​এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি টিআইবির

প্রকাশিত

এওয়ান নিউজ: কুয়েতে মানবপাচারের অভিযোগ আটক হওয়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, মানবপাচার ও অর্থপাচারের মত আন্তর্জাতিক অপরাধ ও দুর্নীতির ঘটনায় সংসদ সদস্যের অভিযুক্ত হওয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে দুর্বৃত্তায়নের একটি অসম্মানজনক দৃষ্টান্ত।

মঙ্গলবার (২৩ মে) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি সংসদের মর্যাদার স্বার্থে দ্রুত কার্যকর তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় সংসদের প্রতি দাবি জানিয়েছে।

চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কুয়েত ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে টিআইবির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রথম থেকেই সরকার, জাতীয় সংসদ, দুদক, ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই অভিযোগের ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি, উল্টো দায়মুক্তির চেষ্টার লক্ষণ দেখা গেছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবপাচারের মত গুরুতর অভিযোগ নিয়ে কুয়েতের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তথাকথিত তদন্তের পর অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে লিখিত প্রতিবেদন দিয়েছেন, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আর আমাদের দেশের সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাতেই আশ্বস্ত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগের কথা জানা যায়নি। এমনকি সম্প্রতি ওই সংসদ সদস্যকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার ও তার সম্পদ বাজেয়াপ্তের পদক্ষেপের সংবাদ প্রকাশের পরও সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী একাধিকবার জানিয়েছেন, কুয়েত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালে তাদের কিছু করার নেই। দেশের সুনাম আর হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ যেখানে জড়িয়ে আছে, সেখানে সরকারের এধরনের উদাসীনতা একইসঙ্গে লজ্জার ও আশংকার।

কুয়েত সরকারের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের অপেক্ষায় না থেকে স্বপ্রণোদিতভাবে এই অভিযোগের বিরুদ্ধে তদন্ত করা সম্ভব ও উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, যে হাজার হাজার শ্রমিককে কাজ দেওয়ার নামে পাচার করা হয়েছে এবং কার্যত জিম্মি বানিয়ে দফায় দফায় অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তারা সবাই এ দেশের নাগরিক। এই পাচারের ঘটনায় দেশের ভিতরে নিশ্চিতভাবেই একটি মানবপাচার চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল, যাতে সরকারি-বেসরকারি এক বা একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতাও অনিবার্য। যে সকল আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তা বাংলাদেশেও ঘোরতর অপরাধ। তারপরও তদন্তের জন্য কুয়েতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে কেন? এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটুকু স্পষ্ট যে, বরাবরই অভিযোগের কার্যকর তদন্তে সরকারের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ছিল না এবং এর পিছনে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের দৃশ্যমান যোগসাজশ ছিল।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই ন্যক্কারজনক ঘটনা দেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের একটি দুঃখজনক দৃষ্টান্ত।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অতীতে কোনো রকম রাজনৈতিক কার্মকাণ্ডে জড়িত না থেকেই ক্ষমতাসীন দলের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন অভিযুক্ত সংসদ সদস্য। এরপর একরকম অভূতপূর্বভাবে তার স্ত্রীও সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসেন। কোনো প্রক্রিয়ায় বা বিনিময়ে এই দম্পতি দলীয় সমর্থন বা মনোনয়ন পেলেন তা দায়িত্বশীলরা খতিয়ে দেখবেন এমনটা আমরা আশা করব।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের বা ব্যক্তি বিশেষের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার অবান্তর সব অভিযোগে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি সংবেদনশীল তৎপরতায় আমাদের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। আমরা বরাবরই তার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জানান দিয়েছি। আর এখন যখন এই আলোচিত সংসদ সদস্য দম্পতির কর্মকাণ্ডে দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সম্মান সত্যিকারভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তখন আমরা কোনো কার্যকর তৎপরতা দেখতে পাচ্ছি না।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাত্র একদিন আগে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে। অভিযোগ আসার পর এতোগুলো মাস পেরিয়ে গেল দুদকের এই পদক্ষেপটা নিতেই! আজ খবর বেরিয়েছে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। যোগসাজশ বা দায়িত্বে অবহেলার কারণে সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গৃহীত ব্যবস্থা বরাবরের মতো শুধু বদলি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে কী না সেটাও আমরা জানি না।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রবাসী শ্রমিকদের অর্জিত রেমিট্যান্সের গুরুত্বের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, এই প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানকে বিবেচনায় নিয়ে, দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার কঠোর অবস্থান নেবেন, স্পিকারের উদ্যোগে অন্তত খতিয়ে দেখা হবে এই ঘটনা সংসদের জন্য কতটুকু অবমাননাকর, আর এর প্রতিকারই বা কি- এমনটাই আশা করে টিআইবি। না হলে একটি গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম মূল যে ভিত্তি তথা আইনের শাসন তা আরও ভূলুণ্ঠিত হবে, রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে এসব অপরাধের আরও বিস্তার ঘটবে।