মার্চ মাস বাঙালি জাতির গৌরবের অধ্যায়

প্রকাশিত

এইচ.এম.কাওছার আহমেদ
মার্চ মাস হল বাঙালি জাতির এক গৌরব ও ঐতিহ্যের মাস। শত শত বাঙালি জাতি তাদের আত্ম মর্যাদা ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন প্রিয় মাতৃভূমির জন্যে। অনেক মা-বোন নিষ্য অসহায়ের মতো তাদের জীবন -যাপন অতিবাহিত করেছেন। অনেক নির্যাতন,নির্মম অনূকূলের মধ্যে তাদের জীবন বিষর্নজন দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার জন্য রক্ত জড়িয়েছেন।অনাহার,অত্যাচার,জুলুম সহ্য করেছেন।দীর্ঘ ৯মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম,লড়াইয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১সালের ২৫ শে মার্চ রাতের কালো আধাঁরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাপিয়ে পড়লে একটি জনযুদ্ধের প্রারম্ভ ঘটে।
২৫ শে মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক,বুদ্ধিজীবি,পুলিশ ও ই.পি.আর-কে হত্যা করে এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরস্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতাপ্রাপ্ত দল আ.প্রধান বাঙালিদের তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। শেখ সাহেবকে গ্রেপ্তার করার পরে ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর ওয়ারলেস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন ‘বিগ বার্ড ইন কেজ, স্মল বার্ডস হ্যাভ ফ্লোন’।
মি. খান লিখেছেন, ‘আমি জেনারেল টিক্কা খানের কাছে ওয়ারলেসে জানতে চেয়েছিলাম আপনি কি চান শেখ মুজিবকে আপনার সামনে হাজির করাই? উনি উত্তর দিয়েছিলেন, আমি ওঁর মুখ দেখতে চাই না।”সিদ্দিক সালিক লিখছেন, “ওই রাতে মুজিবের সঙ্গে থাকা সব পুরুষ মানুষদের আমরা গ্রেপ্তার করে এনেছিলাম। পরে চাকরবাকরদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। আদমজী স্কুলে সবাইকে ওই রাতে রাখা হয়েছিল। পরের দিন ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনদিন পরে করাচী নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আমার বন্ধু মেজর বিলালের কাছে জানতে চেয়েছিলাম গ্রেপ্তার করার সময়েই মুজিবকে খতম করে দিলে না কেন? বিলাল বলেছিল জেনারেল টিক্কা খান ব্যক্তিগতভাবে ওকে বলেছিলেন যে কোনও উপায়ে শেখ মুজিবকে জীবিত গ্রেপ্তার করতে হবে।” ওই রাতেই এক পাকিস্তানি সেনা ক্যাপ্টেন ওয়ারলেসে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল আর জগন্নাথ হল থেকে কড়া প্রতিরোধ আসছে।
সিদ্দিক সালিক লিখছেন, “এক সিনিয়র স্টাফ অফিসার আমার হাত থেকে ওয়ারলেস সেটটা কেড়ে নিয়ে জানিয়েছিলেন ওদের শেষ করতে তোমার আর কত সময় লাগবে? চার ঘণ্টা! .. যত্তসব.. তোমার কাছে কী অস্ত্র আছে? রকেট লঞ্চার. রিকয়েলস গান. মর্টার.. সব কিছু একসঙ্গে চালাও.. দু’ঘণ্টার মধ্যে পুরো এলাকা দখল করে রিপোর্ট কর।”
চারটের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর পাকিস্তানি সেনারা দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবনাকে পাকিস্তানি সেনারা দখল করতে পারে নি।সকালে ভুট্টোকে ঢাকায় তার হোটেল থেকে উঠিয়ে নিয়ে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।বিমানে চড়ার আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, “ধন্যবাদ, পাকিস্তান বেঁচে গেল।”
পরের দিন সকালে সিদ্দিক সালিক ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের বাসভবনে গিয়েছিলেন তল্লাশি চালাতে। কিছুই পাওয়া যায় নি সেখানে শুধু রবীন্দ্রনাথের একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ছাড়া।
ফ্রেমের কাঁচটা বেশ কয়েক জায়গায় ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু ছবিটা একদম ঠিক ছিল।
ওদিকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পরে শেখ মুজিবকে মিয়াওয়ালী জেলের এক সেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। রেডিও তো দূরের কথা খবরের কাগজও দেওয়া হত না তাকে।প্রায় ন’মাস তিনি ওখানে ছিলেন। ৬ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে চলা এক সেনা ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদ- দিয়েছিল।তারপরে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা গিয়েছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে। মিয়াওয়ালী জেল থেকে বার করে শেখ মুজিবকে রাওয়ালপিন্ডির একটি গেস্ট হাউসে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
৭ই জানুয়ারি, ১৯৭২, রাতে শেখ মুজিবকে রাওয়ালপিন্ডির চকলালা বিমানঘাঁটিতে ছাড়তে নিজেই গিয়েছিলেন মি. ভুট্টো।তিনিও কোনও কথা না বলে শেখ মুজিবকে বিদায় জানিয়েছিলেন।পার্বত্য চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ৮ম পূর্ব বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-প্রধান মেজর জিয়াউর রহমান ও চট্টগ্রামের আওয়ী নেতা এম.এ.হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
শত দুঃখ, কষ্ট, সংগ্রাম উপেক্ষা করে প্রতিষ্টিত হয় বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট বাংলাদেশ। সময়ের পরাক্রমায়ে ধীরে ধীরে আজ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের সাথে তালমিলিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। গরিব দুঃখী মেহনতি মানুষের পরিশ্রম, শ্রমিক ভাই -বোনদের শ্রমের ফল,জ্ঞানী -বুদ্ধিজীবিদের জ্ঞানের বিকাশ কাজে লাগিয়ে আজ বিশ্বের মধ্যে নানা এওয়ার্ড অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে। অনেকে তাদের জীবন বাজি রেখে এদেশ কে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন,অসংখ্য নারীরা তাদের স্বামী হারিয়ে বিধবা জীবন যাপন করতে হচ্ছে। ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ সালে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি বেসামরিক জনতা,ছাত্র-ছাত্রী, বুদ্ধিজীবি এবং সামরিক বাহিনীতে কর্মরত লোকজনের উপর অপারেশন সার্চলাইট নামে একটি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নৃশংসতা চালায়, যারা পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম গনতান্ত্রিক নির্বাচনকে মেনে নেওয়ার দাবি জানানো হয়।যেখানে পূর্বাঞ্চলীয় দল জয়ী হয়েছে বা পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান কে পৃথক হিসেবে মেনে নিতে স্বীকৃতি জানায়।বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং সেনাবাহিনীর অফিসার অপারেশন সার্চলাইটের জবাব হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন।সামরিক, আধাসামরিক, আমজনতা মিলে মুক্তিবাহিনী গঠন করে, তারা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই প্রিয় মাতৃভূমির অসংখ্য মানুষ তাদের ঘর-বাড়ী ছেড়ে চলে গেছে অজানা প্রান্তে। অনেকে তাদের জীবন বাজি রেখে এদেশ কে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন,অসংখ্য নারীরা তাদের স্বামী হারিয়ে বিধবা জীবন যাপন করতে হচ্ছে। শত কষ্ট,বেদনা, অপেক্ষা করে দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধের মাধ্যমে প্রায় এককোটি মানুষ দেশ ত্যাগে বাধ্য হন এবং প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হওয়ার বিনিময়ে লাল-সবুজের পতাকাবাহী বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।অবশেষে ভুটান থেকে শুরু করে মরিশাস দেশ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ টি দেশ বাংলা কে স্বাধীনতা স্বীকৃতি প্রধান করেছে।

লেখক শিক্ষার্থীঃ সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা।
অনার্স ৪র্থ বর্ষ
দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ