বিভাগ - অপরাধ

রানা প্লাজা ধসের ৭ বছর: সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়েই ঝুলে আছে ৩ মামলা

প্রকাশিত

এওয়ান নিউজ: রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা চার মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে কেবল একটির। ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলার রায় ঘোষণা করেন। বাকি তিন মামলার বিচারকার্য সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়েই ঝুলে আছে। মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে । আর ইমারত নির্মাণ আইনে দায়ের করা দুই মামলার মধ্যে রাজউকের মামলাটি ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং ইমারত নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। আরও ১১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে শ্রম আদালতে।ঃ

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকার রানা প্লাজার ৮ তলা ভবন ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে নিহত হন ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক। আহত হন আরও কয়েক হাজার। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণঘাতী এই দুর্ঘটনার রেশ এখনও বয়ে চলছেন আহত শ্রমিক এবং হতাহতের পরিবারের সদস্যরা। আহত শ্রমিকদের বড় একটি অংশই এখনও ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে, কেউ আবার পঙ্গু হয়েছেন আজীবনের জন্য। এ ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।

রানা প্লাজা হত্যা মামলা
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন এক হাজার ১৩৬ জন। আহত হয়েছিলেন আরও সহস্রাধিক। এ ঘটনায় পরদিন সাভার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ ভবন নির্মাণে অবহেলা ও ত্রুটিজনিত হত্যার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন।

২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় অভিযোগ পত্রে ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। ৪১ আসামির মধ্যে আবু বক্কর সিদ্দিক ও আবুল হোসেন মারা যান। বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৩৯ জন। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করলেও এখন পর্যন্ত একজনেরও সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর খোন্দকার আবদুল মান্নান বলেন, হত্যা মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে জেলা ও দায়রা আদালতে। অভিযোগ গঠনের পর কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলাটি স্থগিত করেন। তাদের মধ্যে এখনও সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাত উল্লাহ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার হাজি মোহাম্মদ আলীর পক্ষে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তাদের পক্ষে মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় মামলার কোনও কার্যক্রম এগোচ্ছে না।

ইমারত আইনে রাজউকের মামলা
আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন ওইদিন ইমারত নির্মাণ আইনে সাভার থানায় আরেকটি মামলা করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবনের মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ১৩০ জনকে মামলার সাক্ষী করা হয়। ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে এখন পর্যন্ত একজনেরও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আনারুল কবির বাবুল বলেন, কয়েকজন আসামি অভিযোগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিভিশন মামলা করেন। তাদের মধ্যে নিউ ওয়েব বটমস লিমিটেডের এমডি বজলুস সামাদ ও সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের রিভিশন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। অপরদিকে ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামের রিভিশন মঞ্জুর করে অব্যাহতি দেন আদালত। রিভিশনের বিষয়টি নিষ্পত্তি হলে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে পারব।

ইমারত আইনে দুর্নীতি মামলা
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পরপরই ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছয় তলার জন্য অনুমোদন নিয়ে ৮ তলা হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল রানা প্লাজাকে। এই দুর্নীতির কারণে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় সাভার থানায় ২০১৩ সালের ১৫ জুন একটি মামলা দায়ের করে দুদক। ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মফিদুল ইসলাম। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। করোনাভাইরাসের কারণে আদালত বন্ধ থাকায় কার্যক্রম চলছে না। এ পরিস্থিতি কেটে গেলে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করতে পারবো।

জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ দুদকের মামলা
২০১৫ সালের ১২ এপ্রিল দুদকের সহকারী পরিচালক মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও তার মা মর্জিনা বেগমের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় রানা প্লাজার নির্মাণের তথ্য গোপন করে দুদকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে ছয় কোটি ৬৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ করা হয়। ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট এ মামলার রায় দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস। দুদকের দায়ের করা এই মামলার রায়ে সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ের আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তার মা মর্জিনা বেগমকেও তিন বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে অবৈধভাবে অর্জিত সাভার বাজার রোডের ৬৯/১ বাড়িটির এক-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করারও আদেশ দেন আদালত।

আসামি রানার আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, মামলাটির বিচার হচ্ছে না । বিনা বিচারে রানা কারাগারে আটক আছেন। জামিনও পাচ্ছেন না। ভবনের মূল মালিক রানার বাবা, তিনি জামিন পেলেও রানা জামিন পাচ্ছে না। সব আসামি জামিনে সুবিধা ভোগ করছে, কিন্তু নামের কারণে রানা জামিন পাচ্ছে না। এজন্য আমরা চাই মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

শ্রম আইনে মামলা
এ ঘটনায় রানা প্লাজা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শ্রম আইনে ১১টি মামলা দায়ের করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর। সবগুলো মামলাই বিচারাধীন রয়েছে।