সিন্ডিকেটের অন্তরালে সরকারী প্রেতাত্বা

প্রকাশিত

এ্যাডঃ তৈমূর আলম খন্দকার: বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম। প্রতিনিয়তই হঠাৎ করেই কোন না কোন জনদূর্ভোগ দেখা দেয়, যা স্বাভাবিক পন্থায় নয় বরং কৃত্রিম উপায়ে। প্রাকৃতিক দূযোর্গ তো আছেই। প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও কৃত্রিম দূযোর্গের মধ্যে পার্থক্য এই যে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক দূর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া যায়, যার জন্য জনগণ প্রকৃতির আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। প্রকৃতি সব সময়ই প্রতিশোধ পরায়ন। প্রকৃতিকে বাধা গ্রস্থ করলে প্রকৃতি প্রতিশোধ গ্রহণ করে। কিন্তু কৃত্রিম দূর্যোগ সৃষ্টি হয় একটি শ্রেণী কর্তৃক অঢেল বিত্তশালী ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে প্রয়োজনমত ব্যবহারের মাধ্যমে অতিমাত্রায় মুনাফা অর্জনকে টার্গেট করে এক শ্রেণীর মানুষ যখন সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ করে তখনই এই সংঘবদ্ধতাকে মিডিয়ার ভাষায় সিন্ডিকেট বলা হয়, যারা সংঙ্ঘবদ্ধভাবে কোন বিষয়ের উপরে পুরাপরি নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিজেদের ফয়দা লুটার জন্য জনগণের পকেট কাটে।

শেয়ার বাজার ক্যালেঙ্কারী, ধানের ক্ষেতে কৃষকের আগুন দেয়া, কোরবানীর চামড়ার মূল্য না পাওয়ায় মাটির নিচে পুতে রাখা, বাজারে পেয়াজ থাকা স্বত্বেও স্বর্ণের (রূপক অর্থে) মূল্যে পেয়াজ বিক্রি, মজুদ থাকা স্বত্বেও লবনের হাহাকার প্রভৃতি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাকে সরকার সিন্ডিকেটের কাজ বলে “সিন্ডিকেট” ধরা হবে বলে প্রতিনিয়তই মন্তব্য করছেন। কিন্তু সিন্ডিকেট আর ধরা পড়ছে না। কেসিনিও ও মানি লন্ডারিং সিন্ডিকেট কথিত অভিযানের জালে যে মাছ ধরা পড়লো তা সবই সরকারী ঘরনার শুধু সমর্থক নয় বরং নেতৃবৃন্দ।

বিশেষজ্ঞদের মতে সরকারী দায়িত্ব প্রাপ্ত বা সরকারের ক্ষমতাবান ব্যক্তি ছাড়া একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ সংগঠিত করা সম্ভব নয়। ১৯৮০ ইং সনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান কর্তৃক গঠিত কমিশন এ মর্মে মতামত ব্যক্ত করেন যে,“A series of charactercstics of criminal group,” “Protector and specialist support” necessary for organized crime. অর্থাৎ অপরাধী চক্রকে প্রোটেশন ও বিশেষায়িত সমর্থন ছাড়া একটি সংঙ্গবদ্ধ অপরাধ (organized crime) সংগঠিত হতে পারে না। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগে এ Protector এবং specialist support দেয়া কাদের পক্ষে সম্ভব? ক্ষমতার যারা ক্রীড়ানক, যারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে পারে, যাদের আংগুলি নির্দেশনায় ক্ষমতার মানডন্ড উঠা নামা করে তাদের ইংগিত বা পরামর্শ ছাড়া অপরাধী চক্রকে প্রোটেকশন দেয়ার যোগ্যতা বা ক্যাপাসিটি’কে রাখতে পারে? এ মর্মে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতামত এই যে,ÒGreat consensus in the literature that organized crime functions as a continuing enterprise that rationally works to make a profit through illicit activities and that it ensures its existence through the use of therats or force and through corruption of public officials to maintain a degree of immunity from law enforcement. There also appears to be some consensus that organized crime tends to be restricted to those illegal goods and services that are in great public demand through monopoly control of an illicit market (m~Î: Introduction to organized Crime).” উক্ত সূত্র মোতাবেক আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের সমর্থন সংঘবদ্ধ অপরাধ সংগঠনের জন্য অপরিহার্য্য। উক্ত সূত্র থেকে আরো একটি বিষয় অতীব পরিষ্কার যে, সিন্ডিকেটের অপরাধ সংগঠিত করা হওয়ার জন্য “Great Public Demand through monopoly control of an illicit market” অর্থাৎ সিন্ডিকেটের টার্গেট এমন বস্তুর উপর থেকে যার ÒPublic Demand” আছে সে ধরনের বস্তুর উপর monopoly control নেয়া। পেয়াজ একটি অপরিহার্য্য খাদ্য যার Public Demand অনস্বীকার্য্য এবং এর উপরে সিন্ডিকেটদের monopoly control (একছত্র আধিপত্য) নেয়ার কারণেই বাজারে পেয়াজ থাকা স্বত্বেও মূল্যে নির্ধারিত হচ্ছে আকাশচুম্বী যা কল্পনা করাও জনগণের জ্ঞানের পরিধির মধ্যে ছিল না, অন্যদিকে সিন্ডিকেটদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য তথ্য সরকারের নিকট থাকা দরকার ছিল, বাস্তবিক পক্ষে উহাতেও সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন আছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। এ মর্মে গবেষক there is a need for information about organized criminal activity itself by which the governments new legislation and its expanding level of effort can be evaluated. সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের দায়িত্ব সম্পর্কে Anderson যে মতবাদ প্রকাশ করেছেন সে সম্পর্কেও সরকার দায়িত্ববান ছিলেন কি?

পেয়াজ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের মধ্যে অন্যতম। হঠাৎ করেই কল্পনাতীত ভাবে পেয়াজের মূল্য বৃদ্ধি সরকার কোন মতেই স্বাভাবিক করতে পারছে না, বরং তাদের কথা ও বাজার মূল্যের গতিধারা সমন্বয়হীনতায় ভূগছে। সরকার বলছে যে, পেয়াজ প্লেনে উঠেছে। কিন্তু বাজার মূল্য স্থিতিশীল নাই, সরকারী আশ্বাসের উপরেও মানুষ ভরসা রাখতে পারছে না। আমদানী রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ ও শুল্ক আদায়ের জন্য সরকারের একটি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর রয়েছে। যে কোন ঘটনা ঘটার পূর্বেই অনুষ্ঠিতব্য অপরাধের সূত্র খোজে বের করাই গোয়েন্দাদের কাজ। অথচ গোয়েন্দারা তথ্য খোজার জন্য মাঠে নেমেছে ঘটনা ঘটার পরে। পেয়াজের অতিরিক্ত দামের রহস্য উৎঘাটনের ২৭/১১/২০১৯ ইং তারিখ ৪১ জন পেয়াজ আমদানী কারককে শুল্ক গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে জানা যায়। মিডিয়ার সূত্র মতে “কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টিকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতে ৩৩২ পেঁয়াজ আমদানিকারকদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে শুল্ক গোয়েন্দা। বাংলাবান্ধা, বেনাপোল, ভোমরা, হিলি, সোনা মসজিদ, টেকনাফ, চট্টগ্রাম ও ঢাকা কাস্টম হাউজ দিয়ে চলতি বছরের আগস্ট থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১৬৭ হাজার ৮০৬ দশমিক ৪৭ মেট্রিকটন। তারপরও অতিরিক্ত মূল্যের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। অনেক আমদানিকারকের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত পেঁয়াজ অবৈধভাবে মজুদ করার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া রয়েছে মানিল্ডারিংয়ের অভিযোগও (সূত্র: ২৭/১১/২০১৯ তারিখের জাতীয় পত্রিকা)।”

সরকারের মন্ত্রীদের চাটকদার বক্তব্য ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কোন মতেই জনগণের চাহিদা বা প্রয়োজন মিটাতে পারছে না। প্রশাসন জনগণের চাহিদার সম্পূরক হিসাবে চলতে নিজেরাই নিজেদের প্রতিবন্ধক হিসাবে দাড়িয়েছে। কারণ প্রশাসন মনে করে যে, জনগণের চাহিদা পূরনের চেয়ে সরকারের মদদপুষ্ঠ থাকাই তাদের প্রধান দায়িত্ব, যদি তা না হয়ে থাকে তবে পেয়াজের চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক তথ্য তাদের নিকট নাই কেন? এ প্রশ্নগুলির কোন জবাব নাই এ জন্য যে প্রশাসন এখন দলীয় ক্রীড়ানকে পরিনত হয়েছে, ফলে পেশাদার দায়িত্বের চেয়ে দলবাজী প্রাধান্য পাচ্ছে, ফলশ্রুতিতে অধিকহারে লাভবান হচ্ছে আমলারা যার আমলাতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বরপুত্র।

নেতৃস্থানীয় আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা Federal Bureau of Investigation এর মতে সংঘবদ্ধ অপরাধ বলতে যে সংঙ্গা দিয়েছেন তা নিম্নরূপ ঃ-

“An organized crime is any crime committed by a person occupying, in an established division of labor, a position designed for the commission of crimes providing that such division of labor includes at least one position for a corrupter, one position for a corruptee, and one position for an enforcer (সূত্র: Donland Cressey ১৬৬৯ ইং).” সংঘবদ্ধ অপরাধ সিন্ডিকেটকে দমন করতে হলে FBI এর সংঙ্গা মোতাবেক “Corrupter, Corruptee” এবং “Enforcer”কে বা কাহারা তা সরকারকে খুজে বের করতে হবে, অন্যথায় মন্ত্রীদের চটকদার বানী মুখরোচক বক্তব্য হিসাবে আলোচিত হবে, কিন্তু জনদূর্ভোগ কমবে না। সরিষায় যখন ভূত থাকে, সে সরিষা দিয়ে ভূত তাড়ানো যায় কি?

লেখক

কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)

error0