‘শক্ত মেয়েদেরও আমি টেবিলে বসে কাঁদতে দেখেছি’

প্রকাশিত

এওয়ান নিউজ ডেস্ক:সৌন্দর্য চর্চা খাতে কটুবাক্য ব্যবহার এবং অন্যায় চাকরি চ্যুতির ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠনের আহবান জানিয়েছে ব্রিটিশ বিউটি কাউন্সিল, কারণ এই খাতটির কর্মীদের কোন ট্রেড ইউনিয়ন নেই। বিবিসির ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার প্রোগ্রামের গোপন অনুসন্ধানে এই খাত জুড়ে কটুবাক্য বা গালাগালির চিত্র বেরিয়ে আসার পর তারা ওই আহবান জানায়।

”আমি দেখেছি, বড় বড় মেয়েরা, শক্ত মেয়েরা তাদের টেবিলে বসে কাঁদছে। এখানকার পরিবেশ এতটাই বিষাক্ত আর হয়রানিমূলক যে, মানুষজন এই খাত থেকে বেরিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে.” বলছেন সারাহ (তার আসল নাম নয়), যিনি প্রসাধনী শিল্প জগতের একটি আন্তর্জাতিক নামী ব্র্যান্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।তিনি বলছেন, তার বস তার পেছনে কথা বলেন এবং সরবরাহকারীদের বলেছেন যে, তিনি নাকি তাদের গোপন তথ্য অন্যদের বলেছেন।

”এরপর থেকে বস’রা আমাকে শুধুমাত্র প্রজেক্টের আওতায় ছোটখাটো কাজ দিচ্ছেন এবং গত দুই বছর ধরে যে প্রজেক্টে খুব ভালোভাবে কাজ করছিলাম, সেখান থেকে আমাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে,” তিনি বলছেন।”জন সম্পদ বিভাগ এবং পরিচালনা পর্ষদ আমার কথাকে গুরুত্ব দেয়নি। আমার প্রচণ্ড রাগ লাগছিল, কিন্তু এটা শুধু ক্ষোভের ব্যাপার নয়- আসলে এটা হৃদয় ভেঙ্গে যাওয়ার মতো ব্যাপার।”

এরপর ওই কোম্পানি থেকে চাকরি ছেড়ে দেন সারাহ।যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে গত বছর ১৪.২ বিলিয়ন পাউন্ড অবদান রেখেছে প্রসাধনী শিল্প খাত। চাকরি বাজারের প্রতি ৬০ জনের মধ্যে একজন এই খাতে চাকরি করেন।

ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার প্রোগ্রাম বিশ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন কোম্পানি পরিচালক থেকে শুরু করে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মেক-আপ আর্টিস্ট, যারা দাবি করেছেন যে, নানা সময়ে তারা গালাগালি, নিপীড়ন এবং খারাপ রীতিনীতির শিকার হয়েছেন।অনেকে বলেছে, তারা ক্ষোভ, হতাশায় ভুগেছেন, এমনকি কখনো কখনো এসব কারণে আত্মহত্যার কথাও চিন্তা করেছেন।

প্রায় সবাই বলেছেন, এই খাতটি প্রাতিষ্ঠানিক গালাগালির সংকটে ভুগছে। কিন্তু তারা ভয়ও পান যে, এ নিয়ে যদি তারা কোন অভিযোগ করেন, তাহলে তারা আর চাকরি করতে পারবেন না।এই খাতে কোন ইউনিয়ন নেই, সুতরাং তাদের এমন কেউ নেই, যে বা যারা তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে বা অন্য কোম্পানির সহায়তা চাইবে।

‘কোন ভবিষ্যৎ নেই’
ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার প্রোগ্রাম যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের অনেককেই একটি ‘প্রকাশ না করার শর্তে’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। এটি হচ্ছে এমন একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে মুখ বন্ধ রাখার জন্য কর্মীদের হাজার হাজার পাউন্ড দেয়া হয়।

কিন্তু ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরেও সারাহ এবং আরেকজন নারী কর্মী জানিয়েছেন, তারা চান তাদের ঘটনাগুলো মানুষ জানুক, যদিও তারা নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।’নিকোল’ একটি নামকরা প্রসাধনী শিল্প কোম্পানির নির্বাহী হিসাবে কাজ করেছেন। তিনি বলছেন, যখন তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান যে, তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন, তখন তাকে কাজ থেকে একপ্রকার বাইরে ঠেলে দেয়া হয়।

”আমাকে বৈঠকগুলো থেকে বাইরে রাখা হয়, আমাকে কোন তথ্য দেয়া হতো না, তারা এমনকি ইমেইলে আমাকে যোগ করাও বন্ধ করে দেয়,” তিনি বলছেন।”এরপর, মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ করে কাজে ফেরার আড়াই মাসের মধ্যে আমাকে বলা হয় যে, এই প্রতিষ্ঠানে আমার কোন ভবিষ্যৎ নেই এবং আমার চলে যাওয়া উচিত।”

”তারা আমাকে যা বলেছে, সবই আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, যে আমি একজন খারাপ মানুষ। আমি বিষণ্ণতা, মানসিক চাপের চিকিৎসা করিয়েছি। একটি চিকিৎসা কেন্দ্রেও আমাকে থাকতে হয়েছে। আমি আসলে সত্যিই ভাগ্যবতী যে, আমি ফিরে আসতে পেরেছি…কিন্তু অনেক মানুষ সেটা পারে না।”

তবে শুধু নারীরাই এরকম অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছেন, তা নয়। জেক, যিনি এখন ফ্রিল্যান্স মেকআপ আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করছেন, বলছেন, তার সঙ্গেও অতীতে অনেক খারাপ আচরণ করা হয়েছে।

”অনেকবার এমন ঘটেছে যে, তাদের আচরণ ছিল এমন, ‘তুমি কি তাকে সত্যিই তোমার মেক-আপ করতে দিতে চাও? সে একজন পুরুষ, সে জানে না কীভাবে ঠিকমতো মেক-আপ করতে হয়,” তিনি বলছেন।”আমি বিষণ্ণতার অনেকগুলো স্তরের ভিতর দিয়ে গিয়েছি। আমার মনে হচ্ছিল, আমার চারদিকে যারা আছে, তাদের কারো আন্তরিকতা নেই।”

‘হৃদয় ভঙ্গের মতো ব্যাপার’
কর্মসংস্থান বিষয়ক আইনজীবী ক্যারেন জ্যাকসন বলছেন, প্রসাধনী শিল্পে বৈষম্য করার এরকম শতশত মামলা তিনি নিয়ে তিনি কাজ করছেন, যার মধ্যে গালাগালি এবং হয়রানির মতো অভিযোগ রয়েছে।

”আমি একই কোম্পানির বিরুদ্ধে একই ধরণের অভিযোগ বারবার শুনেছি, যা থেকে বোঝা যায়, যে এরা অতীতের ভুল থেকে কোন শিক্ষা নিচ্ছে না এবং তারা কর্মক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য আচরণ মেনে নিচ্ছে,” তিনি বলছেন।

”আমি বুঝতে পারি না, কেন তারা এসব ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয় না এবং সমস্যাগুলো দূর করে সবার জীবনকে সহজ করে তোলে না।”তবে এই শিল্পে এমন কিছু মানুষ রয়েছে, যারা এখানে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন।

বিখ্যাত মেক-আপ আর্টিস্ট ল্যান নগুয়েন-গ্রেয়ালিস বলছেন, পেশাজীবনের শুরুর দিকে তিনিও কটুবাক্য ও হয়রানির শিকার হয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতার কারণে নিজেকে অনেক নমনীয় করে তুলেছেন।

”এটা সবটাই বোনদের আন্তরিকতার মতো- অনেক মেয়েরাই দরকার হলে গোপনে আমার কাছে এসে তাদের কথা বলতে পারে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, এই মেয়েদের জানার দরকার আছে এই খাতটি খুবই চমৎকার। আপনি যদি সত্যিই একজন ভালো মানুষ হন, তাহলে আপনি এখানে স্থায়ী একটি পেশা জীবন তৈরি করতে পারবেন।”

এই শিল্পের বক্তব্য, মতামত এবং চাহিদার প্রতিনিধিত্ব করে ব্রিটিশ বিউটি কাউন্সিল।ডার্বিশায়ার অনুষ্ঠানের ফলাফলগুলো প্রচারের পর, সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইলি কেনডাল বলেছেন, ”যেকোনো শিল্পের জন্য এটা খুবই হৃদয়বিদারক ব্যাপার,আমার একে অপরের গলা ধরে টানাটানি করছি।”

”এটার জন্য দায় সরকারের, কারণ এটা শুধুমাত্র প্রসাধনী শিল্প সংক্রান্ত ব্যাপার নয়, এটা একটা জাতীয় ইস্যু। আমি মনে করি, এখানে ন্যায়পালের মতো বা প্রাতিষ্ঠানিক একটি কর্তৃপক্ষ থাকা উচিত, যারা নিশ্চিত করবে যে, এটা যেন সবার জন্য একটি নিরাপদ স্থান হয়ে ওঠে।”

যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য বিষয়ক দপ্তর একটি বিবৃতিতে বলেছে: ”সমতার আইন অনুযায়ী, কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ, বর্ণ, প্রতিবন্ধীত্ব, ধর্ম, বিশ্বাস, যৌন দৃষ্টিভঙ্গি বা বয়সের কারণে হয়রানি করার বিরুদ্ধে সুরক্ষা রয়েছে এবং কর্মীরা এরকম ঘটনায় কর্মসংস্থান বিষয়ক ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রতিকার চাইতে পারে।”বিবিসি বাংলা

error0