বিভাগ - ধর্ম

লাইলাতুল ক্বাদরঃ পরিশুদ্ধি লাভের এক অনিন্দ্য রজনী

প্রকাশিত

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ

কোভিট-১৯ মহামারির বিশ্বব্যাপী দুর্যোগে আমরা নিজ নিজ বাসা-বাড়ীতে কোয়ারান্টাইনে থেকে সিয়াম সাধনায় রত আছি। মাহে রমযান আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতোমধ্যে আমরা এসে পৌঁছেছি শেষ দশকে। সৌভাগ্যবান লোকেরা এ মাসে গুনাহ মাপের মাধ্যমে পরকালিন পাথেয় সংগ্রহ করছে।মুমনি-মুসলিমগণ যথাযথভাবে আদাবের সাথে আল্লাহর নির্দেশিত বিধান মোতাবেক সিয়াম পালন করে চলেছে। এর মাঝে আমাদের নিকট এসে উপস্থিত হয়েছে লাইলাতুল কদর; যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার। লাইলাতুল কদর হলো-পরিশুদ্ধি লাভের এক অনিন্দ্য রজনী। উম্মাতে মুহাম্মদীর মতো অল্প পরিশ্রম করে হাজার মাসের ফলাফল অর্জন করার সুবর্ণ সুযোগ অন্য কোন নবীর উম্মাতকে দেওয়া হয়নি। এটা মহান আল্লাহর একান্ত মেহেরবানি ও দয়া। নিম্মে লাইলাতুল ক্বদর এর তাৎপর্য ও করণীয় সম্পর্কে আসুন দৃষ্টিপাত করি।
লাইলাতুল ক্বদরের তাৎপর্য
আমরা জানি ক্বদরের রাতে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কিয়ামুল লাইল করলে তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয় মর্মে হাদীসে (বুখারীঃ ৭০৯, ২/৬৭২, মুসলিমঃ ৭৫৯, ১/৫২৩) বর্ণিত হয়েছে। ক্বদরের রাত বিশেষ একটি মর্যাদা সম্পন্ন, মহিমান্বিত ও বরকতময় রাত। এ রাতে মহান আল্লাহর দরবার থেকে মহাগ্রন্থ আলকুরআন নাযিল করা হয়েছে।আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-‘নিশ্চয় আমি এটি নাযিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। (সূরা দুখানঃ ৩)এই আয়াতে বরকতময় রাত বলে ক্বদরের রাত্ৰিকে বোঝানো হয়েছে, যা রমজান মাসের শেষ দশকে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সূরা ক্বদরে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, পবিত্র কুরআন ক্বদর রাতে নাযিল হয়েছে।আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই আমি ইহা (কুরআন) নাযিল করেছি লাইলাতুল ক্বদরে। (সূরা ক্বদরঃ ০১)এতে বোঝা গেলো যে, বরকতের রাত্রি বলে শবে-কদরকেই বোঝানো হয়েছে। এ রাত্রিকে “মোবারক” বলার কারণ এই যে, এ রাত্ৰিতে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত নাযিল হয়।
লাইলাতুল ক্বদরে পরবর্তী এক বছরের জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। (সূরা দুখানঃ ৪) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এআয়াতের অর্থ কুরআন অবতরণের রাত্রি অর্থাৎ, শবে-ক্বদরে সৃষ্টি সম্পর্কিত সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা স্থির করা হয়, যা পরবর্তী শবে-ক্বদর পর্যন্ত এক বছরে সংঘটিত হবে। এ বছর কারা কারা জন্মগ্রহণ করবে, কে কে মারা যাবে এবং এ বছর কি পরিমাণ রিযিক দেয়া হবে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদীরে পূর্বে স্থিরকৃত সকল ফয়সালা এ রাত্রিতে সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাগণের কাছে অৰ্পণ করা হয়। কেননা, কুরআন ও হাদীসের অন্যান্য বর্ণনা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তায়ালা এসব ফয়সালা মানুষের জন্মের পূর্বেই সৃষ্টিলগ্নে লিখে দিয়েছেন। অতএব, এ রাত্রিতে এসব স্থির করার অর্থ হলো-যে ফেরেশতাগণের মাধ্যমে ফয়সালা ও তাকদীর প্রয়োগ করা হয়, এ রাত্ৰিতে সারা বছরের বিধানাবলী তাদের কাছে অৰ্পণ করা হয়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, তুমি কোন মানুষকে বাজারে হাঁটাচলা করতে দেখবে অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায়। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করে বললেন, প্রতি বছরই এ বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়ে যায়। (হাকিমঃ ২/৪৪৮-৪৪৯)
ক্বদরের রাতের ইবাদাত হাজার মাসের ইবাদাত থেকেও উত্তম।আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
‘লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। (সূরা ক্বদরঃ ৩)অর্থাৎ এক হাজার মাস, তথা ৮৬ বছর যদি কেউ একনিষ্ঠ ভাবে শুধু আল্লাহর ইবাদাতে কাটিয়ে দেয়, তাহলে তার আমলনামায় যে সাওয়াব দেওয়া হবে ; লাইলাতুল ক্বদরের এক রাত একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর ইবাদাতে কাটাতে পারলে উক্ত হাজার মাস বা ৮৬ বছরের আমলের সাওয়াবের থেকে বেশি সাওয়াব ক্বদরের রাতের আমলকারীকে দেওয়া হবে।ক্বদরের রাত বিশেষ ভাবে পরিদর্শনের জন্য জীব্রাইল আঃ এর নেতৃত্বে পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেস্তা আগমন করেন। আর তারা ফজর পর্যন্ত পৃথিবীর যমিনে অবস্থান করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-‘সে রাতে ফেরেশতাগণ এবং রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত। (সূরা ক্বদরঃ ৪-৫)
অন্যদিকে যে ব্যক্তি ক্বদরের রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে সব ধরনের কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- ‘তোমাদের কাছে বরকতময় রমজান মাস এসে গেছে। এটি অত্যন্ত কল্যাণময় মাস। রমজান মাসের রোজা গুলো তোমাদের উপর ফরজ করে দেওয়া হয়েছে। এ মাসে আকাশের (রহমত, বরকত, ক্ষমা ও কল্যাণের) দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ রাখা হয়। আর অভিশপ্ত শয়তান গুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। এ মাসে রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ একটি রাত। যে ব্যক্তি রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত, সে যেন সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। (মুসনাদে আহমাদ, নাসায়ী ও মিশকাতঃ মিশকাত নং-১৭৩)তিনি আরো বলেছেন-‘নিশ্চয় তোমাদের নিকট রমজান মাস উপনীত হয়েছে। এ মাসে একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে যেন সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। আর বঞ্চিত ব্যক্তি ছাড়া কাউকে এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হয় না। (ইবনু মাজাহ, সহীহ তারগীবঃ ৪১৮/১) আমরা এইবার চিন্তা করি, আমাদের কি করা উচিৎ। আদাবের সাথে এই রাতের প্রতি অনুরাগী হবো; না বঞ্চিত হবো আল্লাহর দেওয়া গুনাহ মাফের সুযোগ থেকে। নিজেই ভাবুন, আপনি কোন গ্রুপের?

লাইলাতুল ক্বদর কোন রাত্রি?
লাইলাতুল-কদর রমজান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যেই আসে; কিন্তু এর কোন তারিখ নির্দিষ্ট নেই; বরং যে কোন রাত্রিতে হতে পারে। আবার প্রত্যেক রমাজানে তা পরিবর্তিতও হতে পারে। সহীহ হাদীস অনুযায়ী এই দশ দিনের বেজোড় রাত্রিগুলোতে লাইলাতুল-কদর হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। রমজানের শেষ দশ রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ক্বদরের রাত খোঁজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন-‘রমজানের শেষ দশ রাত্রিতে লাইলাতুল ক্বদর সন্ধান কর। (বুখারী১৯১৬)তিনি আরো বলেছেন-‘যদি কেউ লাইলাতুল ক্বদর খুজতে চায়, সে যেন তা রমজানের শেষ দশ রাত্রিতে খোঁজ করে। (মুসলিমঃ ২/৮২৩) তবে কেউ যদি রমজানের শেষ দশ রাতে লাইলাতুল ক্বদর খোঁজ করতে অক্ষম হয়, তাকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমজানের শেষ সাত রাতে লাইলাতুল ক্বদর খোঁজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- ‘তোমরা রমজানের শেষ দশ রাত্রিতে লাইলাতুল ক্বদর সন্ধান করবে। যদি কেউ একান্তই দুর্বল বা অক্ষম হয়ে যায়, তবে অন্তত শেষ সাত রাতের ব্যপারে যেন কোন ভাবেই দুর্বলতা প্রকাশ না করে। (বুখারীঃ ২/৭১১, মুসলিমঃ ২/৮২৩)রমজানের ২৭তম রাতে ক্বদর খোঁজ করার ব্যপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নির্দেশ রয়েছে। উবাই ইবনু কাব (রাঃ) বলেছেন-“আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আমি জানি লাইলাতুল ক্বদর কোন রাত! এটি সেই রাত, যে রাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে কিয়ামুল লাইল আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর তা হলো (রমজানের) ২৭তম রাত। (মুসলিমঃ ৭৬২)রমজানের ২৩, ২৫ ও ২৭ তম রাতে ক্বদর খোঁজ করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বাণী রয়েছে। আবু যর (রাঃ) বলেছেন-.রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমজানের ২৩তম রাত্রিতে রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত আমাদের নিয়ে কিয়ামুল লাইল করলেন। এরপর বললেন, তোমরা যা খুঁজছো তা বোধহয় সামনে। অতপর ২৫তম রাত্রিতে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত কিয়াম করলেন। এরপর বললেন, তোমরা যা খুঁজছো তা বোধহয় সামনে। অতপর ২৭তম রাত্রিতে তিনি নিজের স্ত্রীগণ, পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ সবাইকে ডেকে আমাদেরকে নিয়ে প্রভাত পর্যন্ত কিয়ামুল লাইল করলেন। এমনকি আমরা ভয় পেয়ে গেলাম যে, সাহরী খাওয়ার সময় পাওয়া যাবে কিনা! (তিরমিযিঃ ৩/১৬৯, ইবনু খুজাইমাঃ ৩/৩৩৭, আহমাদঃ ৫/১৮০) রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাত গুলোতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ক্বদর খোঁজ করতে বলেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-‘আমাকে লাইলাতুল ক্বদর দেখানো হয়েছে, অতপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা (রমজানের) শেষ দশ রাতের বিজোড় রাত গুলোতে তা খোঁজ করবে। (বুখারীঃ ২/৭০৯, মুসলিমঃ ২/৮২৩)অন্যভাবে এসেছে -আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) বলেন, স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হল। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব, তোমরা তা রমাযানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর।” [বুখারী]
কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, দু ব্যক্তির বিবাদের কারণে রাসূল (সাঃ) তা ভুলে গেছেন। ইবনে উমর (রা:) হতে বর্ণিত যে, কয়েকজন সাহাবী রামজানের শেষ সাত রাত্রিতে স্বপ্ন মারফত শবে কদর হতে দেখেছেন। সাহাবীদের এ স্বপ্নের কথা জানতে পেরে নবী (সাঃ) বলেন: “আমি দেখছি তোমাদের স্বপ্নগুলো মিলে যাচ্ছে শেষ সাত রাত্রিতে। অত:এব কেউ চাইলে শেষ সাত রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে পারে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) এ মর্মে আরও অনেক হাদিস রয়েছে।মোদ্দাকথা হলো- যদি লাইলাতুল-ক্বদরকে রমজানের শেষ দশকের বেজোড়
রাত্রিগুলোতে ঘূর্ণায়মান এবং প্রতি রমজানে পরিবর্তনশীল মেনে নেওয়া যায়, তবে লাইলাতুল-কদরের দিন-তারিখ সম্পর্কিত হাদীসসমূহের মধ্যে কোন বিরোধ অবশিষ্ট থাকে না। এটিই প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। [ইবন হাজার: ফাতহুল বারী, ৪/২৬২–২৬৬] । তাই রামাদানের শেষ দশকের বিজোড় ( ২১,২৩,২৫,২৭ ও ২৯) রাত্রিতে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে হবে। এতে ২৭ই রমজানও থাকছে।
রাসূল (সাঃ) এর লাইলাতুল ক্বদর পালন
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যেব্যক্তিঈমানেরসাথেসাওয়াবেরআশায়ক্বদরেররাতেসালাতআদায়করবে, তারঅতীতেরসকলগুনাহক্ষমাকরেদেওয়াহবে। (বুখারীঃ৭০৯, ২/৬৭২, মুসলিমঃ৭৫৯, ১/৫২৩) এই জন্য রমাযানের শেষ দশকে রাসূল (সাঃ) নিজে স্ত্রী-পরিবার সহ সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রমাযানের শেষ দশক প্রবেশ করলে রাসূল (সাঃ) কোমর বেঁধে নিতেন, নিজে সারা রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন।”[বুখারী] কোমর বাঁধার অর্থ হল: পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে চেষ্টা-সাধনায় লিপ্ত হওয়া। রাসূল (সাঃ) রমজানে শেষ দশকে যত বেশি পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না। আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) রমাজানের শেষ দশকে (ইবাদত-বন্দেগীতে) যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না।” [বুখারী] আয়েশা রাঃ বলেছেন-‘যখন রমজানের শেষ দশ রাত আগমন করতো, তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রাত্রি জাগরণে থাকতেন (ইবাদাতে মশগুল থাকতেন) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে দিতেন। আর তিনি অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে ইবাদাতে রত থাকতেন এবং সাংসারিক, পারিবারিক বা দাম্পত্য কাজকর্ম বন্ধ করে দিতেন। (বুখারীঃ ৭১১/২, মুসলিমঃ ৮৩২/২) সুতরাং ব্যাপকভাবে ভাবতে গেলে শেষ দশকে ইবাদত বান্দেগী বাড়িয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমান ঈমানদারদের কর্তব্য। ২৭ রমজানকে লাইলাতুল ক্বদর সাব্যস্থ করে শুধু এ রাতে ইবাদতে কাটিয়ে অন্য রাতকে নেয়ামতের সুযোগ মনে না করা অবিদ্যার পরিচায়ক।
লাইলাতুল ক্বদরে করণীয়
প্রত্যক ঈমানদারদের উচিত এ মহিমান্বিত রাতের প্রত্যেকটা মুহুর্তকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সর্বোচ্চ সচেষ্ট হওয়া। নিজের গুনাহ মাপের জন্য এ রাতকে নাজাতের জরিয়াহ বানানো। এ ক্ষেত্রে-
১. রমজানের শেষ দশকে এ মহিমান্বিত রজনীতে ইবাদত বান্দেগীতে কাটানো, বিশেষ করে বিজোড় (২১,২৩,২৫,২৭,২৯) রাত্রি সমূহে।
৩. ফরজ নামাজ সমূহ জামাতের সাথে আদায় করা।
৪. সালাতুত তারাবীহ, সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করা, অর্থ-তাফসীরসহআলকুরআন গভীর অন্তর্দিৃষ্টি দিয়ে অধ্যয়ন করাসহ অন্যান্য মাসনুনযিকির, তাসবীহ, দুয়া-দুরুদ বেশী বেশী করা।আয়েশা) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি নিবেদন করলাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! আপনি বলুন, যদি আমি (ভাগ্যক্রমে) শবেক্বদর জেনে নিই, তাহলে তাতে কোন (দুআ) পড়ব?’ তিনি বললেন, এই দুআ, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউবুন (কারীমুন) তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী।” অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল, (মহানুভব) ক্ষমাকরাকে ভালবাস। সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।(তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
৫. আল্লাহর নিকট খালেসভাবে তাওবা করা;বিগতদিনেরকোথায়, কিভাবেকিঅপরাধকরেছি, আমরানিজেরাতাজানি, সেঅপরাধেরজন্যক্ষমাযাওয়া, ভবিষ্যতেআরনাকরারদৃঢ়সংকল্পকরা।
৬. পিতা-মাতার ( জীবিত থাকলে) সাথে সদাচরন করা ও তাঁদের থেকে দোয়া নেয়া;পিতা-মাতার মাগফেরাতের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করা।
৭. পরিবারের সকল সদস্যকে রাত্রি জাগরনের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতে ভূমিকা রাখা।
৮. আত্মীয়স্বজন ও সকল মুসলমানের জন্য দু’আ করা।
৯. কুরআন বুঝার চেষ্টা করা,আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল (সা.) এর আদিষ্ট বিষয়গুলোর পরিপূর্ণ প্রতিপালন ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জনে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া।
১০. করোনাভাইরাস মহামারীসহ যাবতীয় বিপদ থেকে বাঁচার জন্য মহান রবের দরবারে খালেসভাবে দোয়া করা।

লাইলাতুল ক্বদরের নামাজের নিয়ম
শবে ক্বদরের নামাজ দুই রাকাত করে সাধারণ নফল বা সুন্নাত নামাজের মতই আদায় করতে হয়। এই নামাজের বিশেষ কোন নিয়ম নেই। কোনো সূরাও এই নামাজের জন্য নির্দিষ্ট নেই। এমনকি এই নামাজের রাকাত সংখ্যাও নির্দিষ্ট নেই। সমাজে প্রচলিত নির্দিষ্ট সূরা ও নির্দিষ্ট আয়াত সংখ্যা অবিদ্যান আলেমদের বানানো।
১। লাইলাতুল ক্বদরে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী যত রাকাত ইচ্ছা হয় যেকোন সূরা দ্বারা সাধারণ নফল বা সুন্নাত নাজের মত নামাজ আদায় করবে।
২। তবে রাতের যেকোন নফল নামাজের রুকু-সাজদা গুলো যত দীর্ঘ করা যায় ততই উত্তম।৩। সম্ভব হলে লম্বা লম্বা সূরা-কিরাত দিয়ে নামাজ গুলো আদায় করবে।রাসূল (সাঃ) শতাধিক আয়াত পাঠ করেছেন প্রতি রাকাতে মর্মে হাদীসে এসেছে।
৪। কিছুক্ষণ নামাজের মাধ্যমে, কিছুক্ষণ যিকির ও তাসবীহ পড়ার মাধ্যমে, কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কিংবা কিছুক্ষণ দোয়া ও ইস্তিগফার বা তাওবার মাধ্যমে এই মহিমান্বিত রাতটি অতিবাহিত করা যায়। অথবা দুই রাকাত, চার রাকাত বা যেকোন সংখ্যক নামাজের পর পর এভাবে আমল পরিবর্তন করা যায়।
৫। লাইলাতুল ক্বদরের নির্দিষ্ট সময় হলো- সূর্যাস্তের পর বা মাগরীব থেকে সুবহে সাদিক বা ফজর পর্যন্ত। উল্লেখিত পদ্ধতি অনুসরন করলে সহজেই সারা রাত ইবাদাতের মাধ্যমে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।
লাইলাতুল ক্বদরের বিশেষ দোয়া
আয়েশা রাঃ রাসূলুল্লাহ সাঃ কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমি যদি লাইলাতুল ক্বদর পাই, তাহলে কি বলবো? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আর আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (তিরমিযিঃ ৯/৪৯৫, ইবনু মাজাহঃ ৩৮৫০, আহমাদঃ ৬/১৭১)তিনি আরো বলেছেন-‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি মহান ক্ষমাশীল, আর আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (তিরমিযিঃ ৫/৫৩৪, ইবনু মাজাহঃ ২/১২৬৫)নিজের গোনাহ ক্ষমা করানোর জন্য ক্বদরের রাতে এই দুআটি অর্থ বুঝে মোনাজাতে বা সাধারণ ভাবে বেশি বেশি পড়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে লাইলাতুল ক্বদরের মর্যাদা অনুযায়ী এর যথাযথ সম্মান দেখিয়ে নিজেদের অপরাধ ক্ষমা নেওয়ার সুযোগ দিন। আমিন।

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
পিএইচডি গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Email: hadayetcv@gmail.com