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃতিমনা উত্তমের বাপ-চাচারা পাড়া-প্রতিবেশীর সহায়তায় গড়ে তুলেছিলেন ‘সুহৃদ সমাজ।’

বিভিন্ন উৎসবে সুহৃদ সমাজ থেকে যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো। বাপ-চাচাদের যাত্রাপালায় অভিনয় দেখে উত্তমের অভিনয়ের খায়েশ জাগে আর তার জের ধরেই স্কুলে থাকতেই উত্তম কুমার তার মহল্লায় নাট্যসংগঠন লুনার ক্লাবে জড়িয়ে পড়েন আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুকুট’ নাটিকায় অভিনয় দিয়ে শুরু হয় মহানায়কের অভিনয় জীবন। তাঁর মাথায় চেপে বসল সিনেমার ভূত। যে করেই হোক সিনেমায় অ্যাক্টিং করতে হবে। তখনকার দিনে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সঙ্গে গান জানা অপরিহার্য ছিল। তাই তৎকালীন অনেক নামি-দামি শিল্পী যেমন-কানন দেবী, অমিতবরণ, রবীন মজুমদার, পাহাড়ী স্যান্নাল, কুন্দন লাল সায়গল সবাই গান জানতেন। উত্তম কুমার তাই গান শিখতে কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত শিক্ষক নিদান ব্যানার্জির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

৪.
সংসারে অভাব থাকায় ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি দিনে পোর্ট কমিশনার্স অফিসের ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে চাকরি নেন আর রাতে ভর্তি হন ডাল হৌসির গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে। নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি ১৯৪৫ সালে বিকম পাস করেন। একদিন তিনি গেলেন ভারত লক্ষ্মী স্টুডিওতে। সেখানে ভোলানাথ আর্য্য ‘মায়াডোর’ নামে একটি হিন্দি ছবি প্রযোজনা করছেন। প্রথমে দারোয়ান ঢুকতে না দিলেও অনেক অনুনয়ের পর পূর্ব পরিচিত নাট্যজন গণেশ বাবুর পরিচয় দিয়ে প্রযোজকের সামনে হাজির হলেন। প্রযোজক অনেক দেখে-শুনে তাকে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিলেন। নতুন বরের মার খাবার দৃশ্যে উত্তমের অভিনয় ছিল খুবই সাবলীল। এভাবে সহশিল্পীর মর্যাদা নিয়ে মহানায়ক উত্তম কুমার চলচ্চিত্রাঙ্গনে পা রাখেন। পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দৈনিক একটাকা চার আনা করে সম্মানী পান। কিন্তু তার প্রথম অভিনীত ছবি পরবর্তীতে আর মুক্তি পায়নি। ১৯৪৮ সালে মাত্র সাতাশ টাকা পারিশ্রমিকে নীতিন বসুর ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে উত্তম কুমার নায়কের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেন। এটিই তার অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি। কিন্তু তার অভিনীত প্রথম দিকের ছবিগুলো চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

৫.
১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন তিনি গৌরীদেবীকে প্রেম করে বিয়ে করেন। এই বৎসরেই তিনি খণ্ডকালীন পিএম প্রোডাকশনে ৪০০ রুপি মাসিক বেতনে অভিনেতার চাকরি করেন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ সেপ্টেম্বর তাঁর পুত্র গৌতমের জন্ম হয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর অভিনীত ‘বসু পরিবার’ মুক্তি পায়। উত্তম ততদিনে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নাম লেখালেও পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হননি। তার ভাগ্য খুলে দেয় ‘বসু পরিবার’ ছবিটি। ছবিটি ব্যবসাসফল হওয়ার পাশাপাশি দর্শক-সমালোচক-মিডিয়া মুখরিত হয় তার প্রশংসায়। প্রচুর কাজের প্রস্তাব পেতে থাকেন তিনি। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর অভিনেতা বনে যান। এমপি প্রোডাকশনের হাসির ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর মধ্য দিয়ে উত্তম-সুচিত্রা প্রথম জুটি বাঁধলেন। পরবর্তীতে উত্তম সুচিত্রা জুটি বাংলা ছবির সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করল। অগ্নিপরীক্ষা ছবি মুক্তির পর প্রমাণিত হলো বাংলা ছবির অপ্রতিদ্বন্দ্বী জুটি উত্তম-সুচিত্রা। উল্লেখ করা প্রয়োজন, চাকরি ছেড়ে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পে নিজের ভাগ্য গড়তে চাইলে গৌরীর দাদা উত্তমকে গাড়ি চালানো শিখতে বলেছিলেন। কারণ, তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন, উত্তমের তারকা হওয়ার স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না। স্বপ্নভঙ্গ ঘটলে কিছু একটা করে স্ত্রীকে যাতে খাওয়াতে-পরাতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই উত্তমকে গাড়ি চালানো শিখতে বলেছিলেন গৌরীর দাদা।

শুরুর দিকে উত্তম অভিনীত একের পর এক ছবি ফ্লপ করতে থাকে। এ জন্য অনেকে তাঁর নাম দেন ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’। কোনো ছবির পোস্টারেই ঠাঁই পেত না উত্তমের নাম। পাঁচ বছর সংগ্রামের পর শেষ পর্যন্ত তাঁর অভিনীত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিটি ব্যবসাসফল হয়। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে তাঁর সঙ্গে জুটি হয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। তারকা খ্যাতি পাওয়ার পর স্ত্রী গৌরীকে গাড়ি কিনে দেন উত্তম। তখন গৌরীর দাদা বলেছিলেন, গাড়ির চেয়ে বাড়ি উপহার দিলেই ভালো হতো। পরবর্তী সময়ে একে একে সাফল্যের সিঁড়ি ডিঙিয়ে খ্যাতির চূড়া স্পর্শ করেন একসময়ের ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ উত্তমকুমার। অসাধারণ অভিনয়-নৈপুণ্য দিয়ে অন্যতম সেরা অভিনেতা হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নাম লেখান ‘মহানায়ক’ উত্তম।

৬.
অভিনয় পাগল উত্তম কুমার চলচ্চিত্রের সঙ্গে সঙ্গে সমান তালে মঞ্চেও কাজ করে যান। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্টার থিয়েটারে একনাগাড়ে ‘শ্যামলী’ নাটকের ৪৮৬টি প্রদর্শনীতে অভিনয় করেন। এই বৎসরেই মুক্তি পায় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ নামক ছবি। এই ছবিতে তিনি প্রথম সুচিত্রা সেন-এর বিপরীতে অভিনয় করেন। এই ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সফল উত্তম-সুচিত্রা জুটির সূত্রপাত হয়।১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রথম প্লেব্যাক করেন ‘নবজন্ম’ ছবিতে। ১৯৫৬ সালে উত্তম কুমার অভিনেতা থেকে প্রযোজক হয়ে ‘হারানো সুর’ চলচ্চিত্রটি উপহার দেন। রাষ্ট্রপতি ‘সার্টিফিকেট অব মেরিট’ সম্মান পায় ছবিটি। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র তিনি পরিচালনাও করেছেন। গুটিকয়েক হিন্দি ছবিতেও কাজ করেছেন তিনি।

৭.
চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সূত্রে উত্তম কুমারের সাথে সুপ্রিয়াদেবীর ঘনিষ্টতা শুরু হয়। সুপ্রিয়া দেবী ও সুচিত্রা সেনের সাথে গভীর সম্পর্কের কারণে তাঁর তাঁর দাম্পত্য জীবনে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। এক সময় উত্তম কুমারের সাথে গৌরীদেবীর বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৬২ সালে স্ত্রীর সঙ্গে উত্তমের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ততদিনে মিডিয়ায় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি কারো অজানা নয়। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিয়াদেবীকে বিবাহ করেন। এরপর আমৃত্যু তিনি সুপ্রিয়াদেবীর সাথে কাটান। এই বিয়ের আগে উত্তম ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত ছবি ‘শুধু একটি বছর’। এই বৎসরে মুক্তি প্রাপ্ত ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

৮.
বাংলা সিনেমার আরেক কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যও তিনি জাতীয় পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি নিউইয়র্ক, বার্লিন চলচ্চিত্র প্রভৃতি সম্মানজনক চলচ্চিত্র উৎসবের অতিথির সম্মানও অর্জন করেছিলেন।

৯.
১৯৮০ সালের জুলাইতে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ সিনেমার সেটে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত বেলভিউ হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। কিন্তু সবাইকে কাঁদিয়ে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন এই গুণী অভিনেতা। তবে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে ব্যক্তি উত্তম কুমার বিদায় নিলেও সেলুলয়েডের উত্তম কুমার বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়ে। বাংলার মহানায়কের প্রতি জানাই আবারো বিনম্র শ্রদ্ধা।

১০.
বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহানায়ক’খ্যাত উত্তমকুমারের লেখা আত্মজীবনীমূলক বই ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’। অভিনেতা হিসেবে সংগ্রামের পাশাপাশি উত্তমকুমারের ব্যক্তিজীবনের নানা অজানা অধ্যায় ঠাঁই পেয়েছে বইটিতে। আরও ঠাঁই পেয়েছে উত্তম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরল ছবি। উত্তম তাঁর এ লেখায় বলেছেন, ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে গৌরী দেবীর সঙ্গে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে উত্তমকুমারের প্রেম ও বিয়ের গল্প। গৌরীকে বিয়ে করার জন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তমের বচসার বিষয়টিও জানা যাবে এ বইয়ে। ১৯৬২ সালে নিজের সংসার ছেড়ে সহ-অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বসবাস শুরু করেছিলেন উত্তম। ১৯৮০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সুপ্রিয়ার সঙ্গেই থেকেছেন। কিন্তু আত্মজীবনীতে সুপ্রিয়াকে স্রেফ একজন সহকর্মী হিসেবেই উল্লেখ করেছেন তিনি।

বইটির প্রকাশনা সংস্থা সপ্তর্ষি প্রকাশনের একজন মুখপাত্র জানান, ১৯৬৪ সালে জনপ্রিয় একটি বাংলা সাময়িকীতে ধারাবাহিকভাবে আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছিলেন উত্তমকুমার। কিন্তু কাজটি তিনি পুরোপুরি শেষ করতে পারেননি। উত্তমের মৃত্যুর পর তাঁর লেখা আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি চুরি হয়ে যায়। ওই মুখপাত্র আরও জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে চন্দন নগরের একটি গ্রন্থাগারে পাণ্ডুলিপিটির কিছু অংশ খুঁজে পান অভিক চট্টোপাধ্যায়। আরও কিছু অংশ পাওয়া যায় একজন ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের কাছে। যে সাময়িকীতে উত্তমের আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছিল, সেটির পুরোনো সংখ্যা খুঁজে বের করা হয় জাতীয় গ্রন্থাগারের সহায়তায়। সব লেখা একত্র করে ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর’ বইটি সম্পাদনা করেছেন অভীক। নিঃসন্দেহে এটি সবার কাছে দুর্লভ একটি বই হিসেবে বিবেচিত হবে।

১১.
বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে এখনো শ্রেষ্ঠ জুটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একসময় কলকাতার চলচ্চিত্র পাড়ায় উত্তম-সুচিত্রা জুটি ছাড়া সে সময় কোনো ছবি ‘হিট’ হবে, এটা ভাবা নির্মাতারা ভাবতে পারতেন না। এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ভাবতে শুরু করে, চলচ্চিত্রের মতো বাস্তবেও হয়তো তারা একই সম্পর্ক ধারণ করেন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি পোস্টার ঝড় তোলে উত্তম-সুচিত্রার সংসার জীবনে। সুচিত্রার সই দেয়া ওই পোস্টারে লেখা ছিল ‘আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হলো অগ্নিপরীক্ষা’। ভারতীয় পত্রিকাগুলোর খবর, সেই পোস্টার দেখে উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরিদেবী ভেঙে পড়েন। অন্যদিকে সুচিত্রাকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন স্বামী দিবানাথ এবং অভিনয় ছেড়ে দিতেও চাপ দেন। কিন্তু অন্তত ১০টি ছবিতে এই জুটি চুক্তিবদ্ধ ছিলেন বলে, অভিনয় ছাড়া সম্ভব হয় নি।

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে উত্তম কুমার তাঁর প্রযোজিত ‘হারানো সুর’ ছবিতে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দিলে সুচিত্রা সেন বলেছিলেন, ‘তোমার জন্য সব ছবির ডেট ক্যান্সেল করব’। একদিন সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জের বাসায় এক পার্টিতে দিবানাথের আক্রমণের মুখেও পড়তে হয় উত্তমকে। এরপর থেকেই দিবানাথের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে সুচিত্রার। এক সময় শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুরে। তাঁর অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর আকস্মিকভাবেই চলে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে। এরপর প্রথম সুচিত্রা সেন আড়াল ছেড়ে বাইরে আসেন উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর। মাঝরাত পর্যন্ত বসে ছিলেন তাঁর মরদেহের পাশে। উত্তম কুমার ৩১টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেনের বিপরীতে।

১২.
মহানায়ক উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করে বিভিন্ন অভিনেতার মতামত পাঠ করা যেতে পারে। বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতা, ‘বাংলার রবার্ট ব্রুস’খ্যাত মহানায়ক উত্তম কুমার সম্পর্কে বিখ্যাত ব্যক্তিদের কিছু উক্তির মধ্য দিয়েই তাঁকে সুষ্পষ্টভাবে চেনার, জানার চেষ্টা করা যাক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার, অপরাজিত, গণশত্রু ইত্যাদি বিখ্যাত ছবির নায়ক। তাকে কলকাতার ফিল্ম সোসাইটি চর্চা করা যুবকরা উত্তমের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে পছন্দ করত। তাঁর মতে, “অনেকেই ভাবেন, আমি উত্তম কুমারের অভিনয়ের তীক্ষ্ম সমালোচক। ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। ওঁর মতো বড় মাপের অভিনেতা আমি জীবনে খুব কম দেখেছি। আমি ওঁর অভিনয়ের ভক্ত, গুণমুগ্ধ। আসলে কিছু ছবিতে ইমেজ সর্বস্ব অভিনয় দেখে এই ভেবে ব্যথা পেয়েছি, এই হ্যাংওভারটা কাটিয়ে উঠতে পারলে ওঁর অভিনয়ের মাত্রা কোন্ জায়গায় গিয়ে পৌঁছাত। দুঃখটা পেয়েছি একজন গুণমুগ্ধ হিসেবেই। সমালোচনা করেছি উত্তম কুমারের অভিনয়ের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা আছে বলেই।”

পদ্মা নদীর মাঝি, পার, অন্তর্জলী যাত্রা ইত্যাদি ছবির পরিচালক গৌতম ঘোষ বলেন, “গৌরীশঙ্কর ও শঙ্কর সিং এই দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার। উত্তম যে কতটা শক্তিমান অভিনেতা ‘ঝিন্দের বন্দী’ দেখেই আমি উপলব্ধি করতে পারি।” হিন্দি ও বাংলা ছবি নায়িকা তনুজা। তার কন্যা কাজলও হিন্দী ছবির নায়িকা। তনুজার মতে, “শিল্পীদের মধ্যেই এমন কেউ কেউ থাকেন যাঁরা অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রেরণা হয়ে থাকেন। যাদের মধ্যে কাউকে দেখে সাহস পাওয়া যায়। এক কথায় শিল্পীদের শিল্পী। উত্তম কুমার ছিলেন তাঁদের একজন।” হিন্দি ও বাংলা ছবির চলচ্চিত্র শক্তিমান পরিচালক শক্তি সামন্ত। উত্তমকুমারের জন্যেই তিনি ‘অমানুষ’ ছবিটি তৈরি করেছিলেন বাংলায়।

তাঁর ভাষ্যমতে, “সংলাপ বলার নিজস্ব কায়দা ছিল উত্তমবাবুর। শঙ্কর সিং আর গৌরীশঙ্কর ডাবল রোলে, বিশেষ করে গৌরীশঙ্করের ভূমিকায় যেখানে এক শহুরে যুবাকে সাজতে হচ্ছে রাজ কুমার, উত্তম এককথায় অতুলনীয়। একজন মদ্যপ, নারীবিলাসী অথচ সাদাসিধে, আরেকজন বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত। এ কিন্তু মোটেই সহজ কাজ নয়। উত্তম কতটা বড় অভিনেতা ছিলেন প্রতিভার বিচারে, তা মাপার চেয়ে আমার মনে হয় আজকের দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই যে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান অভিনেতা। অ্যাক্টিং ছিল তাঁর কাছে ইষ্টদেবতার মতো, ফুল-বেল-পাতা-চন্দন ঠিকঠাক সাজিয়ে গুছিয়ে মন এক জায়গায় স্থির রেখে অভিনয় করতেন তিনি। যখন উত্তম দাঁড়াতেন ক্যামেরার সামনে, বাইরের পৃথিবীর সুখ-দুঃখ যেন স্পর্শ করত না তাঁকে।” সুচিত্রা সেন, উত্তমের অসংখ্য হিট ছবির জুটির মহানায়িকা। প্রায় হাহাকার করে তিনি বলেন, “উত্তম আমার বন্ধু। এক কথায় গ্রেট, গ্রেট আর্টিস্ট। তবু যেন মনে হয় ওকে ঠিকমতো এক্সপ্লয়েট করা হয়নি।”

১৩.
উত্তম কুমারের প্রায় ৩২ বছরের চলচ্চিত্রজীবনে সর্বসাকুল্যে ছবির সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। তার মধ্যে থেকে নির্বাচন করা আমার প্রিয় কয়েকটির সামান্য পরিচয় দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। সাড়ে চুয়াত্তর : পুরুষদের মেস অন্নপূর্ণা বোর্ডিংয়ে একদিন হঠাৎ এসে উঠে রমলা (সুচিত্রা সেন)। শুরু হয় তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিচিত্র চরিত্রদের বিচিত্র চেষ্টা। একজনের সঙ্গে (উত্তম কুমার) রমলার প্রেমও হয়ে যায়।একটি রাত : পিতৃবন্ধুর আমন্ত্রণে সস্ত্রীক শিকারে যাচ্ছিল সুশোভন (উত্তম কুমার)। স্টেশনে পুরনো বান্ধবী সান্ত্বনার (সুচিত্রা সেন) সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। গল্প করতে করতে হঠাৎ অনিতাকে নিয়ে ট্রেন ছেড়ে দেয়। সান্ত্বনাকে নিয়ে মোটরে রওনা হয় সুশোভন। অনিতাও পরের স্টেশনে নেমে বাড়ি ফিরে এসে শোনে সান্ত্বনাকে নিয়ে রওনা হয়ে গেছে সুশোভন। অনিতাও বেড়িয়ে পড়ে। পথে ঘটতে থাকে একের পর এক মজার ঘটনা।

হারানো সুর : স্মৃতিভ্রষ্ট অলকের (উত্তম কুমার) প্রেমে পড়ে যায় ডাক্তার রমা (সুচিত্রা সেন)। অলককে সুস্থ করে তুলতে তাকে বিয়ে করে রমা। এক দুর্ঘটনায় আবার স্মৃতি ফিরে পায় অলক। ভুলে যায় রমার কথা। বাড়িতে ফিরে যায় অলক। সেই বাড়িতেই চাকরি নেয় রমা। অলক তাকে চিনতে পারে না। তবু কেন মনে ফিরে ফিরে আসে এক চেনা সুর। শুন বরনারী : যূথিকাকে (সুপ্রিয়া দেবী) জরুরি প্রয়োজনে পাটনা যেতে হবে। কে নিয়ে যাবে? কেন হিমু (উত্তম কুমার)। ওটাই তো ওর কাজ। দীর্ঘ যাত্রাপথে হিমুকে কেবলই সন্দেহ করে যূথিকা; কিন্তু মিথ্যা প্রমাণিত হয় সব সন্দেহ। নানা উপলক্ষে আরো কয়েকবার যূথিকাকে নিয়ে ট্রেনে যাতায়াত করে হিমু। জন্ম নেয় প্রেম। সপ্তপদী : হিন্দু কৃষ্ণেন্দুকে (উত্তম কুমার) নিয়ে সুখের সংসার গড়ে তুলতে চেয়েছিল খ্রিষ্টান রিনা ব্রাউন (সচিত্রা সেন)। কিন্তু এই সম্পর্ককে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি কৃষ্ণেন্দুর গোঁড়া বাবা। দূরে চলে যায় রিনা। অনেক দিন পর বিপন্ন এক মুহূর্তে আবার তাদের দেখা হয়। মৃত বাবার নিষেধের বাধা ডিঙিয়ে এবার কি মিলিত হতে পারবে তারা।

জতুগৃহ : এক অখ্যাত স্টেশনের ততোধিক অকিঞ্চিৎকর এক ওয়েটিংরুমে প্রাক্তন স্ত্রী মাধুরীর (অরুন্ধতী দেবী) সঙ্গে শতদলের (উত্তম কুমার) দেখা হয়ে যায়। মনে মনে আবার একবার নিজেদের যৌথ জীবনটাকে পেছন ফিরে দেখে তারা। দেখে এত কিছুর পরও এখনো কোথায় যেন পরস্পরের জন্য মায়া রয়ে গেছে। নায়ক : মধ্যবিত্ত ঘরের অভিনয়-পাগল যুবক অরিন্দম (উত্তম কুমার)। ছবিতে নেমে তরতরিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে যায়। তার মনে দেখা দিতে থাকে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব, মূল্যবোধে আসে পরিবর্তন। চিড়িয়াখানা : সমাজ পরিত্যক্ত মানুষের ‘গোলাপ-কলোনি’ গড়ে তুলেছেন নিশানাথ সেন। কে বা কারা নিশানাথ সেনের শোবার ঘরে মোটর পার্টস রেখে যেতে থাকে রাতের পর রাত। তা ছাড়া নিশানাথ বুঝতে পারেন কলোনিতে ছদ্মবেশে আশ্রয় নিয়েছে চিত্রাভিনেত্রী সুনয়না দেবী। গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বকসীর (উত্তম কুমার) শরণাপন্ন হন বিচলিত নিশানাথ। তারপর নিজেই খুন হয়ে যান নিশানাথ। গৃহদাহ : ব্রাহ্ম মেয়ে অচলার (সুচিত্রা সেন) হাত থেকে বন্ধু মহিমকে (উত্তম কুমার) বাঁচাতে এসে উল্টো নিজেই তার প্রেমে পড়ে যায় সুরেশ। কিন্তু মহিমকেই বিয়ে করে গ্রামে চলে যায় অচলা। সামান্য ঘটনায় তাদের সম্পর্কে চির ধরে। সুযোগটি নেয় সুরেশ। অচলাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে কলকাতায়। শুরু ত্রিকোণ টানাপড়েন। কমললতা : মুরারিপুর আখড়ায় ছেলেবেলার বন্ধু গহরকে খুঁজতে গিয়েই বৈষ্ণবী কমললতার (সুচিত্রা সেন) সঙ্গে শ্রীকান্তর (উত্তম কুমার) পরিচয়। আখড়ায় আতিথ্য নিল শ্রীকান্ত। ভবঘুরে এই মানুষটিকে অন্য চোখে দেখে কমল। কিন্তু শ্রীকান্ত কিছুতেই ধরা দিতে চায় না। যদিও বাদ পড়ে গেল প্রিয় কয়েকটি ‘অগ্নিশ্বর’, ‘যদুবংশ’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘থানা থেকে আসছি’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘রাইকমল’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘শেষ অঙ্ক’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘কায়াহীনের কাহিনী’, ‘রাতের রজনীগন্ধা’র মতো ছবি।

১৪.
চিরকালের জুটি উত্তম-সুচিত্রা বিষয়ে আরো কিছু জানা যাক। আমরা জানি, উত্তম-সুচিত্রা জুটির জন্ম দিয়েছিল যে ছবি, সেই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ সুচিত্রা সেনের কাজ করারই কথা ছিল না। রমলা চরিত্রের জন্য আগে থেকেই মালা সিনহাকে ঠিক করে রেখেছিলেন পরিচালক নির্মল দে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান মালা সিনহা। তাড়াহুড়োয় প্রতিষ্ঠিত কাউকে না পেয়ে শেষে উঠতি নায়িকা সুচিত্রাকেই নিতে বাধ্য হলেন নির্মল দে। ইন্ডাস্ট্রিতে তখন একেবারেই নতুন মুখ এই সুচিত্রা সেন; ঝুলিতে মাত্র দুটি ছবি, যার প্রথমটি মুক্তিই পায়নি। ছবির সংখ্যার বিচারে উত্তমকুমারের অবস্থা সুচিত্রার চেয়ে ভালো, তবে জনপ্রিয়তার বিচারে খুবই সঙ্গীন। তখন পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া ৯টি ছবির আটটিই সুপার-ডুপার ফ্লপ, একটির কাজ শেষই হয়নি, হিট মোটে একটি ছবি। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে টিকবেন কি না তার অনেকটাই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে ভরসার জায়গাও ছিল_তখন পর্যন্ত উত্তমকুমারের একমাত্র হিট ছবি ‘বসু পরিবার’-এরও পরিচালক ছিলেন এই নির্মল দে। আর ছিলেন তুলসী চক্রবর্তী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, মলিনা দেবীর মতো অভিনেত্রী। ১৯৫৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। জন্ম নিল বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সফল ও স্থায়ী এক জুটি।

পূর্ববর্তী ছবিগুলোর ব্যর্থতার দায় আমার না_নানাজনের কাছে বলা উত্তমকুমারের এই দাবির সত্যতাও প্রমাণ করল এ ছবির সাফল্য। উত্তমকুমার বরাবরই বলে আসছিলেন, নতুন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নায়িকাও আনতে হবে নতুন। কিন্তু তাঁর বিপরীতে দেওয়া হচ্ছিল সন্ধ্যারানী প্রমুখ চলি্লশের দশকের নায়িকা। ফলে দর্শক ছবি নিচ্ছিল না। আসলেই সাড়ে চুয়াত্তর-এ নতুন নায়িকা সুচিত্রা সেনকে লুফে নিল দর্শক। তবে উত্তম-সুচিত্রার যে সিরিয়াস রোমান্টিক রূপ সাধারণ দর্শক সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হলো আরো দেড় বছর ও চারটি ছবি। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পেল ‘অগি্নপরীক্ষা’। জনপ্রিয়তার সব রেকর্ড ভেঙে দিল উত্তম-সুচিত্রার এই ছবি। তারপর আর পেছন ফিরে তাকায়নি এ জুটি। এক অনন্ত পথে যাত্রা করলেন তাঁরা। ‘সপ্তপদী’র সেই বিখ্যাত গানের মতোই মনে হচ্ছিল আসলেই বুঝি কোনোদিন শেষ হবে না এই পথ। তবে সব ভালোরই শেষ আছে, নইলে ভালো যে আর ভালো থাকে না। ‘৫৩-তে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘৭৫-এ ‘প্রিয় বান্ধবী’র মাধ্যমে তা শেষ হলো। পরে হয়তো আবার শুরু হতে পারত এ যাত্রা। কিন্তু তার আগেই চিরতরে বিদায় নিলেন উত্তম, অন্তরালে চলে গেলেন সুচিত্রা। ২২ বছরে মুক্তি পেয়েছে এ জুটির ২৯টি ছবি। তার মধ্যে আছে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘একটি রাত’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘গৃহদাহ’, ‘কমললতা’র মতো ছবি।

১৫.
‘নায়ক’ উত্তমকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় লিখেছেন, ‘পর্দায় উত্তমকুমারকে যখন প্রথম দেখি, তখনো আমি চলচ্চিত্রকার হইনি। একজন নতুন নায়কের আবির্ভাবের কথা শুনলাম। তিনি কেমন অভিনয় করেন, জানার আগ্রহ হলো। বাংলা সিনেমায় তখন যেসব হিরোকে দেখা যেত_দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথেশ বড়ুয়া, কুন্দনলাল সায়গল, ধীরাজ ভট্টাচার্য প্রমুখের সঙ্গে প্রিয় হলিউড তারকাদের কোনো ধরনের তুলনাই টানা যেত না। পরপর উত্তমের তিনটি ছবি দেখলাম, সবটিরই নির্মাতা আমাদের সফলতম পরিচালকদের একজন, নির্মল দে। প্রথম অনুভূতি অবশ্যই ভালো। দেখতে সুদর্শন, নজরকাড়া উপস্থিতি, চলনবলনে স্বাচ্ছন্দ্য আছে, আর অভিনয়েও কোনো থিয়েটারিপনা নেই। তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এল অনেক পরে। তত দিনে অনেকটা লিজেন্ড হয়ে গেছে উত্তমকুমার। প্রতি দুটি বাংলা ছবির একটিতে তিনি আছেন, অধিকাংশেই তাঁর জুটি সুচিত্রা সেন। এই এক রোমান্টিক জুটি, স্থায়িত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার বিচারে যার তুলনা পৃথিবীতে অল্পই আছে। খাঁটি হলিউডি অর্থেই উত্তম একজন তারকা।

প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি একজন অভিনেতাও? এটি একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। অন্তত হলিউডের একজন অভিনেতার কথা জানি, অভিনয়ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু প্রথম ছবি মুক্তির পর পাওয়া ভক্তদের চিঠির জোরে যে তারকা বনে গেছে। তিনি গ্রেগরি পেক। আমাকে বলা হয়েছে, আজও তাঁকে অভিনয় দেখিয়ে দিতে হয়। অথচ উত্তম, ভালোমন্দ নির্বিশেষে যেকোনো পার্টেই এমন একটা দ্যুতি ছড়ান, পেকের কাছ থেকে যেটা কখনোই পাওয়া যায় না। উত্তমের সঙ্গে কাজ করার জন্য আমি ব্যাগ্র ছিলাম। তাঁকে মাথায় রেখেই একটা চরিত্র খাড়া করি। সাধারণ মধ্যবিত্ত এক তরুণ, যে সিনেমায় সুযোগ পায় এবং তরতর করে শীর্ষে পৌঁছে যায়। সত্যি বলতে কী, এটা গরিবপুত্তুর থেকে রাজপুত্তুর বনে যাওয়ার গল্প, যার সঙ্গে উত্তমের নিজের জীবনেরও কিছু মিল আছে। এমন একটা পার্ট, আমার মনে হয়েছিল, যার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাবেন উত্তম। উত্তম চরিত্রটাকে পছন্দ করেছিল। আর কিছু সময়ের জন্য হলেও তার গ্ল্যামারবয় ইমেজে ছায়া ফেললেও চরিত্রটা করতে রাজি হয়েছিল। আর সদ্য হওয়া জলবসন্ত তার মুখে চিহ্ন রেখে যাওয়া সত্ত্বের মেকআপ ছাড়াই কাজ করতে রাজি হয়েছিল।

বলতেই হবে, উত্তমের সঙ্গে কাজ আমার চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। শুরুর দিকেই টের পেলাম, সে সহজাত অভিনেতা। বুদ্ধিবাদী অভিনেতাদের সঙ্গেও কাজ করেছি। এরা চরিত্রটার ভেতরে ঢুকে পড়ার জন্য চরিত্রটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলে, নেপথ্যের কারণগুলো সম্পর্কে খোঁজ করে, বুঝতে চায় চরিত্রটির উদ্দেশ্য। তবে এত কিছু করার পরও বুদ্ধিবাদীরা যে সহজাত অভিনেতাদের চেয়ে ভালো করবে, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তাঁর করা চরিত্রের বিষয়ে উত্তমের সঙ্গে গভীর বিশ্লেষণাত্মক পর্যায়ের কোনো আলোচনা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। তার পরও ছোট ছোট অপ্রত্যাশিত সব ডিটেইল আর আচরণ দিয়ে সে আমাকে প্রায়ই বিস্মিত ও আনন্দিত করেছে। এগুলোর কোনোটাই আমার দেওয়া না, সবই উত্তমের উদ্ভাবন, আর সবই চরিত্রের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ও সব সময় দৃশ্যটিকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। এগুলো ছিল এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত যে মনে হতো এইমাত্র আস্তিন থেকে এগুলোকে বের করল উত্তম। আর যদি চিন্তাভাবনা করেও থাকে, কখনো এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলেনি ও।

যত দূর জানি, আড়াই শর মতো ছবিতে কাজ করেছে উত্তম। সন্দেহ নেই, এর মধ্যে দুই শর বেশি ছবির কথা লোকে ভুলে যাবে, যদি না ইতিমধ্যে ভুলে গিয়ে না থাকে। যোগ্য লেখক ও পরিচালকের সংখ্যাকে যদি ছাড়িয়ে যায় যোগ্য অভিনেতার সংখ্যা, তাহলে এমনটা ঘটতে বাধ্য। এতে শ্রেষ্ঠতম অভিনেতাটিও ধার হারায়। নিজেকে সজীব রাখার মতো ধারাবাহিক পর্যাপ্ত উপাদানের অভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। স্টারদের অবস্থা তো আরো খারাপ। পরিস্থিতির ফাঁদে পড়ে তাঁদের শুধু ইমেজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কাজগুলোই করতে হয়। আর এর মানে হচ্ছে বারবার একই ধরনের কাজ করা। তবে সেরা কাজটি দিয়েই একজন শিল্পীকে বিচার করা উচিত। এই ভিত্তিতে এবং যে ক্ষেত্রে তার প্রতিভা সবচেয়ে বেশি উন্মোচিত হয়েছে, তার ভিত্তিতে বলা যায়, উত্তমের কাজে আছে সৌষ্ঠব, সাবলীলতা, স্বতঃস্ফূর্ততা, আস্থা আর দৃঢ়তার মতো দুর্লভ গুণ। এমন সমন্বয় আনা সহজ নয়। অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমায় কেউ তাঁর স্থান দখল করতে পারবে বলে মনে হয় না।’ (অনুবাদ: জিনাত জাহান, সূত্র : তেহাই, উত্তমকুমার সংখ্যা)

১৬.
মহানায়ক উত্তমকুমারের মজার কিছু তথ্য জানা যাক। ব্যক্তিগত জীবনে লেখক বনফুল ছিলেন উত্তমকুমারের ভায়রা।* ‘ঘরে বাইরে’র সন্দ্বীপ চরিত্রটির জন্য উত্তমকুমারকে নিতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।* উত্তমকুমারের জীবন অবলম্বনে তৈরি হয়েছে তিনটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি : সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’, অজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বপন’ এবং বুদ্ধদেব বসুর ‘পাতাল থেকে আলাপ’।* সুচিত্রা সেন না, নায়িকাদের মধ্যে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি ছবি করেছেন উত্তম, ৩২টি, বিপরীতে সুচিত্রার সঙ্গে ২৯টি।* প্রেমিকা ও পরবর্তী সময়ে স্ত্রী সুপ্রিয়ার সঙ্গে উত্তমের প্রথম ছবি ‘বসু পরিবার’-এ তাঁদের সম্পর্ক কী ছিল, জানেন? ভাই-বোন।* ভবানীপুর সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের টানা তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন উত্তমকুমার।

১৭.
মহানায়ক উত্তমকুমার নিজের সাথে নিজেই কথা বলেছেন, দিনলিপি আকারে আপন অনুভূতিকে লিখে রেখেছিলেন। এবার সেই ‘নায়কের কলমে’ থেকে উত্তম ভাষ্য পাঠ করা যাক, ‘‘বৈচিত্র না থাকলে মানুষ বাঁচে না। বৈচিত্র ছিল না বলেই মেরিলিন মনরো আত্মহত্যা করেছে। গ্ল্যামারের একঘেয়েমি থেকে উদ্ধার করে কেউ যদি ওকে বৈচিত্রের সন্ধান দিতে পারত, ও আত্মহত্যা করত না। বেঁচে থাকত। একঘেয়েমি ওর জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে নষ্ট করে দিয়েছিল। তাই ও কোনও দিন বিচার করেনি আকাশ কত উঁচু।’’ বৈচিত্রকে হারিয়ে ফেলার ছটফটানি কতটা যে তাঁকে গলা টিপে ধরত, বলছেন তা’ও!— ‘‘একই টাইপের ছবিতে অভিনয় করতে বাধ্য হচ্ছি আমি আজও। আমার দেবার ক্ষমতারও তো একটা সীমা আছে। আজ বারবার মনে হচ্ছে— তথাকথিত রোমান্টিক শিল্পী হিসেবে আমি নিঃশেষ হয়ে গেছি। ইচ্ছে হয়, ভাল ছবিতে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে প্রাণ দিয়ে অভিনয় করার, কিন্তু সে পরিচালক কই? গল্প কই? সুযোগ কই?’’— ১৯৬০ সালে সাদা কালো অক্ষরে ক্লান্ত, বীতশ্রদ্ধ মহানায়কের এমনই স্বর শোনা গিয়েছিল। মনে মনে ‘মুক্তি’ খুঁজতে চাইছিলেন তখন। এর বছর পাঁচ-ছয় বাদেই সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’। প্রাণ ফিরে পেলেন যেন মহানায়ক!— ‘‘আমি আমাকে এক নতুন ভূমিকায় খুঁজে পেলাম। মুক্তি হল আমার।’’ ‘নায়ক’ অরিন্দমের ‘পাল্স’-এ নিজেকে দেখতে পেয়েছিলেন কি? তাই কি মহাকাঙিক্ষত সেই মুক্তি? লিখছেন, ‘‘মনে হয়েছে অরিন্দমের সুখ আমার সুখ, অরিন্দমের দুঃখ আমার দুঃখ, অরিন্দমের জটিলতায় আমিও ভাবিত। অরিন্দমের সরলতায় কখনও আমিও মুগ্ধ।’’ ‘নায়ক’ তৈরির সময় সত্যজিৎ রায় নাকি শুরুতে বলেছিলেন, ‘‘ওহে উত্তমকুমার, প্রথম সিনটা একটু ছবিবিক ঢঙে অভিনয় করতে হবে।’’ মানে, ছবি বিশ্বাসের মতো। মনে ধরেনি। লিখেছেন, ‘‘ছবিবিক ঢঙে আমি কী অভিনয় করব? ছবিদা ছবিদার মতো অভিনয় করতেন, আমি আমার মতো করব।’’ ইগো? না, তা হয়তো নয়। এক জায়গায় ছবি বিশ্বাসকে নিয়ে তিনি লিখছেন, ‘‘ওই একটা মাত্র লোক স্ক্রিনে থাকলে যেন তাঁর পর্বতপ্রমাণ গাম্ভীর্য আর ব্যক্তিত্বের কাছে আশেপাশের আর সমস্ত কিছু নস্যাৎ হয়ে যেত। … অমনটি ছিল না, আর হবেও না কোনও দিন।’’ তবু ‘নায়ক’-এ ‘ছবিবিক’ হতে চাননি। হোক না একটি মাত্র দৃশ্য, তা’ও না। ‘অরিন্দম’-এর মধ্যে এতটাই নিজের শরীর-মন দেখতে পেয়েছিলেন তিনি!

১৮.
প্রখ্যাত সাংবাদিক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছেন, ‘দেশভাগ থেকে নকশাল আন্দোলনের সময়কাল অবধি ধরলে উত্তমই সব বাঙালি। ধনী, দরিদ্র, সরল, জটিল, ভাল, মন্দ, দূরের, কাছের, জয়ী, পরাস্ত, নায়ক, ভিলেন। … আসলে বাঙালি মেয়েদের কাছে একটা সময় উত্তম বলতে মানে দাঁড়িয়েছিল, ‘কী গো, কেমন আছ?’- চাহনি (সাহেবরা একটু অসভ্য করে বলে কাম হিদর লুক), মজা করে বুক ঠুকে সরস কথা বলা। পুরুষত্ব জাহির করা কণ্ঠস্বর এবং আশ্চর্য গান লিপিং। তা সে হেমন্ত, মান্না, শ্যামল বা কিশোর যাঁরই গান হোক।’

১৯.
‘যদি পেতেন ওঁকে কী করতেন ওঁরা ?’ দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার কাছে বলেছেন একালের জনপ্রিয় অভিনেত্রী, নায়িকাদের কয়েকজন। শোনা যাক তাদের মনোভাব। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বলছেন, ‘ওঁর সঙ্গে ‘ডেটিং’, ‘লং ড্রাইভ’—এ সব কিচ্ছুর দরকার নেই। ওঁর উপস্থিতিতেই প্রেম চলে আসত।
ওঁকে দু’চোখ ভ’রে দেখাই তো অনেক। ওঁর চাউনির মধ্যে একটা গভীর আশ্রয় আছে। বিশ্বস্ততা আছে। যেটা মহিলারা তাদের প্রেমিকের মধ্যে খোঁজে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তো কাজ করেছি আমি। আমার তো মনে হয়, বাঙালি অভিনেতাদের মধ্যে উনি সবচেয়ে সুপুরুষ। আজও ‘তিন ভুবনের পারে’ দেখলে কাত হয়ে যাই।
বাঙালির ‘ইন্টেলেকচুয়াল রোম্যান্স’টা ওঁর মধ্যে দিয়েই বেরিয়ে আসে। কিন্তু উত্তমকুমার হচ্ছেন ‘লাভার বয়’।
অনেক প্রশ্ন জমে আছে ওঁর জন্য। কী অসম্ভব মাপের একজন ‘কমিটেড’ সুপারস্টার! জানতে চাইতাম, এতটা ‘কমিটেড’ হতে গেলে কী কী করতে হয় একজন সুপারস্টারকে?
‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ থেকে ‘নায়ক’ থেকে ‘যদুবংশ’— নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে এক উত্তমকুমার থেকে আরেক উত্তমকুমার হয়ে উঠেছেন। কী ভাবে এটা সম্ভব হল, জানতে চাইতাম।
বেশি বয়সে ‘দুই পৃথিবী’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’-র মতো ছবিতে অভিনয় করতে গেলে একজন অভিনেতাকে কতটা ভেতর থেকে পাল্টে ফেলতে হয়? শিখতাম।
একদিন শুধু গান নিয়ে আড্ডা হত। এমনকী অভিনয়ের পাশাপাশি বাড়িটাকে কী ভাবে সামলেছে, তার টিপস নিতাম। আরেকটা কথা। খুব সঙ্কোচ হচ্ছে বলতে। আমি সুচিত্রা সেনেরও অসম্ভব ফ্যান। তবু…। যদি ‘সপ্তপদী’, ‘মন নিয়ে’, ‘হারানো সুর’-এর মতো ছবিগুলোয় ওঁর রোলগুলো আমি করতে পেতাম!
উত্তমকুমারের চোখে চোখ রেখে সংলাপ বলব ফ্লোরে— উফ্, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে অন্য কোনও পোশাক না পরে শাড়িই পরতাম। আর অল্প সাজ। খুব খেতে ভালবাসতেন, তাই ওঁর পছন্দের খাবার খেতে খেতে আড্ডা দিতাম। ট্রিটটা অবশ্য আমিই দিতাম।

২০.
অভিনেত্রী পাওলি দাম বলছেন, ‘এক দিনের জন্যও ওঁকে পেলে ‘ডেটিং’-এ যেতাম। কোনও দামি গাড়ি নয়। টু-হুইলার। বাইক। না, ‘পথ যদি না শেষ হয়’ হয়তো গাইতাম না। কিন্তু ওই ‘বাইক রাইডিং’টা আমার চাই-ই চাই।
বাইক-এ করে কোলাঘাট ধাবায় ‘লাঞ্চ’। যদি উনি আমারই হাতের রান্না খেতে চাইতেন, তা’ও দিতাম। বাঙালি রান্না, ওঁর পছন্দের। তখন হয়তো আমার বাড়িতে নিয়ে আসতাম। কিন্তু তার আগে, ওই যে বললাম, বাইক-রাইডিং! ওটা যে চাই। হু হু করে রাজারহাট!
প্রচুর আড্ডা দিতাম। ওঁর সঙ্গে গপ্পো করাটা… সে সামনে না থাকলেও যখন-তখন চাইতাম। সময়টা আজকের মতো হলে ‘হোয়াটস্অ্যাপ’-এই সারতাম। উনি হয়তো রাজি হতেন না, কিন্তু আমি ঠিক বুঝিয়ে রাজি করিয়ে নিতাম।
আর একটা ব্যাপার বলতামই বলতাম।—‘‘আপনার এত সুন্দর ঠোঁট। পাগল-করা হাসি। এতেই তো সব্বাই ফ্ল্যাট! আপনি ঠোঁটে একদম লিপস্টিক দেবেন না, প্লিজ!’’
এ রকম একজন পুরুষ, মহিলারা তো সারাক্ষণ ঘিরে থাকবেই। কিন্তু আমার এটা পছন্দ হত না। বলেই দিতাম, ‘‘দেখুন, ছবিতে যা খুশি করুন। নায়িকার সঙ্গে ফ্লার্টও করতে পারেন। কিন্তু ছবির বাইরে আপনি শুধু আমার।’’
ছবির কথা যদি উঠত, তো বলতাম, ‘‘আমার সঙ্গে এক বার ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’-টা করুন না, প্লিজ।’’

২১.
উত্তমের জনপ্রিয় জুটির অন্যতম অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের নাতনি নায়িকা রাইমা সেন বলছেন, ‘ওঁকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতাম। নয়তো আমি ওঁর কাছে যেতাম। তবে দিম্মা (সুচিত্রা সেন) যদি থাকত, আমি ওঁদের দু’জনের দেখা করিয়ে দিতাম। আমার অনেক কথা আছে, ওঁর সঙ্গে। হয়তো চব্বিশ ঘণ্টায় সেটা শেষ হওয়ার নয়। আরও একটা দিন চেয়ে নিতাম। প্রথমে জানতে চাইতাম, এই যে ‘মহানায়ক’ ধারাবাহিকটি হচ্ছে, সেটা ওঁর কেমন লাগছে? আদৌ কি এই ধারাবাহিকের সঙ্গে উনি নিজের জীবনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন?

ওঁর সঙ্গে কোনও ‘ডেটিং’-এর কথা আমি ভাবতেই পারি না। কী করেই বা ভাবব! উনি তো আমার দিম্মার খুব বন্ধু ছিলেন। দিম্মার কাছেই শুনেছি, সেটে এবং সেটের বাইরে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করেই ওঁদের দারুণ সব সময় কেটেছে। সেই সব গল্প ওঁর মুখ থেকে আবার শুনতে চাইতাম। আমি কী করে ওঁর নায়িকা হওয়ার কথা ভাবতে পারি! ছবি যদি করতেই হয়, তা’হলে ওঁর নাতনির চরিত্রে অভিনয় করতে চাই।

বাড়িতে যখন আড্ডা দেব বলছি, তখন আমার মায়ের কথাও জানতে চাইব। কেমন লাগে আমার মাকে ওঁর? অন্য নায়িকারা উত্তমকুমারের জন্য হয়তো আলাদা ‘ইম্পর্ট্যান্স’ দিয়ে সাজবে। আমি কিন্তু জিনস্ আর ক্যাজুয়াল শার্টে দেখা করব। আর অভিনয়ের প্রচুর টিপস্ নেব। ইস্, সত্যিই যদি এমন হত!’

(তথ্যসূত্র : দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দলোক, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, নায়কের কলমে : সম্পাদনা- অভীক চট্টোপাধ্যায়, ইন্টারনেট)

লিখা: সংগৃহিত; লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা