ফটো গ্যালারি

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি \

এওয়ান নিউজ ডেস্ক: এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু ওষুধ ছিটানো নয় বরং নিতে হবে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার মতো বিজ্ঞান সম্মত পদক্ষেপ। ধ্বংস করতে হবে মশার আবাসস্থল। এমন মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, মশা কার্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এই পদক্ষেপগুলো সারা বছর জুড়েই অব্যাহত থাকতে হবে। শুধু এডিস মশার প্রজনন মৌসুম শুরু হওয়ার আগে এ ধরণের পদক্ষেপ নিলে তা কাজে আসবে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. কবিরুল বাশার বলেন, “সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার আওতায় প্রথম টুলটি হচ্ছে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা। আমাদের পরিবেশের বিভিন্ন জায়গায়, এডিস মশা জন্মানোর জন্য যে পাত্র তৈরি হয় সেটি যাতে না হতে পারে তার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।”

দ্বিতীয়টি হচ্ছে জৈবিক ব্যবস্থাপনা বা বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল। এর জন্য অনেকগুলো উপাদান রয়েছে। যেমন সাইক্লক্স, ব্যাকটেরিয়া, উলভাকিয়া জাতীয় মশা- এধরণের বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়াতে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

“তৃতীয়টি হচ্ছে কেমিক্যাল কন্ট্রোল বা কীটনাশক। এটা অনেক রকম। একটা উড়ন্ত মশার জন্য। আরেকটি হচ্ছে বাচ্চা মশা বা লার্ভি মারার জন্য। লার্ভি মারার জন্য ওষুধ দিতে হয় পানিতে আর উড়ন্ত মশা মারার জন্য দিতে হয় বাইরে।”

তবে কীটনাশক ব্যবহার করে মশা মারার পদ্ধতি এডিস মশা এবং কিউলেক্স মশার জন্য ভিন্ন বলেন জানান তিনি।তিনি বলেন, “এটা সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করতে হবে। আর আরেকটি হচ্ছে আইজিআর বা ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর-এটিরও ব্যবহার করা যেতে পারে,”।

চার নম্বর হচ্ছে, কমিউনিটির লোকজনকে মশক নিধনে সম্পৃক্ত করতে হবে। কমিউনিটির লোকজন নিজেরা নিজেদের উদ্যোগে সমাজকে পরিষ্কার রাখবে, মশা বাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতন হবে এবং সচেতন করবে।

তিনি বলেন “এই চারটি টুলস একসাথে কাজ না করলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ হবে না। এই চারটি টুলস সারা বছর কাজে লাগাতে হবে। শুধুমাত্র এডিস মশার মৌসুমে না বা ডেঙ্গু যখন হবে সেই সময়ে না, সারা বছরই একটি সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার আওতায় আমাদের শহরকে নিয়ে আসতে হবে।”

তিনি বলেন, আমাদের দেশে এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে এ ধরণের কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। শুধুমাত্র কেমিক্যাল কন্ট্রোলটা ব্যবহার করা হয়। কীটনাশক দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো হয়।

তার মতে, “এডিস মশা জন্মস্থান আলাদা। সেই জন্মস্থানকে টার্গেট করা দরকার। সেটাও ঠিকমতো করা হয় না। আর এই কাজগুলো ঠিক মতো হচ্ছে কিনা তার জন্য মনিটরিং ও ইভালুয়েশন টিম থাকা দরকার। এই মনিটরিং ও ইভালুয়েশন টিমটা হতে হবে থার্ড পার্টি। স্বতন্ত্র কোন টিম না হলে এর মনিটরিংটাও ঠিক মতো হবে না।”রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বেশ কয়েকটি জেলায়ও এডিস মশা ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।

সেখানে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কি করতে হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা অন্য ছোট ছোট সিটি কর্পোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন প্রস্তুতিই নাই। কারণ তারা এ ধরণের সমস্যা আগে মোকাবেলা করেননি। এজন্য আসলে সরকারি পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এজন্য এখন জনগণকে সম্পৃক্ত হতে হবে।” জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এই মুহূর্তে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেন জানান তিনি।

তিনি বলেন, “মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এখন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে সবাই যদি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে তাহলেই এটা নিয়ন্ত্রণে আসা সম্ভব। জনগণ অংশগ্রহণ না করলে এই মুহূর্তে মশা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন আমাদের জন্য।”

মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ওষুধ ছিটানোর পরিবর্তে এর উৎসস্থলকে ধ্বংস করা দরকার বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান ডা. সানিয়া তাহমিনা।তিনি বলেন, গবেষণাসহ নানা ধরণের পদক্ষেপ নেয়া যেমন নিয়মিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে যোগাযোগ রাখছেন তারা।

যার অংশ হিসেবে মশা নিয়ন্ত্রণে গাইড লাইন বিষয়ে কোন ভুল আছে কিনা সে বিষয় পরামর্শ দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে একজন সুদক্ষ এন্টোমলজিস্ট নিয়ে আসা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে মশা ধ্বংস করতে হলে কি কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে পরামর্শ দেবেন তিনি।

“একজন এন্টোমলজিস্ট এসেছেন। গতকাল উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাথে এবং আজ দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাথে জ্ঞান বিনিময় করবেন। এবং দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপের মাধ্যমে কিভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায় সে বিষয় কথা বলবেন।”

তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন থেকে যে মশার ওষুধ যেটা ছিটানো হচ্ছে সেটা অ্যাডাল্টিসাইট। এটা প্রাপ্তবয়স্ক মশাকে মারে। এমন মশা মেরে মশা ধ্বংস করা খুব কঠিন। বরং মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে স্ত্রী এডিস মশা যেখানে ডিম পারে সেটিকে ধ্বংস করতে হবে।

“এডিস মশা সহজে মরে গেলেও জন্মায় অনেক বেশি। সারা বছরই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্থাৎ সরকার, কর্পোরেশন, সামাজিক সংগঠন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ প্রত্যেকটা জায়গা কাজে লাগিয়ে মশার উৎসস্থল ধ্বংস করতে হবে। তা নাহলে হঠাৎ করে কাজ করে মশা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন ব্যাপার,” তিনি বলেন।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ: মোমিনুর রহমান জানান, এবারের অভিজ্ঞতার পর বছরের প্রতিটি দিনই এডিস মশা নিয়ে কার্যক্রম থাকবে। কারণ গত বছর পর্যন্ত এ ধরণের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়নি।

মার্চ মাস থেকে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, স্বল্প মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।এরমধ্যে এখন চলছে স্বল্পমেয়াদী কর্মসূচী যার মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলাই প্রাধান্য পাচ্ছে।তিনি জানান, চলতি মৌসুমের আগে সক্ষমতা বাড়ানোটা তাদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিলো না। এখন এটি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ চলছে।

“ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কলকাতায় কিভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা হলো সেখানকার ডেপুটি মেয়রের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কথা হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করার উপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে,” তিনি বলেন।

এদিকে মশার বিস্তার রোধে মশা নিয়ে বিভিন্ন ধরণের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর মতো কোন সক্ষমতা বা জনবল উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নেই বলেও জানানো হয়।মিস্টার রহমান বলেন, “এ ধরণের কোন সক্ষমতা বা দক্ষ লোক কিংবা এ ধরণের জনবল আমাদের কাঠামোতেই নেই। এটি আমাদের এখন বড় কনসার্ন।”

“এধরণের গবেষণা থেকে জানা সম্ভব যে, কেন এ বছর এরকম হলো, আমাদের কি কি দুর্বলতা ছিলো, আরো কি কি করা উচিত ছিলো। সমন্বিত রিসার্চ সেল থাকলে সেটার সাথে সমন্বিত ভাবে কাজ করে পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব,” তিনি বলেন।সূত্র-বিবিসি বাংলা

মন্তব্য করুন

আরো সংবাদ