ফটো গ্যালারি

এ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার:

সম্পাদকের রাজনীতি বনাম রাজনীতির সম্পাদকীয়

সম্পাদকের রাজনীতি বনাম রাজনীতির সম্পাদকীয় \

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দয্য বৃদ্ধি করে সে রাষ্ট্রের সংবাদপত্র। সংবাদপত্র শুধুমাত্র ছাপা অক্ষরে কয়েকটি পৃষ্ঠার কাগজ নহে বরং গণমানুষের সূখ-দুঃক্ষ, হাসি-কান্না, অধিকার-বঞ্চনা, পাওয়া-না পাওয়ার প্রতিফলন ও প্রতিচ্ছবি। মিডিয়া আছে বলেই এখন স্বৈরতন্ত্রের বা অধিপত্যবাদের কর্মকান্ড মানুষ জানতে পারে। স্বৈরশাসক বা অপরাধীরা মিডিয়া জগৎকেই ভয় পায়, মিডিয়ার আতঙ্কই তাদের নিকট সবচেয়ে বড় আতঙ্ক, ফলে মিডিয়ার জন্যই ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্থির নি:শ্বাস নিতে পারে। স্বৈরতন্ত্র যখন আঘাত আনে তখন মিডিয়াকেই তাদের লক্ষ বস্তু নির্ধারণ করে। বাকশাল গঠনের সময়ও ৪টি মাত্র পত্রিকা কার্যকর রেখে বাকী সব বন্ধ করা হয়েছিল। মিডিয়া জগৎ জাতির সার্বিক সমস্যা জনগণের নিকট প্রকাশ করে এবং জনগণের অবস্থান তুলে ধরার জন্য মিডিয়াই একমাত্র অবলম্বন। বাংলাদেশে যে সকল বিষয় মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে সেগুলিরই বিচার বা সমাধান হয়েছে, অন্যগুলি বরফের নীচে চাপা পড়তে পড়তে একদিন বরফ গলে নদী থেকে সমুদ্রে চলে যায়, দেশবাসী, শাসক, সরকার তখন আর এর খোজ রাখে না, স্বরণ রাখে শুধুমাত্র ভুক্ত ভোগীরা। সংগত কারণেই সংবাদপত্রকে একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ হাত বলা হয়।

অন্যান্য আইনের পাশাপাশি সংবাদপত্রগুলির প্রকাশনা “ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ঘোষনা ও নিবন্ধিকরণ) আইন’ ১৯৭৩ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উক্ত আইনে ২(খ) ধারা মোতাবেক পত্রিকার “সম্পাদক” অর্থ “সে ব্যক্তি যিনি সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিষয় নির্বাচন নিয়ন্ত্রন করিয়া থাকেন।” একই আইনের (চ) ধারা মোতাবেক “সংবাদপত্র” অর্থ গণসংবাদ বা গণসংবাদের উপর মন্তব্য সহ কোন সাময়িকী এবং সরকার কর্তৃক গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, সংবাদপত্র হিসাবে ঘোষিত, এইরূপ যে কোন শ্রেণীর সাময়িকী উহার অর্ন্তরভুক্ত হইবে।”

সংবাদপত্র একটি শিল্প বটে, ফলে মালিক গোষ্টি কর্তৃক বাণিজ্যিক বিষয়টি এখানে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু পরিবেশিত সংবাদ বানিজ্যিক ভিত্তিতে বিবেচনা করা নৈতিকতার পরিপন্থী। “নৈতিকতা” এমন একটি বিষয় যা আইন দ্বারা পরিমাপ বা নিয়ন্ত্রন করা যায় না। তবে পত্রিকার নৈতিকতার মাপকাঠি নির্ভর করে সংবাদ পরিবেশনের সততা ও পাঠকের মূল্যায়নের উপর। এক তরফা সংবাদ বা বক্তব্য পরিবেশনা পত্রিকার সততা ও নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ না ছাপানো বা কোন লেখকের লেখায় বিক্ষুব্দ হলে বিক্ষুব্দ ব্যক্তির মন্তব্য বা (যদিও সম্পাদকের সমালোচনা হয়) লেখা না ছাপানোই নৈতিকতার পরিপন্থী। সম্পাদক নিজে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা সদস্য হতে পারেন। কিন্তু পত্রিকা “যা দেখবে তা লিখবে” এটাই হবে নৈতিকতা। কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোন কোন পত্রিকা নগ্নভাবে নৈতিকতার পরিপন্থী ভূমিকা রাখছে। নিরপেক্ষতার মূখোষ পড়ে নগ্নভাবে সরকারী মূখপাত্র হিসাবে ব্যবহ্নত হচ্ছে।

সব ক্ষেত্রে কথাটি প্রযোজ্য না হলেও, দৃশ্যপটে এটাই দেখা যাচ্ছে যে, সাংবাদিকতার নেক নজর না থাকলেও, যার দশটি ব্যবসা আছে, সে ফ্যাসন হিসাবে মিডিয়া জগতে প্রবেশ করে অন্য ব্যবসাগুলি রক্ষাসহ প্রতিপ্রত্তি/প্রভাবকে টেকসই করার জন্য। তবে যারা পেশাগত ভাবে সাংবাদিককতা করেন তাদের বিষয়টি আলাদা। “সংবাদপত্র” একটি “প্রতিষ্ঠান” হিসাবে পক্ষ পতিত্বে জড়িয়ে পরার বিষয়টি নিশ্চয় জনগণ সমর্থন করে না, এজন্য যে সংবাদ পত্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে যদি পক্ষপতিত্ব বা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে বা কারো মূখপত্র হিসাবে ব্যবহ্নত হয় তবে নিশ্চয় সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রটি নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না, সে ক্ষেত্রে জনগণ নিরপেক্ষ সংবাদ পাঠ থেকে বঞ্চিত হয়। একটি রাজনৈতিক দলের একটি মূখপত্র থাকতে পারে। কিন্তু নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দিয়ে একটি পত্রিকা কারো কোন পক্ষপাতিত্ব করতে পারে না, যদি পক্ষপাতিত্ব করে তবে নিশ্চয় তা নৈতিকতা বিরোধী। সম্পাদক কর্তৃক নিজ কলমে নৈতিকতার পক্ষে বলা, পক্ষান্তরে অন্যকে মত প্রকাশে বাধা দেয়া অবশ্যই অনৈতিক ও সম্পাদকীয় ক্ষমতার অপব্যবহার।

উদাহারণ টেনে বলতে চাই যে, সুপ্রীম কোর্টের এ্যাপীলেট ডিভিশনের অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি এম. শামছুদ্দিন মানিক লিখিত “খালেদার জামিন ও লর্ড হো হো” শিরোনামে একটি উপ-সম্পাদকীয় ০৩/৬/২০১৯ ইং তারিখে বহুল প্রচারিত দৈনিক “বাংলাদেশ প্রতিদিনে” প্রকাশিত হয়। উক্ত পত্রিকায় লেখক বিচারপতি মানিক বিএনপি নেতৃবৃন্দকে মিথ্যা বাদী বলে আখ্যায়িত করে লর্ড হো হো’র সাথে তুলনা করেছেন। উক্ত আর্টিকেলে বিচারপতি মানিক লিখেছিলেন যে, “তাদের (বিএনপি নেতাদের) অবস্থা আজ লর্ড হো হো’র মতো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্লিন বেতারের মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারনার দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিদের ঘৃনা ও কৌতুকভাবে ডাকা হতো “লর্ড হো হো” বলে। বিএনপি শীর্ষ নেতাদের মিথ্যাবাদী প্রমাণ করার জন্যই ঘৃনিত, কুখ্যাত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বার্লিন বেতারের মিথ্যাবাদীর সাথে তুলনা করেছেন শুধুমাত্র সরকার বিরোধী গণতান্ত্রিক একটি রাজনৈতিক দলকে হেয় করে নিজের জন্য সুবিধাজনক ও লাভজনক কোন পদ পদবী আদায়ের লক্ষ্যে কাংখিত ব্যক্তিকে খুশী ও আস্থা ভাজন হওয়ার জন্য বিচারপতি মানিক আর্টিকেলটি লিখেছেন বলে আমার নিকট প্রতিয়মান হয়েছিল, নতুবা সর্বোচ্চ আদালতের একজন বিচারপতি, নিরপেক্ষতা যার প্রধান যোগ্যতা হওয়া বাঞ্চনীয়, সে ব্যক্তি প্রতিপক্ষ একটি রাজনৈতিক দলকে কোন যুক্তিতে সমালোচনার পরিবর্তে অপমানকর মন্তব্য করেন? সমালোচনা করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে, কিন্তু অপমানকর বক্তব্য দেয়া বাঞ্চনীয় নহে। কিন্তু এতদসম্পর্কে এর পরবর্তী ঘটনা আরো দু:ক্ষজনক। বিএনপি সম্পর্কে বিচারপতি মানিকের অপমানকর বক্তব্য খন্ডন করে ই-মেইল এর মাধ্যমে আমার বক্তব্য সম্মলিত একটি আর্টিকেল দৈনিক জাতীয় পত্রিকায় প্রেরণ করি। টেলিফোনে সম্মানীত সম্পাদক সহ পত্রিকার শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে আমার প্রতিবাদ সম্মলিত লেখাটি ছাপানোর অনুরোধ করি। আমার লেখাটি না ছাপানোর কারণে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে (বুকিং নং- ৭৮৪০২৫৫৬) মাধ্যমে ১৭/৬/২০১৯ ইং লেখাটি পত্রিকাতে প্রেরণ করার পর না ছাপানোর কারণে ২১/৬/২০১৯ ইং তারিখে বিচারপতির বক্তব্য খন্ডন করে প্রেরিত লেখাটি আমি নিজে উপস্থিত হয়ে পত্রিকা অফিসে জমা দিয়ে আসি। পত্রিকা অফিস ফটোকপিতে স্বাক্ষর করে আর্টিকেলটি আমার নিকট থেকে জমা নেয়। তারপরও লেখাটি উক্ত পত্রিকায় প্রাকাশিত হয় নাই। প্রকাশনায় কারো বিরুদ্ধে অসত্য কোন মন্তব্য করলে যার বিরুদ্ধে মন্তব্যটি করা হয় তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার সৃষ্টি হয় তার প্রতিবাদ করার এবং একই সাথে সংল্লিষ্ট পত্রিকা প্রতিবাদ বা পূর্ব প্রকাশিত বক্তব্য খন্ডন করার জন্য কোন বক্তব্য কেহ প্রদান করলে তা ছাপানোর জন্য সংশ্লিষ্ট পত্রিকা আইন ছাড়াও নৈতিকতার নিকট দায়বদ্ধ। আমরা বা বিএনপি কি জনগণের অংশ নহে? তবে কেন বিপারপতি মানিকের বক্তব্য খন্ডন করে আমার লেখাটি বাংলাদেশে সর্বাধিক প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হলো না?

নিয়মতান্ত্রিক সমালোচনা সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নের জন্য গণমাধ্যম অঙ্গীকারবদ্দ বলেই পাঠক/লেখক সমাজ মনে করে। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা এবং গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা প্রতিটি বিবেকমান মানুষের দাবী। তবে কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা বা কোন রাজনৈতিক দলের মূখপত্র হওয়ার নিয়ম পৃথিবী ব্যাপী রয়েছে যার পাঠক রয়েছে নিজস্ব গন্ডিতে। কিন্তু যে গণমাধ্যম কোন দলের মূখপত্র হয়ে কাজ করার প্রকাশ্যে ঘোষনা না দেয়া পর্যন্ত কোন পক্ষপাতিত্ব আচরন নিশ্চয় নৈতিকতার পরিপন্থী। যে পত্রিকা জনগণের পক্ষে সে পত্রিকা সকল জনগণকেই মত প্রকাশের অধিকার দিতে হবে, ব্যর্থতায় মূখভরা নৈতিকতা ও আদর্শ শুধুমাত্র লোক দেখানো, পক্ষান্তরে উদ্দেশ্য হলো সরকারী আস্থাভাজন থাকার প্রক্রিয়া মাত্র।

উল্লেখ ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কোন কোন পত্রিকা সংবাদ পরিবেশন করে না। কারণ মালিক নিজেই ভূমিদস্যু। ভূমিদস্যুদের বেআইনী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। কারণ প্রশাসনের মুখ কি ভাবে বন্ধ করতে হয় ভূমিদস্যুরা তা জানে। এ যদি হয় গণমাধ্যমের অবস্থান, সে ক্ষেত্রে নিরীহ, নিপীড়িত সাধারণ গণমানুষ কোথায় যেয়ে আশ্রয় খোজবে? কারণ, এখনো সাধারণ মানুষ মনে করে যে, গণমাধ্যমই জনগণের আশা আখ্যাংকার ভরসার স্থল যাদের নিকট আশ্রয় নেয়া যায়।

                      লেখক

কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)
মোবাঃ ০১৭১১-৫৬১৪৫৬
E-mail: [email protected]

মন্তব্য করুন

আরো সংবাদ